চরম সেনাসংকট, যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী: সতর্ক করলেন আইডিএফ-প্রধান
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)-এর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির বুধবার অনুষ্ঠিত এক নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকে সতর্ক করে বলেন, জনবল সংকটের সমাধান না হলে খুব শীঘ্রই আইডিএফ ভেঙে পড়তে পারে।
বৈঠকে জামির বলেন, 'আইডিএফ নিজের ভেতরেই ধসে পড়ার আগে আমি ১০টি বিষয়ে লাল পতাকা (বিপদ সংকেত) তুলে ধরেছি।' এই বক্তব্যের সত্যতা জেরুজালেম পোস্ট নিশ্চিত করেছে।
আইডিএফের সূত্রগুলোও জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের মধ্যে গুরুতর জনবল সংকট নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তারা আরও জানায়, এমনকি শান্তির সময়েও গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও পশ্চিম তীরের সীমান্তে কম নয়, বরং আরও বেশি সৈন্যের প্রয়োজন হবে।
সরকার যদি আরও সৈন্য যোগ না করে, তাহলে অনেক স্থানে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হবে বলেও তারা সতর্ক করেছে।
এছাড়া সেনাবাহিনীতে হরেদি (অতি-অর্থডক্স ইহুদি) জনগোষ্ঠীর নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর জন্য এখনো কোনো আইন কার্যকর করা হয়নি, যা জনবল সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
'অপারেশন রোয়ারিং লায়ন'-এর আগে সরকার দ্রুতগতিতে একটি বিতর্কিত আইন এগিয়ে নিচ্ছিল, যা হরেদিদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার কথা বলছিল।
সমালোচকরা বলেছিলেন, এই প্রস্তাবিত আইনটি আসলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোটে থাকা হরেদি দলগুলোকে সন্তুষ্ট করার একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং এটি বাস্তবে নিয়োগ নিশ্চিত করতে পারবে না।
যুদ্ধের মধ্যে হারেদি ড্রাফট বিল 'স্থগিত'
নেতানিয়াহু 'অপারেশন রোয়ারিং লায়ন'-এর শুরুতেই ঘোষণা দেন, জাতীয় ঐক্যের খাতিরে ড্রাফট বিলটি 'একপাশে সরিয়ে রাখা' হবে এবং যুদ্ধের সময় এটি নিয়ে আর কাজ হবে না।
জামিরের মন্তব্যের পর বিরোধী রাজনীতিবিদরা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং সতর্ক করে বলেন, প্রস্তুতির অভাব ও হরেদি নিয়োগ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেশের জন্য বড় নিরাপত্তা সংকট ডেকে আনতে পারে।
'ইয়েশ আতিদ' পার্টির সদস্যরা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান এমকে বোয়াজ বিসমাথকে একটি চিঠি পাঠিয়ে আইডিএফ-এর সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য জরুরি অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, বিসমাথের কমিটিই হারেদি ড্রাফট বিলটি তদারকি করছিল।
ইয়েশ আতিদ-এর চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হারেদি নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যাওয়া কেবল কোনো রাজনৈতিক বিবাদ নয়, বরং এটি একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি যা 'পিকুয়াচ নেফেশ' (জীবন বাঁচানোর বিষয়) পর্যায়ে পৌঁছেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, 'আমরা বহুবার সতর্ক করার পর এখন আর এটি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রধানের বক্তব্য প্রমাণ করে যে নিয়োগের অভাব ও রিজার্ভ সদস্যদের ওপর অতিরিক্ত চাপ আইডিএফের অভ্যন্তরীণ ভাঙন সৃষ্টি করছে।'
বিরোধী নেতা ইয়ার ল্যাপিড বলেন, 'পরবর্তী বিপর্যয়ের সময় সরকার বলতে পারবে না যে তারা জানত না। এর দায় তাদেরই।'
ইসরায়েল বেইতেনু-র নেতা অ্যাভিগডর লিবারম্যান সবাইকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের মতো সরকার এবারও বিপর্যয়ের আগের সতর্কতাগুলো উপেক্ষা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, 'স্বর্গের দোহাই লাগে, আপনারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন?'
তিনি আরও বলেন, শাস পার্টির নেতা আরিয়ে ডেরি এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম নেতা ইতজাক গোল্ডকনফ-এর ওপর নির্ভরশীল একটি সরকার নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।
ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির নেতা বেনি গ্যান্টজ বলেন, সরকার যখন 'মধ্যপ্রাচ্য বদলে দেওয়ার' ও যুদ্ধ জয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে নিয়োগ এড়ানোর প্রবণতাকে উৎসাহ দিচ্ছে এবং যুদ্ধ জেতার জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'পরবর্তী বিপর্যয় এলে আপনি এই লজ্জাজনক বিষয়টি চাপা দিতে পারবেন না, বলতে পারবেন না যে জানতেন না।'
সাবেক আইডিএফ প্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। কেবল এটিই ইসরায়েলকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে, আইডিএফের লক্ষ্য পূরণ করবে এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
রিজার্ভিস্ট পার্টির নেতা ইয়োয়াজ হেনডেল বলেন, 'সেনাপ্রধান ঠিকই বলেছেন। তার কথা শুনুন। বিজয়ের জন্য সৈন্য প্রয়োজন। সরকার বারবার রিজার্ভ সদস্যদের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তাদের সহ্যক্ষমতার শেষ সীমায় নিয়ে যাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ক্যামেরার সামনে সরকার নিয়োগ ফাঁকি দেওয়ার আইন স্থগিত রাখার কথা বললেও বাস্তবে তারা সেসব প্রতিষ্ঠানকেই টাকা দিচ্ছে যারা নিয়োগ এড়িয়ে যেতে উৎসাহিত করে।'
