হরমুজ প্রণালি: ফিরে দেখা সংঘাতের ৫০০ বছর
পারস্য উপসাগরের এক সরু জলপথ, নাম তার হরমুজ প্রণালি। এর সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২ মাইল প্রশস্ত। ভৌগোলিকভাবে এটি বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম 'চোকপয়েন্ট'ও বটে। ইরান, ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহনকারী ট্যাঙ্কারগুলো এই পথ দিয়েই যাতায়াত করে। এমনকি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশই পার হয় এই ক্ষুদ্র জলপথ দিয়ে। বলাই চলে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো বিশ্ব তেলের বাজারের চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখা।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান এই প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব দাবি করে আসছে। মার্কিন-সমর্থিত শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক বৈরী। কয়েক দশক ধরে ইরান বারবার হুমকি দিয়ে আসছে, কোনো সংঘাত শুরু হলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহব্যবস্থায় ধস নামিয়ে দেবে। দীর্ঘদিনের সেই আশঙ্কা শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো ২০২৬ সালের মার্চ মাসে।
ডেলওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানবিষয়ক ইতিহাসের অধ্যাপক রুডলফ ম্যাথি বলেন, আজকের প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগর মানেই তেলের রাজনীতি, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর আগে এই অঞ্চলের ইতিহাস ছিল ভিন্ন। 'ঐতিহাসিকভাবে বলতে গেলে, তেলের জন্য পারস্য উপসাগরের সংঘাত বেশ নতুন। অথচ হরমুজ প্রণালির অস্তিত্ব হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই এটি ছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ স্থাপন করে,' বলেন তিনি।
তেলের রাজনীতি বর্তমান বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করলেও আদিকাল থেকেই এই হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক অপরিহার্য ও ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন হিসেবে টিকে আছে।
ইতিহাসের পাতায় হরমুজ প্রণালি সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেন এই জলপথটি যুগে যুগে ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে উঠে এসেছে, তা বুঝতে হলে ইতিহাসের সাতটি বড় ঘটনার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
১৫০৭: পর্তুগিজদের দখল ও আধিপত্য
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ও ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপীয় নাবিকেরা যখন ভারতের দিকে আসার জলপথ খুঁজছিলেন, তখনই তাঁদের নজর পড়ে পারস্য উপসাগরের দিকে। ১৫০৭ সালে পর্তুগিজ নৌবহর এই অঞ্চলে এসে পৌঁছায় এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ দ্বীপটি দখলে নেয়। সেখানে তারা একটি শক্তিশালী দুর্গ ও শুল্ক দপ্তর গড়ে তোলে। তখন এই পথ দিয়ে ভারত ও আরববিশ্বের মধ্যে সিল্ক, সুগন্ধি মসলা, দামি মুক্তা ও নামী আরবীয় ঘোড়া কেনাবেচা হতো। পর্তুগিজদের মূল লক্ষ্যই ছিল এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল পরিমাণ শুল্ক বা নজরানা আদায় করা।
'দ্য পলিটিকস অব ট্রেড ইন সাফাভিদ ইরান' বইয়ের লেখক ও ইতিহাসবিদ রুডলফ ম্যাথি জানান, পর্তুগিজরা তখন 'কার্তাজাস' নামে একধরনের বিশেষ বাণিজ্যিক পারমিট চালু করেছিল। এই পারমিট ছাড়া কোনো জাহাজের পারস্য উপসাগরে যাতায়াত করার কোনো জো ছিল না। পুরো অঞ্চলটিকেই একরকম নিজেদের জমিদারিতে পরিণত করেছিল পর্তুগিজরা। কিন্তু তাদের এই দমন-পীড়ন ও জোর-জুলুম স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই জলপথে একচেটিয়া রাজত্ব করে নিজেদের ধনভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছিল পর্তুগিজরা। কিন্তু ১৬২২ সালে তাদের এই দাপটের পতন ঘটে। তখন পারস্যের সিংহাসনে সাফাভি রাজবংশের সম্রাট শাহ আব্বাস। পর্তুগিজদের হটাতে তিনি হাত মেলান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে। লোভনীয় বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার শর্তে ব্রিটিশরা সাফাভিদের শক্তিশালী নৌবহর পাঠায়। শেষ পর্যন্ত পারস্য ও ব্রিটিশদের এই যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজয় ঘটে পর্তুগিজদের। আর এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে হরমুজ প্রণালিতে পর্তুগিজদের দীর্ঘ ১০০ বছরের আধিপত্যের।
১৯৫১ সাল: ইরানের তেল জাতীয়করণ ও ব্রিটিশ নৌ-অবরোধ
পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ১৯৫১ সাল ছিল ইতিহাসের অন্যতম সন্ধিক্ষণ। ১৯০৮ সালে ইরানে তেল আবিষ্কারের পর থেকেই এর ওপর ব্রিটিশদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। পরবর্তী সময়ে এটিই 'অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি' নামে পরিচিতি পায়, যা আজ আমরা 'বিপি' হিসেবে জানি। ১৯৩৩ সালে এক অসম চুক্তির মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ব্রিটিশরা।
১৯৫১ সালে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক এক ঘোষণা দিয়ে বসেন। তিনি ঘোষণা দেন, ইরান তাদের তেলশিল্পকে জাতীয়করণ করছে। এর আওতায় সে সময়ের বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগার 'আবাদান' শোধনাগারটিও ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
