মৌসুমে আয় ৩০-৩৫ লাখ টাকা! নীরবে বড় হচ্ছে দেশের টেপ-টেনিস ক্রিকেটের অর্থনীতি
মৌলভীবাজারের গুমোট এক দুপুর। জীর্ণ এক ডায়েরির পাতা ওল্টাচ্ছেন বাবলু আহমেদ। পাতার পর পাতা জুড়ে কেবল সংখ্যা, নাম আর তারিখের ভিড়। প্রতিটি লাইনে লেখা রয়েছে এক-একটি ম্যাচের লড়াই, রান কিংবা উইকেটের খতিয়ান। আর লেখা আছে কোন ম্যাচ থেকে কত আয় হয়েছে।
বাবলু বললেন, '২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি ম্যাচের খুঁটিনাটি লিখে রাখছি। কোন মৌসুমে কত রান করলাম, কটা ম্যাচ খেললাম—সব। গত মৌসুমে খেলেছি ১৪৮টি ম্যাচ। আগে এলাকায় ও এলাকার বাইরে বছরে সাধারণত প্রায় ২০০টি করে ম্যাচ খেলতাম।'
৩১ বছর বয়সি বাবলুর কাছে টেপ-টেনিস ক্রিকেট নিছক বিনোদন নয়। এটি তার পেশা, উপার্জনের ক্ষেত্র এবং এক সম্ভাবনাময় শিল্প।
বাবলু জানান, একসময় প্রতি ম্যাচের জন্য ৫ হাজার টাকা পেতেন তিনি; তবে এখন একজন খেলোয়াড় ম্যাচপ্রতি ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।
বাংলাদেশে টেপ-টেনিস ক্রিকেটের যে উত্থান, তার উজ্জ্বল প্রতিনিধি বাবলু।
তিনি বলেন, '২০ বছর বয়সে আমি যখন টাকার জন্য খেলতে শুরু করি, তখন ম্যাচ ফি ছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আজ আমি এক-একটি ম্যাচের ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাই। দশ বছর আগে এটি অকল্পনীয় ছিল।
'প্রথম যারা পারিশ্রমিক বৃদ্ধির দাবি তুলেছিলেন, আমি তাদের একজন। এখন অনেক খেলোয়াড়ই নিয়মিত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন।'
এই আয়ের পরিবর্তনটা তার বার্ষিক উপার্জনের খতিয়ান দেখলেই স্পষ্ট হয়। আগে এক মৌসুমে যেখানে ১০-১৫ লাখ টাকা আয় করতেন, গত কয়েক বছরে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৩০-৩৫ লাখ টাকা।
২০২৩ সালে টেপ-টেনিস খেলার আয় থেকেই একটি বাংলো তৈরি করেছেন বাবলু—যা এই ক্রীড়া অর্থনীতির এক মূর্ত প্রতীক। প্রথাগত ক্রিকেটের গণ্ডির বাইরে থেকেও যে সফল পেশাদার হওয়া সম্ভব, তার কিছু প্রমাণ মেলে এই ক্রিকেটারের ট্রফি ক্যাবিনেট আর ডায়েরির পাতায়।
ভারতের উদাহরণ টেনে বাবলু বলেন, 'ভারতে টেপ-টেনিস প্রতিষ্ঠিত শিল্প। ওদের বিভিন্ন বোর্ড, ক্লাব এবং নিয়মকানুন রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছু পেজ লাখ লাখ ভিউ ও শেয়ার পায়। সেখান অনুপ্রাণিত হয়েই আমি নিজের পেজ "বাবলু ৩৩" চালু করে নিয়মিত পোস্ট করতে থাকি। সোশ্যাল মিডিয়ার মানিটাইজেশন থেকে আসা অর্থও আমার আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
নিজের ইউটিউব চ্যানেল 'লেগেসি ক্রিকেট' ও ফেসবুক পেজ 'বাবলু ৩৩'-এর সুবাদে তিনি এখন পরিচিত মুখ। তার সিগনেচার শটের জন্য বাবলুকে অনেকে 'হেলিকপ্টার বাবলু' নামেও ডাকেন।
তবে এই খ্যাতির নেপথ্যে রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি। এক মৌসুমে ২১২টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন বাবলু। ভারতে থাকাকালীন কখনও কখনও দিনে তিন-চারটি ম্যাচেও মাঠে নামতে হয়েছে তাকে। আগে এক রমজান থেকে পরের রমজান পর্যন্ত, অর্থাৎ আট-নয় মাসের মতো খেলা চলত। কিন্তু এখন আর অফ-সিজন বলে কিছু নেই।
'আগে মূলত শীতকালেই খেলা হতো। এখন প্রায় প্রতিদিনই আমার ম্যাচ।'
সমান্তরাল এক অর্থনীতি
টেপ পেঁচানো টেনিস বল, ন্যূনতম ক্রিকেট সরঞ্জাম আর ঢিলেঢালা নিয়ম। পাড়ার গলি থেকে স্কুল বা ক্লাবের মাঠ—সর্বত্র দীর্ঘদিন ধরে টেপ টেনিসের এই ঘরোয়া সংস্করণে খেলে আসছেন তরুণরা। তবে গত কয়েক বছরে এই বিনোদন ঘিরেই দেশে গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল অর্থনীতি।
এখন বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পুরস্কারমূল্য এক থেকে ৩ লাখ টাকার মতো হয়। এমনকি কিছু এলাকায় এখন বড় টুর্নামেন্ট মানেই অপ্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি, খেলোয়াড় বদল ও নিলামের লড়াই।
