একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হয়েও যেভাবে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এনে টিকে থাকছে ইরান
প্রায় ৫০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় কার্যত একঘরে ইরান। পারমাণবিক কর্মসূচি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো নানা অভিযোগ তুলে একের পর এক আন্তর্জাতিক দেওয়া হয়েছে দেশটির ওপর। ফলে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশ হয়ে উঠেছে ইরান।
তবে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ব্রিটেন ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বা তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে যতটা মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে, বাস্তব চিত্রটা তার চেয়ে বেশ কিছুটা আলাদা। নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই সাঁড়াশি চাপের মুখেও বিশ্বের বড় অংশের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন বজায় রাখতে পেরেছে তেহরান।
২০১৯ সাল থেকে অন্তত ১৭০টি দেশের সঙ্গে পণ্য আদানপ্রদান করেছে ইরান। আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের প্রভাবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী, বেকারত্ব চরম, প্রায়ই দেখা দেয় জনবিক্ষোভ। সব মিলিয়ে সামগ্রিক বাণিজ্যের গ্রাফ কিছুটা নিম্নমুখী হলেও অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, ইলেকট্রনিকস ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানিতে ছেদ পড়েনি। এসবের বদলে ইরান তেল, গ্যাস, নির্মাণসামগ্রী ও নানা বিশেষ ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে। অর্থাৎ পশ্চিমা দুনিয়ার নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে ঝটকা দিলেও তার কোমর পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন-এর সিইও এসফান্দিয়ার বাতমানগেলিদ বলেন, 'অনেকেই মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান বিশ্ববাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করতে ইরানের বাণিজ্য আরও জটিল ও বহুমুখী রূপ নিয়েছে।'
তবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের সামনে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করায় ইরান নিজেও কিন্তু সমস্যায় পড়েছে; ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি। অন্যদিকে ইসরায়েলি ও মার্কিন মিসাইলের হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা ও সেনাঘাঁটির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে। এখন দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চললেও, তা দীর্ঘস্থায়ী না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এমন বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও গত ৩০ বছরের বাণিজ্যিক গতিপ্রকৃতি বলছে, ৯ কোটি ৪০ লাখ মানুষের দেশটির অর্থনীতির এক আশ্চর্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো চরম পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই সক্ষমতাই বলে দিচ্ছে, প্রতিকূলতার মধ্যেও আগামী দিনে টিকে থাকার রসদ ঠিক খুঁজে নেবে ইরান।
ইরানের বড় অংশীদার চীন
ইরানের বাণিজ্যের নিখুঁত পরিসংখ্যান পাওয়া সহজ নয়। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই দেশটির সরকারি তথ্যের ওপর ভরসা করেন না। আবার তেহরানের সহযোগী দেশগুলোও অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের সঠিক অঙ্ক প্রকাশ্যে আনে না।
তা সত্ত্বেও এটুকু পরিষ্কার যে, বেইজিং এখন ইরানের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। গত দু-দশকে ইরানের আমদানি ও রপ্তানি—উভয় ক্ষেত্রেই চীনের অংশীদারি লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে।
করোনা মহামারি চলাকালীন বেইজিং ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী কয়েক দশকে তারা ইরানে ৪০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। বিনিময়ে ইরান থেকে তারা পাবে নিরবচ্ছিন্ন তেলের জোগান।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই কিনেছে চীন। শুধু তেল নয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাটলাস অভ ইকনমিক কমপ্লেক্সিটির তথ্যানুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইরানের তেল-বহির্ভূত রপ্তানি পণ্যের (মূলত রাসায়নিক ও ধাতু) প্রায় এক-চতুর্থাংশই গেছে চীনে। এসব পণ্যের আর্থিক মূল্য কয়েকশো কোটি ডলার।
এই বাণিজ্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো লেনদেনের মাধ্যম। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ব্যাংকগুলোকে এড়াতে ডলার পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। তার বদলে লেনদেন হচ্ছে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি-তে। বিনিময়ে ইরানের মোট আমদানি পণ্যের ৩০ শতাংশই আসছে চীন থেকে—যার মধ্যে আসবাবপত্র থেকে সূর্যমুখীর বীজ, সবই রয়েছে।
অফিশিয়াল পরিসংখ্যানের বাইরেও দুদেশের মধ্যে বাণিজ্যের আরেকটি গভীর ও গোপন স্তর রয়েছে। এখানে কাজ করে এক জটিল 'বার্টার সিস্টেম' বা পণ্য বিনিময় প্রথা। ইরান চীনকে তেল পাঠায়, আর তার বিনিময়ে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ সংস্থাগুলো ইরানে বিমানবন্দর বা অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে দেয়।
বিসেজ্ঞরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার ফাঁস এড়াতে ইরান বিশ্বজুড়ে এক 'ছায়া অর্থনীতি' (শ্যাডো ইকনমি) গড়ে তুলেছে। এই ব্যবস্থায় মূলত ব্যবহার করা হয় কিছু শেল কোম্পানি ও বেনামি মধ্যস্থতাকারীদের, যাতে প্রকৃত বিক্রেতার পরিচয় গোপন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংক ও তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পণ্য ঘুরিয়ে পাঠিয়ে ইরানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মুছে ফেলা হয়।
