ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন ল্য পেন, পায়ে থাকবে ইলেকট্রনিক ট্যাগ; কিন্তু কেন?
ফ্রান্সের অতি-ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি পদে লড়াইয়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আপিল আদালত কমিয়ে দেওয়ায় তার সামনে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তার নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময়টাতেই পায়ে পরতে হতে পারে একটি ইলেকট্রনিক অ্যাঙ্কেল মনিটর (ট্যাগ)।
৫৭ বছর বয়সী এই নেত্রীর প্রেসিডেন্ট হওয়ার আশা ২০২৫ সালের মার্চ থেকেই অনিশ্চয়তায় ছিল। সে সময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ ব্যবহার করে তাঁর অভিবাসনবিরোধী দল ন্যাশনাল র্যালি (আরএন)-এর কর্মীদের বেতন পরিশোধের দায়ে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করা হয়।
গত মঙ্গলবার রাতে দেশটির জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল টিএফ১-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ল্য পেন সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বলেন, 'আজ রাতে আমি ঘোষণা করছি যে আমি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেব।'
ফ্রান্সের আগামী নির্বাচনের জনমত জরিপে ল্য পেনের দল আরএন বর্তমানে এগিয়ে রয়েছে। তবে বিগত ১৫ বছর ধরে অতি-ডানপন্থি দলটির নেতৃত্বে থাকা ল্য পেন এর আগে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন।
এবারের নির্বাচনে ল্য পেনের বিশ্বস্ত সহযোগী ৩০ বছর বয়সী জর্ডান বারজেলা তাকে সাহায্য করবেন। বারজেলা বারবার বলেছেন যে তিনি ল্য পেনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার চেয়ে তার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জরিপগুলোতে দেখা গেছে, তারা দুজনেই রান-অফ (চূড়ান্ত পর্বের) নির্বাচনে পৌঁছানোর অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।
তবে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো ল্য পেনের এই নির্বাচনী লড়াইয়ের সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ। গ্রিনস পার্টির নেত্রী মারিন তনদেলিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'একটি স্বাভাবিক বিশ্বে, যেখানে আরএনের ন্যূনতম নৈতিকতা থাকত, সেখানে ল্য পেন নিজেই সরে দাঁড়াতেন। কারণ জনগণের অর্থ আত্মসাতের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কোনো মার্জিত মানুষ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন না।'
আদালত ল্য পেনের ন্যাশনাল র্যালি পার্টিকে ২০ লাখ ইউরো জরিমানা করেছে, যার অর্ধেক স্থগিত রাখা হয়েছে। ২০১৩ সালে ফরাসি অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট 'মিডিয়াপার্ট' এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল যে, ল্য পেন তার তখনকার দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের দুই সদস্যকে ভুয়া পার্লামেন্টারি সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অর্থ আত্মসাতের একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল।
দীর্ঘ সাত বছরের তদন্তের পর ২০২৩ সালে ল্য পেনসহ দুই ডজনেরও বেশি সহযোগীর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগে বিচার শুরু হয়। গত ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ ল্য পেনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত জানায়, ২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে তিনি ইইউ পার্লামেন্টের ১৪ লাখ ইউরো দলীয় কর্মীদের বেতনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
পায়ে ইলেকট্রনিক মনিটর কেন?