ঢাকার টেপ-টেনিস খেলোয়াড় শাহিদুল ইসলাম বলেন, 'মূলত প্রবাসী এবং বিভিন্ন কোম্পানি এই খেলাগুলোর স্পন্সর হয়। বিজ্ঞাপনের জন্য এটা দারুণ পথ। যেমন লায়লা গ্রুপ অনেক স্থানীয় ম্যাচ আর টুর্নামেন্টে স্পন্সর করে।'
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দক্ষতার নিরিখে এখানে খেলোয়াড়দের 'হায়ার' (ভাড়া) করা হয়—যা স্থানীয়ভাবে 'খ্যাপ' খেলা নামে পরিচিত।
বাবলু বলেন, 'এখানে বয়সের কোনো সীমা নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো। মাঠে পারফরম্যান্স ভালো মানেই দলে সুযোগ এবং হাতে টাকা। ব্যস, এটুকুই!'
২২ বছর বয়সি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মারুফ হাসানের কাছে টেপ-টেনিসে খ্যাপ খেলা মানে হাতখরচ জোগাড় করা, কখনও বা পরিবারের ব্যয়ের ভার লাঘব করা।
মারুফ বলেন, 'কখনও কখনও আমি মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করি। আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সন্তানের জন্য এটা অনেক টাকা। নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আমি মাঝে মাঝে বাবাকেও সাহায্য করি।'
একসময় বিকেএসপিতে (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ভর্তি হতে চেয়েছিলেন মারুফ। কিন্তু তার পরিবার তাতে রাজি হয়নি। 'আমাদের কাছে খেলাধুলো ছিল প্রায় বিলাসিতা। তাই সেখানে আর যাওয়া হয়নি। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসাই আমাকে টেপ-টেনিসের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে।'
মেধা ও শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই ক্যাপ খেলার ব্যবস্থাটি প্রথাগত ক্রিকেটের পাইপলাইনের বাইরে থাকা অনেকের জন্যই নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। বাবলু নিজেও একসময় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বয়স কিছুটা বেশি হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পরে টেপ-টেনিসই তার বিকল্প খেলার মাধ্যম হয়ে অথে—শেষপর্যন্ত তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতিও।
তিনি বলেন, 'আমি মনে করি, এখনই টেপ-টেনিসের স্বর্ণযুগ। এটি যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মকে মাদক কিংবা অসামাজিক কাজ থেকে দূরে রাখতেও সাহায্য করছে। সংগঠিতভাবে আরও বেশি বেশি খেলার আয়োজন করলে ছোট বাচ্চারা বিপথে যাবে না।'
অন্য ছবি
তবে সবার ক্ষেত্রে সমীকরণ এত সহজ নয়।
চুয়াডাঙ্গা জেলা অনূর্ধ্ব-১৮ দল এবং পরে ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দলের হয়ে ওপেন করা অর্ণবের স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো। ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া থেকে নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় দাপিয়ে বেড়িয়ে এক সময় পেশাদার ক্রিকেটের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু প্রথাগত অবকাঠামো আর সময়ের টানাপড়ে তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
অর্ণব বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা আর ক্রিকেটের মৌসুম—দুটোই পড়ত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হতো। আমি পড়াশোনাকেই বেছে নিয়েছিলাম।'
অর্ণব এখন ঢাকায়, সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিবাহিত জীবন আর পারিবারিক দায়িত্বের চাপে বাইশ গজে ফেরার সম্ভাবনা কার্যত শেষ, যদিও মাঠের সেই দিনগুলো আজও তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
অর্ণব স্বীকার করে নিলেন, 'মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে দুই-তিন বছরের জন্য মাঠে ফিরে যাই। কিন্তু বাস্তবে তা আর সম্ভব নয়।'
অর্ণবের এই জীবনকাহিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। এখানে মূল ধারার ক্রিকেটে উত্তরণের পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন। যারা শেষপর্যন্ত পেশাদার ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে পারেন না, তাদের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে—হয় খেলা ছেড়ে দেওয়া, নইলে কোনো অপ্রাতিষ্ঠানিক টুর্নামেন্টগুলোতে নাম লেখানো।
