ঢাকার ওপর চাপ কমাতে যাত্রী সেবায় কমিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের
রাজধানী ঢাকায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে আশপাশের জেলা শহরগুলোর সঙ্গে কার্যকর, আরামদায়ক ও সুলভ কমিউটার সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রেল কমিউটার সার্ভিসের পাশাপাশি বাস ও নৌ কমিউটার সার্ভিসও চালু করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
কর্মকর্তারা জানান, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ আশপাশের জেলায় বসবাস করেই কাজ, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য সহজে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারবেন। ফলে রাজধানীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন কমবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ঢাকার সঙ্গে আশপাশের জেলাগুলোর সংযোগ স্থাপনে সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করা।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উদ্যোগে গত ৭ এপ্রিল রাজধানীর নাজিয়া-সালমা ভবনে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ।
ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে
সভায় কবির আহমেদ বলেন, ঢাকার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নতুন করে জনসংখ্যার চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিদিন ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকায় আসছেন। ফলে আবাসন, পানীয় জল ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, "বিশ্বের অন্যান্য মেগাসিটির মতো ঢাকার জনসংখ্যার একটি অংশকে পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে স্থানান্তর করতে হলে কার্যকর কমিউটার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।"
সমন্বিত কমিউটার নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ঢাকাকে বাসযোগ্য করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি), বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) পৃথকভাবে কমিউটার সার্ভিসের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৬ মে'র মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে পাঠাবে। এর ভিত্তিতে দ্রুত কমিউটার সার্ভিস বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে সম্ভাব্য প্রভাব
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বিত কমিউটার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে এর বহুমুখী সুফল মিলতে পারে।
সংযোগব্যবস্থা উন্নত হলে মানুষ আশপাশের জেলায় বসবাস করেই ঢাকায় কাজ করতে পারবেন। এতে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের চাপ কমবে এবং জনসংখ্যার চাপও হ্রাস পাবে।
রেল ও নৌপথে যাতায়াত সাধারণত সড়কপথের তুলনায় সাশ্রয়ী। নিয়মিত কমিউটার সার্ভিসে সাপ্তাহিক বা মাসিক পাস চালু হলে যাতায়াত খরচ কমবে এবং যানজটের কারণে সময় অপচয়ও কমে আসবে।
এতে ঢাকায় পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও উন্নত হতে পারে। প্রতিদিন আশপাশের জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ শাকসবজি, মাছ ও কৃষিপণ্য রাজধানীতে আসে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে এসব পণ্য দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে পারবে, যা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখবে।
সহজ সংযোগব্যবস্থা ঢাকার বাইরে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বাড়াতে পারে। এতে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে শিল্প, শপিং সেন্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা রাজধানীর বাইরে উন্নয়ন ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হবে।
পরিবেশগত দিক থেকেও এর ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। নৌপথ ও বিদ্যুৎচালিত রেলব্যবহারের মাধ্যমে বায়ু ও শব্দদূষণ কমবে, যানজটজনিত চাপ হ্রাস পাবে এবং নদী দখল ও দূষণ রোধে সহায়তা করবে।
রেলের ওপর গুরুত্ব, সক্ষমতা বাড়াতে হবে
সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, যাত্রী পরিবহনে কমিউটার সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে কমিউটার সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যাত্রীসেবার মান বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি রুটে কমিউটার সার্ভিস পরিচালনা করছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
তিনি বলেন, "ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রুটে দুটি কমিউটার ট্রেন চলে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইন হলে সেখানেও প্রয়োজনীয় কমিউটার সার্ভিস চালু করা সম্ভব হবে।"
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে ১৯৯৯ সালে কমিউটার সার্ভিস চালু করে। রেলের একটি সার্ভিস বাড়াতে চারটি আনুষঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় কমিউটার সার্ভিস বাড়াতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "কমিউটার সার্ভিসকে সবসময় সকাল ৯টার আগে ঢাকায় প্রবেশ করাতে হবে। একই সময়ে আন্তঃনগর ট্রেনও ঢাকায় প্রবেশ করে। ফলে একসঙ্গে বেশি রুটে কমিউটার সার্ভিস চালু করতে হলে পর্যাপ্ত প্ল্যাটফর্মের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।"
বাস সার্ভিসে বহর বাড়ানোর অপেক্ষা
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা বলেন, বাসের ঘাটতির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কমিউটার সার্ভিস চালু করা সম্ভব নয়। তবে নতুন বাস সংগ্রহের পর এটি চালু করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, "বিআরটিসি বাসের মাধ্যমে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর সঙ্গে কমিউটার সার্ভিস চালু করা সম্ভব। বর্তমানে বহরে বাসের সংখ্যা কম থাকায় তা সীমিত। বহরে বাসের সংখ্যা বাড়ানো গেলে কমিউটার সার্ভিস প্রদান করা সম্ভব হবে।"
বিআরটিসির বেশ কিছু বাস ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "এসব বাস সংগ্রহ করা হলে কমিউটার সার্ভিস চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।"
তিনি আরও বলেন, "কমিউটার সার্ভিসের জন্য ঢাকার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী রুট নির্ধারণ করা যেতে পারে।"
স্বল্প ব্যয়ের বিকল্প হিসেবে নৌপথ
নৌপথের ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএর প্রতিনিধি ঢাকার চারপাশে চক্রাকার নৌপথ পুনরায় চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা স্বল্প ব্যয়ে যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারে।
সভায় জানানো হয়, নানা কারণে এই চক্রাকার নৌপথ চালু রাখা সম্ভব হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিসি ও বেসরকারি উদ্যোগে এটি চালু রাখা গেলে এবং ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত আশপাশের নৌপথ সম্প্রসারণ করা গেলে স্বল্প ব্যয়ে কমিউটার সার্ভিস চালু করা সম্ভব।
মেট্রোরেল ও সড়ক সংযোগ
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মো. আবদুল বাকী মিয়া জানান, চলমান দিয়াবাড়ি–কমলাপুর মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) এবং ভবিষ্যতের এমআরটি-১ (বিমানবন্দর–কমলাপুর) ও এমআরটি-৫ (হেমায়েতপুর–ভাটারা) লাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে কমিউটার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
সমন্বিত পরিকল্পনায় জোর
এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, কমিউটার সার্ভিস নিয়ে কথা বলতে হলে শুধু যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নকে আলাদা করে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা, আবাসন, পানি, স্যানিটেশনসহ নাগরিক সুবিধাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, "আমাদের ল্যান্ড ইউজ পলিসি এবং কমিউটার ব্যবস্থাকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে শুধু কমিউটার সার্ভিস চালু করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না; বরং যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "সব ধরনের যোগাযোগমাধ্যমকে একটি সমন্বিত মাল্টিমোডাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে এবং তা ল্যান্ড ইউজ পলিসির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এই সমন্বয় ঘটাতে পারলে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং জনসংখ্যার চাপ কমানো যাবে। তখনই ঢাকাকে সত্যিকারের বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।"
তিনি জানান, দেশে গত এক দশকে রেল ও সড়ক যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে নৌপথের সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
তার মতে, "এখন নৌপথকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।"