অধ্যাপক রুডলফ ম্যাথি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ব্রিটিশদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল এমন, তেল আমাদের, তাই এর মুনাফায় ব্রিটিশদের চেয়ে আমাদেরই অংশ বেশি থাকা উচিত।'
মোসাদ্দেকের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ব্রিটিশরা সামরিক প্রতিক্রিয়ায় 'রয়্যাল নেভি' পাঠায়। তারা আবাদান বন্দরের চারদিকে কঠোর অবরোধ তৈরি করে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার যাতে বের হতে না পারে, তা নিশ্চিত করে। অধ্যাপক ম্যাথি বলেন, 'ব্রিটিশরা মূলত ইরানের বিশ্ববাজারের পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছিল।'
তত দিনে মোসাদ্দেক সাধারণ ইরানিদের কাছে জাতীয় বীর হয়ে উঠেছেন। কিন্তু পশ্চিমের কাছে তিনি ছিলেন এক বড় 'মাথাব্যথা'। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মদদে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং নির্বাসিত শাহকে আবারও ক্ষমতায় বসানো হয়। এই অভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ইরানের তেলের মুনাফা ইরান এবং পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমানভাবে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন চুক্তি হলেও সেই যে আস্থার সংকট তৈরি হলো, তা আর কোনো দিন কাটেনি।
১৯৮৪: 'ট্যাঙ্কার যুদ্ধ'
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ও তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এরই মধ্যে ১৯৮০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শত্রু ইরানকে দমানোর লক্ষ্যে সাদ্দামকে সমর্থন দেয়। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এই ইরান-ইরাক যুদ্ধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।
যুদ্ধের একপর্যায়ে উভয় পক্ষই একে অপরের তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করে। ১৯৮৪ সালে ইরাক কয়েকটি ইরানি ট্যাঙ্কারে হামলা চালালে ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। ইরান পারস্য উপসাগরে নৌ-মাইন পেতে রাখে এবং সশস্ত্র স্পিডবোট দিয়ে ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবের ট্যাঙ্কারগুলোকে হয়রানি করতে থাকে। এই সময় ইতিহাসে পরিচিত 'ট্যাঙ্কার যুদ্ধ' হিসেবে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ ট্যাঙ্কারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে।
১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফ্রিগেট 'ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস' ইরানের পেতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করে 'অপারেশন প্রেয়িং মান্তিস'। এটি ছিল একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান। এই অভিযানে ইরানের নৌবাহিনীর বেশির ভাগ জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয় বা অকেজো করে ফেলা হয়।
এই সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই সেই বছরের শেষ দিকে আরও একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ ভুলবশত ইরান এয়ারের ৬৫৫ নম্বর ফ্লাইটটিকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সেই বাণিজ্যিক ফ্লাইটে থাকা ২৯০ জন বেসামরিক যাত্রীই প্রাণ হারান। আশির দশকের এই ঘটনাগুলো হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম উত্তপ্ত অঞ্চলে পরিণত করেছিল।
২০১২: হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি ও পারমাণবিক বিতর্ক
অধ্যাপক রুডলফ ম্যাথির মতে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যখন ইরান আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়েছিল, তখনই তাদের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইরানের এই বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শুরু করে।
শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি। ২০০৮ সালে ইরান প্রথমবারের মতো হুমকি দেয়, নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে তারা হরমুজ প্রণালি চিরতরে বন্ধ করে দেবে। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনও এই হুমকিকে হালকাভাবে নেয়নি। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এমন পদক্ষেপ সরাসরি 'যুদ্ধের শামিল' হিসেবে গণ্য হবে।
উত্তেজনার পারদ আরও চড়ে ২০১২ সালে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের তেলের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। জবাবে তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দেয়, যা বাস্তবায়ন হলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
ইরানের সেই হুমকিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিমানবাহী রণতরি ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে মহড়াও দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত ইরান সেই পদক্ষেপ নেওয়া থেকে পিছিয়ে আসে।
অধ্যাপক ম্যাথির ভাষায়, '১৯৭৯ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ ধরনের উত্তেজনা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ইরানের বিপ্লব-পরবর্তী নীতিতেই ছিল—'যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক' বা 'ইসরায়েল নিপাত যাক'-এর মতো বিপ্লবী অবস্থান। ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে এই ধরনের রেষারেষি বা অচলাবস্থা ইরানের কাছে এক নিয়মিত রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
২০১৫-২০২৪: ট্যাঙ্কার জব্দ ও হামলা
হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো অত্যন্ত সরু। ইরান দাবি করে, তাদের উপকূলরেখার ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যেকোনো জাহাজ প্রবেশ করলে তা আটক বা তল্লাশি করার আইনি অধিকার তাদের রয়েছে। ২০১৫-২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইরান এই নীতিকে ব্যবহার করেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাহাজে নানাভাবে বাধা দিয়েছে বা আটক করেছে।
২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইরান কোস্ট গার্ডের টহল বোটগুলো ডেনমার্কের মালিকানাধীন কন্টেইনারবাহী জাহাজ 'মার্স্ক টাইগ্রিস'-এর দিকে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে এবং জাহাজটিকে আটক করে। ইরান দাবি করেছিল, এটি জাহাজমালিকের সঙ্গে তাদের একটি আইনি বিরোধের অংশ। পরে ২০১৯ সালে জিব্রাল্টার প্রণালিতে ব্রিটিশ নৌবাহিনী একটি ইরানি ট্যাঙ্কার আটক করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান একটি ব্রিটিশ পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করে। সবশেষ ২০২৪ সালেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান বৃহত্তর হামলার অংশ হিসেবে ইরানের বিশেষ বাহিনী একটি তেল ট্যাঙ্কার দখল করে নেয়।
২০২৩ সালে মার্কিন নৌবাহিনী এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২১ সাল থেকে ইরান আন্তর্জাতিক পতাকাবাহী প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করেছে বা বাধা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তাদের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব দিতেই মূলত হরমুজ প্রণালিকে একটি 'কৌশলগত যুদ্ধের ক্ষেত্র' হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
২০২৫: হরমুজ প্রণালি বন্ধের পক্ষে ইরানি পার্লামেন্টের ভোট
ইরানের ভূখণ্ডের খুব কাছে অবস্থান হওয়ায় দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরেই উদ্বিগ্ন ছিল। সেই উদ্বেগ থেকে ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল প্রথমবারের মতো ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইরানের মাটিতে এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম সরাসরি আক্রমণ। জবাবে ইরানও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। এই সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়; কারণ, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে ইরান যেকোনো মুহূর্তে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর আওতায় মার্কিন বিমানবাহিনী বি-২ বোমারু বিমান ও 'বাঙ্কার-বাস্টার' বোমা ব্যবহার করে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানে। এর জবাবে ইরানও বসে থাকেনি। তারা দ্রুত পাল্টা হামলার ঘোষণা দিয়ে প্রতিবেশী দেশ কাতার ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায়, তাদের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে কার্যক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কয়েক দিন পরই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসায় বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
২০২৬: খামেনি হত্যাকাণ্ডের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ইরানের
কয়েক দশক ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির পর চলতি বছর ইরান অবশেষে সেই পদক্ষেপই নিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক অভিযানের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরই মূলত পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ পায়। খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ইরান সরাসরি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
২০২৬ সালের ২ মার্চ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ঘোষণা করেন, 'হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি বন্ধ। যদি কেউ এটি অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তবে রেভল্যুশনারি গার্ড ও নিয়মিত নৌবাহিনীর বীর যোদ্ধারা সেই জাহাজগুলো জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে।' ইরান শুধু হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজ ও মালবাহী নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু বানায়।
এই সিদ্ধান্তে ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এবং এই পরিস্থিতি কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং গোটা বিশ্বকে এক তীব্র অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অধ্যাপক রুডলফ ম্যাথির মতে, 'ইরানি শাসকেরা দীর্ঘ সময় ধরেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো চূড়ান্ত হামলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিল। তাই তারা বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করবে, এমনটি আশা করা ঠিক ছিল না। তাদের পুরো অস্তিত্বই দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি এই বিদ্রোহ ও চ্যালেঞ্জ জানানোর ওপর। এই সংঘাতের মাধ্যমে মূলত তারা গোটা বিশ্বকে নিজেদের শক্তির জানানই দিতে চেয়েছে।'
অতি সংকীর্ণ এই জলপথ যে কীভাবে গোটা বিশ্বের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারে, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় এক নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সংযোজন। এবং এই বহুমুখী সংকট ও অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ খুঁজতে আজ হিমশিম খাচ্ছে গোটা বিশ্ব।
