বই কেনায় ‘মন্ত্রী-সচিব কোটা’ বাতিলের প্রস্তাব: পদ হারালেন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের (এনবিসি) পরিচালক আফসানা বেগমকে তার পদ থেকে হঠাৎ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বই ক্রয়ের নীতিমালায় দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ২০ শতাংশ 'মন্ত্রী-সচিব কোটা' বাতিলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
বিশেষ করে, বর্তমান সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে এই কোটা ইস্যুতে তার মতবিরোধই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ বলে দাবি করেছেন আফসানা বেগম।
২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন আফসানা বেগম। তবে নিয়োগের কয়েক মাসের মাথায় চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, গত বুধবার কক্সবাজারে একটি সরকারি প্রশিক্ষণে থাকাকালীন তিনি জানতে পারেন যে, গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলী মামুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আসা চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই এই আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিরোধের মূলে 'মন্ত্রী-সচিব কোটা'
ঘটনার সূত্রপাত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই নির্বাচন ও ক্রয় নীতিমালা সংস্কার নিয়ে। আফসানা বেগমের ভাষ্যমতে, তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময় তিনি একটি নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছিলেন। সেখানে মন্ত্রী ও সচিবদের সুপারিশে বই কেনার জন্য সংরক্ষিত ২০ শতাংশ কোটা বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
আফসানা বেগমের দাবি, এই কোটার মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে মানহীন, অপাঠ্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রচিত বই সরকারি অর্থে কেনা হয়েছে। যার ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, এই কোটায় বই নির্বাচনে কোনো ক্যাটালগ, পরিদর্শন প্রতিবেদন বা মান যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে যে কেউ ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করতে পারলেই লাইব্রেরির নামে অনুদান ও হাজার হাজার কপি বই আদায় করতে পারত। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, একজন অতিরিক্ত সচিবের লেখা 'আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা' নামক একটি বইও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এক হাজার কপি কিনেছিল।
প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, বই নির্বাচন শতভাগ কমিটির মাধ্যমে হবে এবং প্রকৃত সাহিত্য ও গবেষণাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিবর্তনের পর নীতিমালাটি আটকে যায়।
উপদেষ্টা ফারুকীর সঙ্গে মতবিরোধ
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নতুন উপদেষ্টা হিসেবে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যোগ দেওয়ার পর এই সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় বলে অভিযোগ করেন আফসানা বেগম। একটি বৈঠকের বরাত দিয়ে তিনি জানান, তিনি যখন কোটা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দেন, তখন উপদেষ্টা ফারুকী তা প্রত্যাখ্যান করেন।
আফসানা বেগমের দাবি অনুযায়ী, ফারুকী বৈঠকে বলেছিলেন, 'কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে এটা ব্যবহার করবে। ওদের এটা লাগবে।' এর জবাবে আফসানা বেগম প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'ভাই, আমরা কি পরবর্তী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছি? আমাদের নিজেদের কোনো এজেন্ডা নাই?'
বৈঠক শেষে কোটা পুরোপুরি বাতিল না করে 'কোটা' শব্দটির পরিবর্তে 'সংরক্ষিত সুবিধা' বা অন্য কোনো শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। এই ঘটনাকে তিনি চরম অপমানজনক এবং সংস্কারের পথে অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আমলাতান্ত্রিক বাধা ও ভেস্তে যাওয়া সেমিনার
আফসানা বেগম তার পোস্টে আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, 'প্রশাসনে এখনো 'জি স্যার' বা 'হ্যাঁ স্যার' বলার মানসিকতা বিদ্যমান, যা প্রকৃত সংস্কারের পথে বড় বাধা।'
তিনি জানান, অব্যাহতির ঠিক আগমুহূর্তে তিনি 'সংস্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা' শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন। সিডাপ মিলনায়তনে হল বুকিংও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার অপসারণের সঙ্গে সঙ্গেই সেই সেমিনারটিও ভেস্তে যায়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই একজন পেশাদার সাহিত্যিক ও পরিচালককে সরিয়ে দেওয়ার এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশে এমন সিদ্ধান্তকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
