দুই বছরের আগে বাড়ানো যাবে না বাড়িভাড়া, ভাড়াটিয়াকে দিতে হবে ছাদ ও গেইটের চাবি
ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধি এবং ভাড়াটিয়াদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
নতুন এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং প্রতিটি ভাড়াটিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ভবনের ছাদ ও মূল গেইটের চাবি দিতে হবে।
মঙ্গলবার ৯২০ জানুয়ারি) ঢাকা উত্তর সিটির নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব নির্দেশিকার কথা জানান ডিএনসিসি'র প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
তিনি বলেন, 'বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ এর আলোকে এই নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটি বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয় পক্ষের জন্যই বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণযোগ্য হবে।'
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, 'রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের বেশি নয়। ফলে নগরবাসীর একটি বড় অংশই ভাড়াটিয়া। গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধার ঢাকাকেন্দ্রিক প্রবণতার কারণে নগরীর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতে।'
তিনি আরও বলেন, 'আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী একটি শহরে মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আবাসনে ব্যয় হলে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'
ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, '১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা ও অস্পষ্টতা রয়েছে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় বাড়িওয়ালারা প্রায়ই ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে যারা বাড়িভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের অধিকারও যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।'
নির্দেশিকার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো-
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর তা অন্তত দুই বছর বলবৎ থাকবে এবং ভাড়া বৃদ্ধির সময় হবে শুধুমাত্র জুন-জুলাই মাসে। দুই বছর পরও ভাড়া পরিবর্তন করতে হলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করতে হবে। বার্ষিক ভাড়ার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫% এর বেশি হতে পারবে না।
এছাড়া বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সময় এক থেকে তিন মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিটি ভাড়াটিয়াকে ভবনের ছাদ ও মূল গেইটের চাবি শর্তসাপেক্ষে দিতে হবে। একই সঙ্গে বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে তা আগে ভাড়াটিয়াকে জানাতে হবে এবং মতামত নিতে হবে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, বাড়ির মালিককে অবশ্যই বাড়িটি বসবাসযোগ্য অবস্থায় রাখতে হবে এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহসহ সব ইউটিলিটি সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাকে জানাবেন এবং বাড়িওয়ালা দ্রুত সমাধান করবেন।
ভাড়াটিয়াকে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে এবং বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই প্রতি মাসে লিখিত রশিদ দিতে হবে। ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময়ে বাড়িতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে বলেও নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি ও বিরোধ নিষ্পত্তি নির্দেশিকায় বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত ভাড়াচুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চুক্তিপত্রে ভাড়া, অগ্রিম জমা, ভাড়া বাড়ানোর শর্ত এবং বাড়ি ছাড়ার সময়সীমা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই দুই মাসের নোটিশ দিয়ে ভাড়াচুক্তি বাতিল করতে পারবেন। ভাড়াটিয়া নিয়মিত ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা এবং পরে লিখিত নোটিশ দিয়ে দুই মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিতে পারবেন বাড়িওয়ালা। ভাড়াসংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ওয়ার্ড ও জোনভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান না হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো যাবে।
ঢাকা উত্তর সিটি জানায়, ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালাদের এই নির্দেশিকা সম্পর্কে সচেতন করতে জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হবে।
