লোহিত সাগর বন্ধ করে দিতে পারে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ অবরোধ তুলে নিতে সৌদির চাপ
হরমুজ প্রণালি থেকে সামরিক অবরোধ তুলে নিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। আরব কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অবরোধের কারণে ইরান আরও ক্ষুব্ধ হতে পারে। এর জেরে তারা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতেই এই অবরোধ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আরব কর্মকর্তাদের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি আরব এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে। দেশটির আশঙ্কা, অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়েই সৌদি আরব তাদের অবশিষ্ট তেল রপ্তানি করে থাকে।
বাব আল-মান্দেব হলো ইয়েমেন ও হর্ন অভ আফ্রিকার মাঝখানের একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া এই প্রণালি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
এই যুদ্ধের শুরুর দিকেই জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই হরমুজ প্রণালি খোলার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও সৌদি আরব সম্প্রতি তাদের তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। মরুভূমির ভেতর দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে অপরিশোধিত তেল পাঠিয়ে তারা প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। কিন্তু লোহিত সাগর থেকে বের হওয়ার পথটি (বাব আল-মান্দেব) বন্ধ হয়ে গেলে এই সরবরাহ হুমকিতে পড়বে।
তাই বাব আল-মান্দেবে জাহাজের ওপর যেকোনো হামলা সৌদি আরবের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি আরব পারস্য উপসাগরের রাস তানুরা স্থাপনা থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নেয়।
ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেবের কাছের উপকূলের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। আরব কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণালিটি আবার বন্ধ করে দিতে হুথিদের ওপর চাপ দিচ্ছে ইরান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো ও ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন বলেন, 'ইরান যদি সত্যিই বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে চায়, তবে হুথিরাই তাদের প্রধান সহযোগী হবে। গাজা সংঘাতে হুথিদের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে এই সক্ষমতা তাদের রয়েছে।'
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধের আগে বাব আল-মান্দেব দিয়ে ৯৩ লাখ ব্যারেল তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য যেত। হুথিদের হামলার পর তা অর্ধেকে নেমে আসে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে। বাহিনীটির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, অবরোধের কারণে ইরান লোহিত সাগরের ওই প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়েতি গত ৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, 'ইরান হরমুজ প্রণালিকে যেভাবে দেখে, বাব আল-মান্দেবকেও ঠিক সেভাবেই বিবেচনা করে। হোয়াইট হাউস যদি তাদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করার কথা ভাবে, তবে তারা দ্রুতই বুঝতে পারবে যে মাত্র একটি সংকেতেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ বিঘ্নিত করা সম্ভব।'
সৌদি আরবের জ্বালানি কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, হুথিরা বাব আল-মান্দেব দিয়ে যাওয়া তাদের কোনো জাহাজে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, পরিস্থিতি যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। ইরানের চাপে হুথিরা এই সংঘাতে আরও আগ্রাসীভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি তারা জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি-ও আরোপ করতে পারে।
সুইডিশ ব্যাংক এসইবির এরিক মেয়ারসন বলেন, 'এটি ইরানের দিক থেকে পাল্টা আঘাত করার একটি কৌশল হতে পারে। ইরান বোঝাতে চাইছে, তোমরা যদি আমাদের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করো, তবে আমরাও তোমাদের ইয়ানবু টার্মিনালের রপ্তানি ব্যাহত করব।'
উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না যুদ্ধ শেষে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকুক। কারণ এটি তাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। তবে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবসহ অনেক দেশই এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফেরার চাপ দিচ্ছে। তারা আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রকাশ্যে দুই পক্ষ কঠোর অবস্থান নিলেও তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখছে। যথেষ্ট নমনীয়তা দেখালে তারা আলোচনায় বসতেও রাজি।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি করানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ট্রাম্প ইরানে বোমা হামলার হুমকি দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, 'জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খোলা দেখতে চান। এই বিষয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট।' কেলি আরও বলেন, 'উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ইরান যেন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশকে ব্ল্যাকমেইল করতে না পারে, তা নিশ্চিত করে প্রেসিডেন্ট মিত্রদের সহায়তা করছেন।'
এদিকে গত সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি নিউজে প্রকাশিত সশস্ত্র বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে ইরানের বন্দরগুলোর নিরাপত্তা যদি হুমকির মুখে পড়ে, তবে এখানকার আর কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।'
