যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে ইরান
যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান। বুধবার তেহরানের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। সূত্র জানিয়েছে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলোর কোনো সুরাহা এতে হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি দুটি হলো—ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার বিশ্বাস ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'তারা চুক্তি করতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় আমাদের মধ্যে খুব ভালো আলোচনা হয়েছে, তাই চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।'
তবে দিনের শুরুতে ট্রাম্প চুক্তির বিষয়ে কিছুটা হতাশ ছিলেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি ইরানে আবারও বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্প এর আগেও কয়েকবার আশার কথা শুনিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশই এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
এক পৃষ্ঠার একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। পাকিস্তানি একটি সূত্র এবং মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অপর একটি সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এর পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।
তবে গত সপ্তাহে ইরানের দেওয়া ১৪ দফার প্রস্তাবের সঙ্গে এই নতুন প্রস্তাবের ঠিক কী পার্থক্য রয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের কোনো জবাব দেয়নি।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়াকে 'আমেরিকার ইচ্ছার তালিকা' (উইশ-লিস্ট) বলে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দুই পক্ষ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে—এমন খবরগুলোকে উপহাস করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ইংরেজিতে লেখেন, 'অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ব্যর্থ হয়েছে।'
গালিবাফ দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার পরই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন খবর ছড়ানো হচ্ছে।
তেলের দামে পতন
সম্ভাব্য চুক্তির এই খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে আসে। বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারস-এর দাম একপর্যায়ে প্রায় ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে নেমে যায়। তবে পরে তা আবার ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে।
জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করা এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারও চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
এর আগে মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে চলা নৌ-অভিযান স্থগিত করেন ট্রাম্প। শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানায়, ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। সৌদি আরব এই অভিযানের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাদের একটি ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন।
এনবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করবে—ট্রাম্পের এমন ঘোষণায় সৌদি কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হয়েছিলেন। তারা ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেন, এই অভিযানের জন্য তারা মার্কিন সামরিক বিমানগুলোকে সৌদি ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না।
ট্রাম্প এবং সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ফোনালাপের পরও এই সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানিয়েছে এনবিসি। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি।
মার্কিন দাবিগুলো নেই প্রস্তাবে?
মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত সূত্রটি জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধিদলের পক্ষে এই আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। উভয় পক্ষ এই প্রাথমিক চুক্তিতে একমত হলে, একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে পরবর্তী ৩০ দিন ধরে বিস্তারিত আলোচনা চলবে।
ওই পূর্ণাঙ্গ চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধের অবসান ঘটবে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে এবং আটকে থাকা ইরানি তহবিল ছেড়ে দেওয়া হবে। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এই প্রাথমিক চুক্তির জন্য শুরুতে কোনো পক্ষকেই কোনো ছাড় দিতে হবে না। তবে ওয়াশিংটন এর আগে যেসব বড় দাবি জানিয়েছিল (যা ইরান সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছে), সেগুলোর কোনো উল্লেখ এই প্রস্তাবে নেই। যেমন—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি মিলিশিয়াদের (ছায়াগোষ্ঠী) সমর্থন বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো এখানে নেই।
এমনকি ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় অস্ত্রের মাত্রার কাছাকাছি ৪০০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা নিয়েও চুক্তির খসড়ায় কোনো কথা বলা হয়নি।
এদিকে ট্রাম্পের মিত্র এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার জানান, ইরান যাতে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে, সে জন্য দেশটিতে থাকা সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলার বিষয়ে তিনি ও ট্রাম্প একমত হয়েছেন।
তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