তেল-নির্ভরতা থেকে বহুমুখী অর্থনীতি
বিশ বছর আগেও ইরানের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ ছিল পেট্রোলিয়াম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্ভরতা কমেছে, বৈচিত্র্য এসেছে অর্থনীতিতে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যখন ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়, তখন থেকেই এই পরিবর্তনের গতি বাড়ে।
এসফান্দিয়ার বাতমানগেলিদজ বলেন, '২০১২ সালের আগপর্যন্ত ইরানের অর্থনীতিতে তেমন বড় চাপ পড়েনি। ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইরানিদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল। দফলে অর্থনীতিও বিকশিত হচ্ছিল।'
তেল বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল মূলত ইরানের সঙ্গে কোম্পানিগুলো থেকে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে। এই পদক্ষেপ ইরানকে বাধ্য করেছে অন্যান্য ক্ষেত্রে নতুন অংশীদার খুঁজে নিতে। তথ্য বলছে, এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের কড়াকড়ি শুরু করলে ইরান তার পুরনো কৌশলেই ফিরে যায়।
হার্ভার্ডের তথ্য বলছে, এই সময়ে ইরান প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের তেল-বহির্ভূত পণ্য রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক কোস্টারিকা, ইকুয়েডর বা ক্রোয়েশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় সমান।
তুরুপের তাস ভৌগোলিক অবস্থান
ইরানের টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে তার ভৌগোলিক অবস্থান। জলপথ ও স্থলপথ—দুই ক্ষেত্রেই ইরানের বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক ও তুরস্কসহ সাতটি দেশের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। একদিকে কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর, অন্যদিকে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রে ইরান নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য অবস্থানে ধরে রাখতে পেরেছে।
চীন বাদেও ইরানের পণ্যের অন্যতম প্রধান ক্রেতা হলো তুরস্ক ও ইরাক। ২০১৯ সাল থেকে দেশটির তেল-বহির্ভূত মোট রপ্তানি বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে এই তিন দেশের সঙ্গে।
ইরানের সিমেন্ট ও ভেড়ার অন্যতম প্রধান ক্রেতা হলো কুয়েত। অন্যদিকে বুলগেরিয়া, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো বিপুল পরিমাণ প্যাকিং সামগ্রী কেনে তেহরানের থেকে। এমনকি স্পেনে যে পরিমাণ জাফরান আমদানি করা হয়, তার সিংহভাগই যায় ইরান থেকে।
আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ছে
বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরান এখন দেশের ভেতরেই প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। দেশটিতে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী উৎপাদন ক্ষেত্র—যেখানে অটোমোবাইল, ইস্পাত, লোহা, ইলেকট্রনিকস ও ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যও উৎপাদিত হয়।
ইউনিভার্সিটি অভ ম্যারিল্যান্ডের সেন্টার ফর গ্লোবাল বিজনেস-এর ডিরেক্টর কিসলয় প্রসাদের কথায়, 'স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তারা সুসংহত প্রচেষ্টা চালিয়েছে।'
তবে মুশকিল হলো, নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা যন্ত্রাংশ আমদানি ইরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও ইরানের মোট আমদানির অর্ধেকের বেশি আসত ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। আজ তা কমে ২০ শতাংশের নিচে নেমেছে।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে ইলেকট্রনিকস, ভারত থেকে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ চাল এবং ব্রাজিল থেকে সয়াবিন ও ভুট্টা আমদানি করছে ইরান।
বুর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের বাতমানগেলিদজের মতে, ইরানের তেল বাণিজ্যে বাধা দেওয়ার চেয়ে আমদানি রুখে দেওয়ার চেষ্টা অনেক বেশি ক্ষতি করেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের অর্থনীতির এই বহুমুখীকরণ শুধু সরকারি নীতির ফল নয়। বরং 'কোম্পানিগুলো নিজেরাই প্রতিকূলতার মধ্যে বিশ্ববাজারে নতুন রপ্তানির সুযোগ খুঁজে নিয়েছে'।
তবে ইরানের এই বিশ্ববাণিজ্যের মাত্রা ঠিক কতটা, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুমাননির্ভর। হার্ভার্ডের গবেষক সেবাস্টিয়ান বুস্টোস মনে করেন, বন্দরে পণ্য ওঠানামার নথি থাকলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তথ্যে অনেক ফাঁক থেকে যায়। উন্নয়নশীল এবং বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে তথ্যের এই ঘাটতি আরও প্রকট।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকে এবং সংঘাত আরও তীব্র হয়, তবে যুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
বিশেষ করে সম্প্রতি শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ঘরবাড়ি, স্কুল, কারখানা, গবেষণাগার, পরিবহন কেন্দ্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ।
তেহরান যেকোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে আমেরিকা ও অন্যান্য দেশ ইরানের অর্থনীতিকে যতটা চাপে রেখেছে, ইরানও হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তৈরি করে বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়সড় কম্পন তোলার ক্ষমতা রাখে।
