'ইরানের হাতে অপমানিত যুক্তরাষ্ট্র': চ্যান্সেলরের মন্তব্যের পর জার্মানি থেকে ৫,০০০ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা
আগামী এক বছরের মধ্যে জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানায় সংস্থাটি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছিলেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। এর পরই সেনা প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত এল। তবে এই ৫ হাজার সেনা কমানোর পরও জার্মানিতে ৩০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকবে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, 'জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইউরোপে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই এই পদক্ষেপ। আমরা আশা করছি, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের কাজ শেষ হবে।'
সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর মের্ৎস মন্তব্য করেছিলেন যে ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র 'অপমানিত' হচ্ছে। তার এই মন্তব্যের পরই জার্মানিতে সেনা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
গত সোমবার মধ্য জার্মানির একটি স্কুল পরিদর্শনের সময় মের্ৎস অভিযোগ করেন যে মার্কিন কর্মকর্তারা কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, 'সবচেয়ে নমনীয় ভাষায় বললেও বলতে হবে যে এই পুরো বিষয়টিতে কোনো বিচার-বিবেচনা করা হয়নি।'
মের্ৎস বলেন, 'ইরানিরা আলোচনা করার ক্ষেত্রে স্পষ্টতই খুব দক্ষ। অথবা বলা যায়, আলোচনা না করার ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি পারদর্শী। তারা আমেরিকানদের খালি হাতে ইসলামাবাদ থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে তাদের তথাকথিত বিপ্লবী গার্ডদের হাতে পুরো একটি জাতি অপমানিত হচ্ছে। তাই আমি আশা করি, এর যত দ্রুত সম্ভব অবসান হবে।'
এর জবাবে মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরান বিষয়ে মের্ৎস 'কী বলছেন, তা তিনি নিজেই জানেন না।' এর ঠিক পরের দিনই ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে জার্মানিতে সেনা কমানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে।
অবশ্য জার্মানিতে সেনা কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের এই হুমকির আগে মের্ৎস বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো বেশ 'চমৎকার'।
এর আগে ২০২০ সালে নিজের প্রথম মেয়াদেও জার্মানিতে সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই সময় জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল।
জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রামস্টেইন বিমানঘাঁটি রয়েছে। এটি ইউরোপে মার্কিন বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর। এখান থেকে 'এয়ারলিফট, এয়ারড্রপ এবং অ্যারোমেডিকেল ইভাকুয়েশন' (আকাশপথে সরঞ্জাম ও সেনা পরিবহন এবং চিকিৎসা সহায়তা) পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া ন্যাটো জোটের একটি স্থাপনাও রয়েছে এখানে।
ইউএস ডিফেন্স ম্যানপাওয়ার ডেটা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জার্মানিতে ৩৬ হাজার ৪৩৬ জন মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন ছিল।
মিত্রদের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় নেতা ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। কারণ ন্যাটো মিত্রদের বেশির ভাগকেই না জানিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই সংঘাতে পর্যাপ্ত সাহায্য না করায় মিত্রদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার তিনি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা কমানোর হুমকি দেন।
ইতালি ও স্পেন থেকে সেনা কমানো হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'তারা তো আর আমাদের পাশে নেই। হ্যাঁ, সম্ভবত সেনা কমানো হবে। কেন কমাব না? ইতালি কোনো সাহায্যই করেনি। আর স্পেনের ভূমিকা তো ভয়ংকর। একদম জঘন্য।'
অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো জার্মানিও যুক্তরাষ্ট্রকে সীমিত সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—যুদ্ধ সম্পর্কিত কাজের জন্য তারা তাদের সামরিক অবকাঠামো, যেমন বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে এই ঘাঁটিগুলো থেকে সরাসরি কোনো আক্রমণ বা হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
মের্ৎস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জার্মানি আরও সহায়তা দেবে। সেই লক্ষ্যে বার্লিন সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যে সংঘাতের স্থায়ী অবসান হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ভূমধ্যসাগরে তাদের একটি মাইনসুইপার (মাইন সরানোর জাহাজ) মোতায়েন করা হবে। তবে জার্মানির এসব পদক্ষেপে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি ট্রাম্প।
