‘মাদার অব অল ডিলস’: ট্রাম্পের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় চুক্তির পথে ভারত ও ইইউ
আগামী সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন। রাষ্ট্রীয় ভোজ ও অনুষ্ঠানসংক্রান্ত জাঁকজমকের বাইরে এই দুই নেতার এজেন্ডায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। খবর বিবিসি'র।
ইউরোপের জন্য এটি একটি কঠিন ভূ-রাজনৈতিক মুহূর্ত। বিশেষ করে, গ্রিনল্যান্ড দখলের মার্কিন প্রচেষ্টার বিরোধিতার জেরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ানোর হুমকি দিলেও পরে তা থেকে সরে আসেন।
প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি নির্বাচনে ভারতের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে। ওয়াশিংটনের আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন বছরে দিল্লি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে।
লন্ডনভিত্তিক থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের চেতিজ বাজপেয়ি বিবিসিকে বলেন, 'এটি সংকেত দিচ্ছে যে ভারত বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে… এবং তারা ট্রাম্প প্রশাসনের খেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল নয়।'
কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আগামী ২৭ জানুয়ারি উভয় পক্ষের নেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই চুক্তির ঘোষণা আসতে পারে। ভন ডার লেন এবং ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল উভয়েই একে 'মাদার অব অল ডিলস' বা 'সব চুক্তির সেরা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রায় দুই দশকের কঠোর দর-কষাকষির পর শেষের পথে থাকা এই আলোচনা সম্পন্ন করার ওপর তারা যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিই এ থেকে স্পষ্ট।
যুক্তরাজ্য, ওমান, নিউজিল্যান্ড ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে ধারাবাহিক চুক্তির পর, এটি গত চার বছরে ভারতের নবম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হতে যাচ্ছে। ব্রাসেলসের (ইইউ) জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মারকোসার বাণিজ্যিক জোট এবং জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া বাণিজ্য চুক্তির ধারাবাহিকতা বহন করছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমেধা দাসগুপ্ত বলেন, 'উভয় পক্ষই এখন নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজছে, কারণ ভূ-রাজনীতি থেকে সৃষ্ট হুমকি বাণিজ্যের জন্য এক উত্তাল পরিবেশ তৈরি করেছে। ভারতের জন্য মার্কিন শুল্ক সমস্যা, আর ইইউর জন্য চীনের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানোর তাগিদ—উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রবল। ইইউ চীনকে অনির্ভরযোগ্য মনে করে।'
দাসগুপ্ত আরও বলেন, এই চুক্তি 'ভারতের কুখ্যাত রক্ষণশীল খোলস থেকে বের হয়ে আসার এক ধারাবাহিক ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টার প্রতীক'।
ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তির কারণে দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি। দেশটি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি অতিক্রমের পথে রয়েছে এবং এ বছর জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে।
দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ভন ডার লেন তার বক্তৃতায় বলেছেন, 'ইইউ ও ভারত একজোট হলে দুই বিলিয়ন বা ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাজার তৈরি হবে, যা বিশ্ব জিডিপির এক-চতুর্থাংশের সমপরিমাণ।'
দিল্লির জন্য ইইউ ইতোমধ্যেই তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক জোট। এই চুক্তির মাধ্যমে 'জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্সেস' বা জিএসপি সুবিধা পুনরায় ফিরে আসবে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ইইউ বাজারে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক আর দিতে হবে না।
দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, 'ভারত ইইউতে প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং ৬১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। অর্থাৎ বাণিজ্যে ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে ইইউ জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করায় অনেক ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে গেছে।'
শ্রীবাস্তব আরও বলেন, 'মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ হারানো বাজার ফিরে পেতে এবং পোশাক, ওষুধ, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও যন্ত্রপাতির মতো প্রধান রপ্তানি পণ্যের শুল্ক কমাতে সহায়তা করবে। এছাড়া বর্ধিত মার্কিন শুল্কের ধাক্কা সামলাতেও এটি ভারতীয় সংস্থাগুলোকে শক্তি দেবে।'
তবে, কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর খাতগুলোকে ভারত এই চুক্তির আওতামুক্ত রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চুক্তির মতোই গাড়ি, ওয়াইন এবং স্পিরিট বা মদের মতো খাতে পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানো হতে পারে।
চ্যাথাম হাউসের চেতিজ বাজপেয়ি বলেন, 'ভারতের প্রবণতা হলো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে পরবর্তী ধাপের আলোচনার জন্য রেখে দিয়ে পর্যায়ক্রমে বাণিজ্য চুক্তি করা। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সারবস্তুর মতোই চুক্তির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বও সমান।'
এত অগ্রগতি সত্ত্বেও কিছু বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইউরোপের জন্য মেধাস্বত্ব সুরক্ষা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তারা আরও ভালো ডেটা সুরক্ষা এবং কঠোর পেটেন্ট বিধিমালা চাচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের জন্য আলোচনার অন্যতম কাঁটা হলো 'সিবিএএম' (কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম) নামে পরিচিত নতুন একটি কার্বন কর, যা ইউরোপ চলতি বছর থেকে কার্যকর করেছে। জিটিআরআই-এর শ্রীবাস্তব বলেন, 'এফটিএর আওতায় আমদানি শুল্ক উঠে গেলেও সিবিএএম কার্যত ভারতীয় রপ্তানির ওপর নতুন সীমান্ত কর হিসেবে কাজ করবে। এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এতে খরচ বাড়বে, প্রতিবেদন জমার জটিলতা বাড়বে এবং ডিফল্ট নির্গমন মানদণ্ড ব্যবহার করে জরিমানা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।'
শ্রীবাস্তব বলেন, 'শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি একটি প্রবৃদ্ধি সহায়ক অংশীদারিত্ব হবে, নাকি কৌশলগতভাবে অসম চুক্তি হবে—তা নির্ভর করবে এই সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হয় তার ওপর।' তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের অ্যালেক্স ক্যাপ্রি বলেন, 'শেষ পর্যন্ত এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অনির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য বিচ্ছিন্নতা ত্বরান্বিত করতে পারে। এর অর্থ হলো ট্রাম্পের আমেরিকা—কিংবা চীনের—ওপর নির্ভরতা কমানো। পাশাপাশি হুটহাট শুল্ক আরোপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি থেকেও এটি রক্ষা করবে।'
ক্যাপ্রির মতে, ভারতের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপে চুক্তির বিরুদ্ধে কিছুটা বাধা ছিল। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা কমালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে চুক্তির অনুমোদন পাওয়া সহজ হতে পারে। চুক্তি কার্যকর করতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।
সুমেধা দাসগুপ্ত বলেন, '২০২৬ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে ইইউ নেতারা এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক হবেন, যা হয়তো অন্য সময়ে এতটা দেখা যেত না।'