বাবলুর মতো মোটা টাকার হাতছানি অর্ণবের অভিজ্ঞতায় ছিল না। জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের ক্রিকেটের বাস্তব চিত্রটা বেশ কঠিন। সেখানে পারিশ্রমিক যৎসামান্য, অনেক সময় কিছুই জোটে না। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোতে খেলোয়াড়রা বড়জোর দৈনিক ৫০০ টাকা ভাতা ও খাবার পান। বড় শহরগুলোর বাইরে ক্লাব ক্রিকেট মূলত একটি অলাভজনক ক্ষেত্র।
অর্ণব বলেন, 'নিজেকে প্রমাণ করার জন্যই ওখানে খেলা। ভালো পারফরম্যান্স করলে হয়তো জেলা দলে সুযোগ মিলবে।'
অন্যদিকে টেপ-টেনিস ক্রিকেটে মিলছে তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রাপ্তি। অর্ণব নিজেও মাঝেমধ্যে এমন ম্যাচে অংশ নিয়ে প্রতি খেলায় প্রায় ২ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। সব মিলিয়ে তার আয় হয়েছে ৪০-৫০ হাজার টাকা। তিনি জানান, রংপুরের মতো এলাকাগুলোতে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা নিয়মিত খেপ খেলে সচ্ছলভাবে সংসার চালাচ্ছেন।
তার মতে, 'ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও এটা অনেকটা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) মতোই। অধিনায়ক বা আয়োজকরা ভালো খেলোয়াড়দের ওপর নজর রাখেন; প্রয়োজন পড়লেই তাদের ডেকে নেন।'
তিনি বলেন, 'এখনকার বাচ্চারা আমাদের মতো খেলাধুলা করে না। তারা এখন ফোন আর পাবজি-র মতো গেমে আসক্ত। মাঠগুলো এখন প্রায়ই খালি পড়ে থাকে।'
দৈনন্দিন খেলাধুলা যখন কমে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই টেপ-টেনিসের এই বাণিজ্যিক প্রসার হচ্ছে। নামি খেলোয়াড়রা আগের চেয়েও বেশি ব্যস্ত থাকলেও কম বয়সি নতুন প্রতিভা উঠে আসা কমছে।
নিয়ন্ত্রণহীন উত্থান
সব মিলিয়ে একটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু প্রাণবন্ত ও সম্ভাবনাময় ক্রীড়া অবকাঠামো দানা বেঁধেছে বাংলাদেশে, যা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে। এখানে না আছে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা, না আছে নির্দিষ্ট চুক্তি বা ইনজুরির জন্য ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা। নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তাও।
বাবলু নিজেও লিগামেন্টসহ বিভিন্ন ইনজুরিতে ভুগেছেন। এই খেলোয়াড়কে চোটের কারণে গতি (একসময় ঘণ্টায় ১২৭.৬ কিমি বেগে বল করতেন) কমাতে হয়েছে। কিন্তু আর সবার মতোই চোট থেকে সেরে উঠে মাঠে ফেরার লড়াই তাকে একাই লড়তে হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবলুর ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট: 'আমাদের একটি সুসংগঠিত সিস্টেম প্রয়োজন—একটা বোর্ড, বিপিএলের ধাঁচে লিগ।'
এ ধরনের অবকাঠামো তৈরি হলে খেলোয়াড়দের আয় স্থিতিশীল হবে এবং তাদের নিরাপত্তাও বাড়বে। সেইসঙ্গে টেপ টেনিসকে বৃহত্তর ক্রিকেট কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্তও করা যাবে। ইতিমধ্যে কিছু লিগভিত্তিক টুর্নামেন্টের সূচনাও হয়েছে।
বাবলু যেখানে এই খেলার টাকায় স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করেছেন, অর্ণবের কাছে সেখানে শুধুই না-পাওয়া আর ফেলে আসা দিনের স্মৃতি।
এই দুই চরিত্রের মধ্যেই ধরা পড়েছে বাংলাদেশের টেপ-টেনিস ক্রিকেটের সামগ্রিক চিত্র—একদিকে যেমন আকাশছোঁয়া আকাঙ্ক্ষা ও অর্জন আছে, তেমনি আছে টিকে থাকার লড়াইও। একজন একে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, অন্যজন মাঠের টানে আজও এক শূন্যতা অনুভব করেন।
সব মিলিয়ে এই খেলাটি আজ আর নিছক পাড়ার ক্রিকেট নেই, আবার এখনও তা পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদাও পায়নি। এ দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েই এখন ডালপালা মেলছে দেশের টেপ-টেনিস ক্রিকেট।
