যেভাবে ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত গড়ল ইরান
আট বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর থেকে ইরান ২২ হাজার পাউন্ড বা ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে। ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে দুই মাস আগে দেশটিতে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই বিশাল ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা।
ইউরেনিয়াম এমন একটি উপাদান, যা দিয়ে একটি শহর আলোকিত করা যায়, আবার চাইলে তাকে ধ্বংসও করে দেওয়া যায়। ইউরেনিয়ামের নিম্ন মাত্রা পারমাণবিক চুল্লিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগে। আর 'সমৃদ্ধকরণ' প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর মাত্রা বাড়িয়ে পারমাণবিক বোমাও তৈরি করা যায়।
ইউরেনিয়ামের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, এটিকে সমৃদ্ধ করার কাজ তত সহজ ও দ্রুত হতে থাকে। শূন্য থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছানো যতটা কঠিন, ২০ থেকে ৬০ শতাংশ বা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তার চেয়ে অনেক সহজ।
মজুত বৃদ্ধির আদ্যোপান্ত
২০০৬ সালে ইরান বড় আকারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে। তখন তারা দাবি করেছিল, এই কাজ শুধুই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পরের কয়েক বছরে এই মজুত ক্রমেই বাড়তে থাকে।
২০১০ সালে ইরান ঘোষণা দেয়, তারা একটি গবেষণা চুল্লির জ্বালানি তৈরির জন্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে। আনুষ্ঠানিক নীতিমালা অনুযায়ী, বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের এটিই সর্বোচ্চ মাত্রা।
মজুত বাড়তে থাকায়, এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ওবামা প্রশাসন আলোচনা শুরু করে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছয় পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের একটি চুক্তি হয়। চুক্তিতে বলা হয়, আগামী ১৫ বছরের জন্য ইরান তাদের ইউরেনিয়ামের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের বেশি বাড়াতে পারবে না এবং মজুতের পরিমাণও সীমিত রাখতে হবে।
এই চুক্তির আওতায় তেহরান ২৫ হাজার পাউন্ড বা ১২ দশমিক ৫ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠায় এবং নিজেদের মজুত ৬৬০ পাউন্ডের নিচে নামিয়ে আনে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন এবং ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেন, তখন ইরানের কাছে একটি বোমা বানানোর মতো ইউরেনিয়ামও ছিল না।
কিন্তু এরপরই ইরান অধিক মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শুরু করে। শুরুতে তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে চাপে ফেলতে নিম্ন মাত্রায় সমৃদ্ধকরণ করে। এরপর ২০২১ সালের শুরুতে, ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগে, তারা এই মাত্রা ২০ শতাংশে নিয়ে যায়।
বাইডেন প্রশাসন বাতিল হয়ে যাওয়া চুক্তির কিছু অংশ পুনরায় চালুর চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। এই আলোচনার পুরোটা সময়জুড়েই ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নজিরবিহীনভাবে বাড়াতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা এটিকে ৬০ শতাংশে নিয়ে যায়—যা পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার খুব কাছাকাছি।
২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আইএইএ যখন থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির হিসাব রাখা শুরু করেছে, এরপর থেকে এবারই সবচেয়ে দ্রুত গতিতে দেশটিতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়তে দেখা গেছে।
কোথায় এই মজুত?
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদোর সমৃদ্ধকরণ কারখানাগুলোতে এবং ইসফাহানের ইউরেনিয়াম সংরক্ষণের সুড়ঙ্গগুলোতে বোমা হামলা চালায়। এর এক মাস পর আইএইএ-র সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা স্থগিত করে ইরান। ফলে দেশটির সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারিও বন্ধ হয়ে যায়।
স্যাটেলাইট নজরদারি সত্ত্বেও সরাসরি পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় এই ১১ টন মজুত বর্তমানে কোথায় আছে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।
তেজস্ক্রিয় ও রাসায়নিকভাবে বিপজ্জনক এই মজুতের কিছু অংশ হয়তো যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে সেগুলোতে পৌঁছানো বা সেগুলো ধ্বংস করা বেশ কঠিন। এমনকি এসব মজুত আদৌ টিকে আছে কি না, তা নিশ্চিত করাও এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যদি মাটি খুঁড়ে এই ইউরেনিয়াম বের করতে সক্ষমও হয়, তবু এটিকে পারমাণবিক অস্ত্রে পরিণত করতে কয়েক মাস, এমনকি এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। তারা আরও জানান, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের দিক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পারমাণবিক হুমকি ছিল না।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, মার্কিন স্যাটেলাইটগুলো মাটির গভীরে চাপা পড়া ওই ইউরেনিয়ামের ওপর নজর রাখছে। তাদের মতে, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নষ্ট হওয়ায় এই মজুত ইরানের আর কোনো কাজেই আসবে না।
তবে বিশ্লেষকরা এই দাবি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ইরান গত বছর ইসফাহান স্থাপনার পাশের পাহাড়ি সুড়ঙ্গগুলোতে একটি নতুন সমৃদ্ধকরণ কারখানা তৈরি করে থাকতে পারে। তেহরান তাদের ইউরেনিয়ামের মূল মজুত এই এলাকাতেই সংরক্ষণ করে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই ধারণা সত্যি হয়, তবে বলা যায় ইরানের কাছে হয়তো কোনো গোপন স্থাপনা রয়েছে, যেখানে তারা পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে।
