মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও হরমুজে ইরানের প্রভাব কেন অটুট—ভূগোলই বড় শক্তি
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির আওতায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই জাহাজ চলাচল সহজ করার কথা বলেছে। কিন্তু, তার এক সপ্তাহ পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল সীমিতই রয়েছে। বরং উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তাদের নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে টোল দিতে বলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে "চাঁদাবাজি" আখ্যা দিয়ে রোববার ঘোষণা দেন, ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়া জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনী অবরুদ্ধ করে রাখবে। তাঁর এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই নাজুক অবস্থায় থাকা যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে এই নৌ অবরোধের মাধ্যমে ওয়াশিংটন যখন অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে, তখন তেহরানের হাতে রয়েছে একটি বড় সুবিধা—ভূগোল। ছয় সপ্তাহের সংঘাতে ইরান তাদের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে প্রায় পুরো নৌচলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং এই নৌপথের ভৌগোলিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে। এমনকি মার্কিন অবরোধের মধ্যেও এই বাস্তবতা বদলায়নি। বরং এরমধ্যেই ইরানকে ঠিক করে দিতে দিচ্ছে—কোন জাহাজ প্রণালি নিরাপদে পার হবে, আর কে ঝুঁকিতে থাকবে।
আনুষ্ঠানিক অবরোধের চেয়েও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ঝুঁকি। বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর প্রতিদিন গড়ে মাত্র সাতটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে, যেখানে যুদ্ধের আগে দৈনিক ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত। কোপেনহেগেনভিত্তিক শিপিং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ভেসপুচ্চি মেরিটাইমের লার্স জেনসেন বলেন, "বাস্তবে যুদ্ধবিরতি প্রণালির পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তনই আনেনি—একেবারেই না।"
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এর ভূগোল এই অচলাবস্থাকে নির্ধারণ করছে—সেটাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
যেমন ইরানের দুর্গম উপকূলরেখা ছোট আকারের হামলাকারী নৌযানের জন্য কার্যত নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।
উপকূলবর্তী উঁচু ভূখণ্ড নজরদারির জন্য পরিষ্কার সুবিধা দেয় এবং সেখান থেকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করাও যায় সহজে।
হরমুজ প্রণালি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপগুলো থেকেও চলাচলরত জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব।
এই প্রণালির মুখে অবস্থিত বন্দর আব্বাস ইরানকে দ্রুত নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে নৌচলাচল পর্যবেক্ষণ বা ব্যাহত করার সক্ষমতা দেয়।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যাপক বাসিল জারমন্ড বলেন, "সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য কম খরচে ইরানের 'অ্যান্টি-অ্যাকসেস' ও 'এরিয়া-ডিনায়াল' সক্ষমতাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলেছে।"
এই কৌশলগুলো, আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বিশাল আকার। এসব জাহাজকে আবার ধীরগতিতে প্রণালি পারি দিতে হয়—যা পুরো পথটিকে সংঘাতের সময়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব জাহাজের হুমকি শনাক্ত করার সক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ গ্যালগানো বলেন, "ইরানিরা এই প্রণালিতে বলতে গেলে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলার মতো কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুবই কম।"
স্বল্প খরচের ড্রোন ও মাইনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানের হুমকির মুখে রাখার সক্ষমতা—ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন, ইরান যতই দুর্বল হোক না কেন, এই ধরনের হামলা অব্যাহত থাকতে পারে।
যুদ্ধবিরতির পর থেকে সরাসরি কোনো জাহাজে হামলার ঘটনা না ঘটলেও—ঝুঁকির বিষয়টিই এখন নৌচলাচল স্থবির করে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। বিশ্লেষক জারমন্ড বলেন, "যতদিন তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখবে, ততদিন শিপিং কোম্পানিগুলো এই প্রণালি এড়িয়ে চলবে।"
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ঘোষণার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের বন্দর হুমকির মুখে পড়লে পাল্টা আঘাত হানবে—যা শিপিং কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের টোল ব্যবস্থা নতুন আইনি ঝুঁকি তৈরি করেছে। যে জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচলের জন্য রেভল্যুশনারি গার্ডকে অর্থ দিচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে বলে বিবেচিত হতে পারে—ফলে জাহাজের অপারেটররা এই নৌপথ ব্যবহাড়ে আরও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
হরমুজের পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে শিপিং অপারেটররা এখনো অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের অবস্থানে রয়েছে। মেরিটাইম এআই প্ল্যাটফর্ম উইন্ডওয়ার্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ৭০০টির বেশি জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে ছিল।
বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েড গত বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, "হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। বর্তমান ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমরা আপাতত এই পথে চলাচল থেকে বিরত রয়েছি।"
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাভাবিক নৌচলাচল ফিরিয়ে আনতে হলে—শিপিং খাতকে নিশ্চিত হতে হবে যে যুদ্ধবিরতি টিকবে এবং ইরান চলমান জাহাজে হামলা করবে না। শিপিংখাতের বিশ্লেষক লার্স জেনসেন বলেন, "আপনি যদি জাহাজ নিয়ে প্রণালি অর্ধেক পার হয়ে যান আর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়, তাহলে নাবিকরা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই একটি স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি না দেখা পর্যন্ত কেউই ঝুঁকি নিতে চাইবে না।"
তবে এই আস্থা নির্ভর করছে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর। বিশ্লেষক জারমন্ড বলেন, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত রাখা ইরানের স্বার্থেই—কারণ এটি তাদের হাতে থাকা শেষ গুরুত্বপূর্ণ চাপের একটি। "তেহরান যদি সত্যিই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে চায়, তাহলে তাদের প্রণালি সংক্রান্ত শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল বাড়াতে হবে। কিন্তু যদি তারা চাপ ধরে রাখতে চলাচল সীমিত রাখে, তাহলে পুরো যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে তাদের জন্য এটি খুব সূক্ষ্ম এক ভারসাম্যের খেলা।"