প্যারিসের একটি আপিল আদালত গত মঙ্গলবার ল্য পেনকে অর্থ আত্মসাতের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে ১ লাখ ইউরো জরিমানা করেছে। তবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ওপর তার আগের পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে ৪৫ মাস করা হয়েছে, যার দুই-তৃতীয়াংশই স্থগিত থাকবে।
একই সঙ্গে তার চার বছরের কারাদণ্ড কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, যার মধ্যে দুই বছর স্থগিত থাকবে। বাকি এক বছরের সাজা ল্য পেনকে বাড়িতে অন্তরীণ (হাউস অ্যারেস্ট) থেকে পায়ের ইলেকট্রনিক অ্যাঙ্কেল মনিটর বা ট্যাগের মাধ্যমে পার করতে হবে। ফ্রান্সে কারাগারের উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এই নজরদারি পদ্ধতিটি বেশ সাধারণ।
ইউরোপিয়ান কমিটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব টর্চার'-এর মতে, ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে অতিরিক্ত বন্দি ও আটকাবস্থার অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। ইলেকট্রনিক মনিটর পরানোর এই বিকল্প পদ্ধতি বন্দিশালার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা থেকে বিরত রাখে।
ফরাসি আইন অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক হোম ডিটেনশনের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে পায়ে ইলেকট্রনিক অ্যাঙ্কেল মনিটর পরতে হয়। বিচারকের অনুমোদিত নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এই সময়ে তার বাড়ি বা অন্য কোনো নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকে।
সুনির্দিষ্ট স্থান এবং দোষী ব্যক্তি সেখানে ঠিক কত সময় অবস্থান করবেন, তা আদালত বা সাজা কার্যকর করার দায়িত্বে থাকা বিচারক নির্ধারণ করে দেন।
এই ধরনের ডিভাইস পরে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো বেশ কঠিন হলেও, অসম্ভব নয়।
ল্য পেন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর, আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে একজন বিশেষায়িত বিচারক নির্ধারণ করবেন কীভাবে ল্য পেনের ইলেকট্রনিক মনিটরিং সম্পন্ন হবে। এর মধ্যে থাকবে তাকে কোন বাসভবনে সাজা ভোগ করতে হবে এবং দিনের কোন কোন সময়ে তাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
আইন অনুযায়ী, সাজার ধরন পরিবর্তনের এই সময়ে দোষী ব্যক্তি প্রতি বছর সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত সাজা মওকুফ এবং এমনকি শর্তসাপেক্ষে মুক্তির জন্য যোগ্য হতে পারেন বলে আপিল আদালত এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে জানিয়েছে।
ল্য পেনের পায়ে এই মনিটরটি কখন লাগানো হচ্ছে—যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে—তার ওপর নির্ভর করে প্রচারণার শেষ কয়েক মাসে তিনি হয়তো এটি থেকে মুক্তও থাকতে পারেন। উল্লেখ্য, ফ্রান্সে আগামী ১৮ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট এবং ২ মে রান-অফ বা চূড়ান্ত পর্বের ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সাজা কার্যকর বিষয়ক জাতীয় বিচারক সমিতির সভাপতি সেলিন বারতেত্তো বলেন, 'আপিল আদালত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে। সাজা হ্রাসের ক্ষেত্রে: এক বছরের সাজার বিপরীতে ছয় মাসের সাজা মওকুফ হতে পারে, তবে তাকে চলাচলের জন্য অনুমোদিত সময় কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং ফৌজদারি জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।'
ল্য পেন গত সপ্তাহেও পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন যে, আপিল আদালত তাকে ইলেকট্রনিক মনিটর পরার নির্দেশ দিলে তিনি আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়বেন না।
এলসিআই চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ল্য পেন বলেছিলেন, 'আমি যদি প্রার্থী হতে পারি তবে আমি প্রার্থী হব, শর্ত হলো আমাকে প্রচারণা চালানোর সুযোগ দিতে হবে। কারণ আমাকে যদি প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় কিন্তু স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালাতে বাধা দেওয়া হয়, তবে আপনারা বুঝবেন যে সেটি সম্ভব নয়।'
পায়ে ইলেকট্রনিক ট্যাগ পরাই কি মূল বাধা?—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'অবশ্যই। একটি নির্বাচনী সমাবেশ বা বাজারে গিয়ে মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ করার জন্য আমি তো একজন বিচারকের অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকতে পারি না।'
৫৭ বছর বয়সী ল্য পেন কোনো মন্তব্য না করেই আদালত চত্বর ত্যাগ করেন। তবে মঙ্গলবার রাতে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি তার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন।
এর আগে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি দুর্নীতির মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড পাওয়ার পর গত বছর পায়ে ইলেকট্রনিক মনিটর পরেছিলেন। সে সময় ডিভাইস পরা অবস্থায় তার জগিং করতে যাওয়ার ছবি গণমাধ্যমে এসেছিল। মাত্র তিন মাসের কিছু বেশি সময় পর তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তিনি ইলেকট্রনিক ট্যাগটি খুলে ফেলার অনুমতি পান।
তৎকালীন ফরাসি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সারকোজিকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই অনুমতির সময়সীমা সোম, বুধ ও বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, যাতে তিনি একটি ভিন্ন মামলার শুনানিতে অংশ নিতে পারেন।
