নিরাপত্তা বনাম কৌশল: বিশ্বের বিশাল স্বর্ণভাণ্ডার আসলে কোথায় জমা থাকে?
সম্পদের মূল্য ধারণে বিশ্বের অনেক দেশই স্বর্ণের মজুত রাখে। বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি মূল্যবান ধাতুটির এই মজুত দেশগুলোর রিভার্ভেরই অংশ। তবে বর্তমানে রিজার্ভের সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। বৈশ্বিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে বিভিন্ন দেশ বেশি করে সোনা কিনলেও, এই সম্পদের সর্বোচ্চ উপযোগিতা আসলে অনেকটা নির্ভর করে- এটি কোথায় জমা রাখা হয়েছে তার ওপর।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি স্বর্ণের ভল্ট নিউইয়র্ক এবং লন্ডনে অবস্থিত। মূলত নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এবং লন্ডনে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ড—বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বর্ণের মজুত বা রিজার্ভ জমা রাখে। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সংরক্ষণের ইতিহাসের কারণে এই দুটি শহর বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণবাণিজ্য কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভে ৫ লাখেরও বেশি স্বর্ণের বার গচ্ছিত ছিল, যা মুদ্রায় রূপান্তরযোগ্য স্বর্ণের একক বৃহত্তম মজুত। ১৯৭৩ সালে এর পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ। সেটি ছিল এমন এক সময় যখন যুক্তরাষ্ট্র ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ জামানত রাখার বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণের কেন্দ্রীয় অবস্থান কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৭০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনার চেয়ে বিক্রি করেছে বেশি। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের এক বিশ্লেষণ অনুসারে, এরপরও ২০২৪ সালের শেষে বৈশ্বিক স্বর্ণ মজুদের ৫৭ শতাংশই ছিল এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মালিকানায়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের মজুদ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। এরপরেই রয়েছে জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। তবে বর্তমানে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সাধারণত কেবল সেসব দেশই নিউইয়র্ক বা লন্ডনে স্বর্ণ রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যাদের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার ঝুঁকি আছে। যেমন ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক নেতারা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্ট থেকে তাদের স্বর্ণের মজুদ ফেরত পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
কিন্তু বর্তমানে এই উদ্বেগ অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, ইউরোপের দেশগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনঘন বিতর্কিত ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পর—এখন ইউরোপের অনেক দেশের কর্মকর্তাই প্রশ্ন তুলছেন যে, তাদের স্বর্ণ নিজেদের দেশে রাখাই হয়তো বেশি নিরাপদ হবে।
এপর্যন্ত স্বর্ণ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বা 'রিপ্যাট্রিয়েশন'-এর দাবিগুলো ইউরোপের দেশে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মূলত জার্মানি ও ইতালির কিছু আইনপ্রণেতা এবং অর্থনীতিবিদ।
জার্মানি প্রায় এক দশক আগে তাদের কিছু স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে এনেছিল। বর্তমানে তারা মোট স্বর্ণের অর্ধেক নিজেদের দেশে, এক-তৃতীয়াংশ নিউইয়র্কে এবং বাকি অংশ লন্ডনে রেখেছে। অন্যদিকে ইতালির ৪৪ শতাংশ স্বর্ণ দেশে, সমপরিমাণ নিউইয়র্কে এবং বাকিটা যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডে গচ্ছিত আছে। জার্মানি ও ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো জানিয়েছে যে, তাদের সব স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে নেই।
নিউইয়র্ক এবং লন্ডনে স্বর্ণ রাখার একটি বড় কারণ হলো— যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রশ্নাতীত নিরাপত্তা রেকর্ড। এমনকি পরিবহনের সময়ও এই ভল্টগুলো থেকে কখনও স্বর্ণ চুরি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার খাতিরে লন্ডন থেকে কয়েক বছরের জন্য গোপনে সব সোনা কানাডায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
আরেকটি বড় কারণ হলো তারল্য বা লেনদেনের সহজলভ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র অ্যানালিস্ট কৃষাণ গোপাল বলেন, "দেশগুলো তাদের সোনা সেখানেই রাখতে চায়—যেখান থেকে তারা সহজে এবং দ্রুত লেনদেন করতে পারবে।"
সম্প্রতি স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি বলেন, বর্তমানে ৬০টিরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণ আমাদের কাছে জমা রেখেছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নয়টি ভল্টে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার স্বর্ণের বার রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই ভল্ট থেকে তাদের স্বর্ণ অন্য কোথাও না সরিয়েই, প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা সম্পন্ন করতে পারে।
বর্তমানে যারা সোনা কিনছে তাদের জন্য এই সংরক্ষণের বিষয়টি এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ভারত তাদের মোট স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়ালেও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা স্বর্ণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনছে।
২০১৭ সালে তুরস্ক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে তাদের সব সোনা সরিয়ে নেয়, এবং এক বছর পর সুইজারল্যান্ড থেকেও তা প্রত্যাহার করে। আঙ্কারা নিজস্ব দেশে স্বর্ণের মজুদ বাড়াচ্ছে। যদিও তারা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে গচ্ছিত স্বর্ণের পরিমাণ কমিয়েছিল, তবে পরে লেনদেনের সুবিধার্থে লন্ডনে পুনরায় রিজার্ভের কিছু অংশ রাখছে।
পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের মাত্র ২০ শতাংশ নিজ দেশে রয়েছে। বাকি অংশ ফেডারেল রিজার্ভ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা হয়েছে। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পোল্যান্ডের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তারা তাদের স্বর্ণ পোল্যান্ড, নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
তিনি বলেন, "স্বর্ণ নিজ দেশে সংরক্ষণ করার মাধ্যমে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা হয়। এর কারণ হলো জাতীয় সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। তবে আমি স্পষ্ট করে বলছি, ভবিষ্যতে আমি বড় কোনো চরম পরিস্থিতির আশঙ্কা করছি না, কিন্তু আমার কাজ হলো সেগুলোর জন্য পরিকল্পনা করে রাখা।"
এর বিপরীতে চেক প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের প্রায় সব সোনা লন্ডনে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ সেখানে তারা অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বর্ণ ধার দিয়ে মুনাফা করতে পারে।
চেক প্রজাতন্ত্র বা চেকিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ড সদস্য ইয়ান কুবিসেক বলেন, "ইউরোপে স্বর্ণের প্রধান বাজার হলো লন্ডন। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্ট ব্যবহার করে আমরা লেনদেনের খরচ সাশ্রয় করতে পারি।"
নিরাপত্তার কারণেই অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখে।
চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের অন্যতম বড় ক্রেতা। বেইজিং টানা ১৭ মাস ধরে সোনা কিনছে, কিন্তু তাদের এই রিজার্ভের অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। ব্রাজিলও গত বছরের শেষ দিকে চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে, কিন্তু সেটি কোথায় রেখেছে তা প্রকাশ করেনি।
এছাড়া, বিগত কয়েক দশক ধরে লন্ডন এবং নিউইয়র্ক স্বর্ণ সংরক্ষণে আধিপত্য বজায় রাখলেও— চীনের হংকং এখন একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। হংকং পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে স্বর্ণ মজুদের একটি নিরাপদ বিকল্প কেন্দ্র হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় পরিসরে স্বর্ণ কেনা অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এই সম্পদ কোথায় রাখা হবে—তা আগামী দিনগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়েই থাকবে।
অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি বলেন, "ঝুঁকিকে অবশ্যই বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতে হবে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে হবে। স্বর্ণ সংরক্ষণের স্থানগুলোতে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে আমরা ঠিক সেই কাজটিই করছি।"
