যুক্তরাষ্ট্রের ভল্ট থেকে ১,২৩৬ টন স্বর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জার্মান অর্থনীতিবিদদের
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের তথা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিবর্তনে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণের প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে সংরক্ষিত জার্মানির বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জোরালো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানির কাছেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতীয় স্বর্ণভাণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬৪ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের মোট ১,২৩৬ টন স্বর্ণ নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সংরক্ষিত আছে।
জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডয়চে বুন্ডেসব্যাংকের সাবেক প্রধান গবেষক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ইমানুয়েল মোঁখ বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণ রাখা "অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ" উল্লেখ করে তা দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
জার্মানির অর্থনৈতিক দৈনিক হান্ডেলসব্লাটকে তিনি বলেন, "বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে এত বেশি স্বর্ণ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর স্বার্থে বুন্ডেসব্যাংকের উচিত স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।"
যদিও জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মুখপাত্র স্টেফান কর্নেলিয়াস সম্প্রতি বলেছেন, এই মুহূর্তে স্বর্ণভাণ্ডার প্রত্যাহারের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেই।
তবে মোঁখ একা নন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর যে প্রচেষ্টা ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানি করছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই অনেক অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞ এমন পদক্ষেপের পক্ষে মত দিচ্ছেন।
ইউরোপিয়ান ট্যাক্সপেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (টিএই) এবং জার্মান করদাতা সমিতির প্রধান মাইকেল ইয়াগারও বার্লিনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিতকেই তিনি এ ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম রাইনিশে পোস্টকে ইয়াগার বলেন, "ট্রাম্প অনির্ভরযোগ্য এবং রাজস্ব বাড়াতে তিনি সবকিছু করতে পারেন। সে কারণেই ফেডের ভল্টে আমাদের স্বর্ণ আর নিরাপদ নয়। যদি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উসকানি চলতে থাকে, তাহলে কী হবে? … ঝুঁকি বাড়ছে যে জার্মান বুন্ডেসব্যাংক হয়তো আর তার স্বর্ণে প্রবেশাধিকার পাবে না। তাই এ রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত।"
ইয়াগার জানান, গত বছরই তিনি বুন্ডেসব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে "স্বর্ণ দেশে ফিরিয়ে আনার" আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এতদিন পর্যন্ত আমেরিকা থেকে স্বর্ণ ফেরত আনার দাবি মূলত জার্মানির কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল–অলটারনেটিভ ফুর ডয়চল্যান্ড (এএফডি)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যারা দেশপ্রেমের যুক্তিতে বারবার এই দাবি তুলেছে। তবে এখন বিষয়টি ধীরে ধীরে মূলধারার আলোচনাতেও জায়গা করে নিচ্ছে।
জার্মান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ– বুন্ডেসটাগে বিরোধী গ্রিন পার্টির অর্থবিষয়ক মুখপাত্র ক্যাথারিনা বেকও স্বর্ণের বার স্থানান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি স্বর্ণের এই মজুতকে "স্থিতিশীলতা ও আস্থার গুরুত্বপূর্ণ নোঙর" হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলো যেন "ভূরাজনৈতিক বিরোধের দাবার ঘুঁটি" হয়ে না ওঠে।
তবে দেশটির অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতিবিদ এবং আইএফও অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি ক্লেমেন্স ফুয়েস্ট এই ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। রাইনিশে পোস্টকে তিনি বলেন, এতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি দেখা দিতে পারে এবং এটি "বর্তমান পরিস্থিতিতে আগুনে ঘি ঢালার" শামিল হবে।
জার্মানির মোট স্বর্ণভাণ্ডারের মূল্য প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ইউরো।
এর অর্ধেকের কিছুটা বেশি ফ্র্যাঙ্কফুর্ট আম মাইনে বুন্ডেসব্যাংকের কাছে রাখা আছে, আর ৩৭ শতাংশ নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে এবং ১২ শতাংশ রয়েছে লন্ডনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে। কারণ লন্ডন বৈশ্বিক স্বর্ণ বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বুন্ডেসব্যাংক জানায়, সংরক্ষিত সোনার নিয়মিত অডিট বা নিরীক্ষা করা হয়।
গত বছরের অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় বুন্ডেসব্যাংক এর প্রেসিডেন্ট ইয়োয়াখিম নাগেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা জার্মান স্বর্ণ নিয়ে "উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।"
জার্মান জোট সরকারের কনিষ্ঠ অংশীদার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সংসদীয় দলের আর্থিক নীতিবিষয়ক মুখপাত্র ফ্রাউকে হাইলিগেনস্টাডট বলেন, স্বর্ণভাণ্ডার নিয়ে উদ্বেগ তিনি বুঝতে পারেন, তবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, "জার্মানির স্বর্ণভাণ্ডার ভালোভাবে বৈচিত্র্যময় করা আছে।" এর অর্ধেক ফ্র্যাঙ্কফুর্টে থাকায় "আমাদের কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত রয়েছে।" নিউইয়র্কে স্বর্ণ রাখা যুক্তিসংগত বলেও তিনি মন্তব্য করেন, কারণ "জার্মানি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক নীতির ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।"
তবে পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের কড়া ভাষ্য জোরালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মের্ৎসের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যেও স্বর্ণ স্থানান্তরের পক্ষে কণ্ঠ বাড়ছে।
ডুসেলডর্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক উলরিকে নয়্যার রাইনিশে পোস্টকে বলেন, "ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আর নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়।"
