লিমারেন্স: যখন ক্রাশ পরিণত হয় পাগলামিতে
তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক, সবকিছু গ্রাস করে নেওয়া এক অদ্ভুত অনুভূতির নাম 'লিমারেন্স'। রোমান্টিক আকর্ষণের এই স্বল্পপরিচিত রূপ মানুষের জীবনে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী টম বেলামি সুখের সংসার করছিলেন। হঠাৎ তার এক নারী সহকর্মীর প্রতি তার অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হয়। তিনি তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন। ওই সহকর্মীর সঙ্গে প্রেমের কোনো সম্পর্ক শুরু করতে চাননি, এমনকি তাকে নিজের অনুভূতির কথাও জানাননি। তবুও তিনি কিছুতেই তার কথা ভাবা বন্ধ করতে পারছিলেন না।
শুনতে সাধারণ 'ক্রাশ' বা মোহ মনে হলেও, বেলামি এর নাম দিয়েছেন লিমারেন্স। ১৯৭০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানের এই পরিভাষাটি চালু হয়। বেলামি ও অন্য গবেষকদের মতে, লিমারেন্স হলো অন্য একজন মানুষের প্রতি এক তীব্র, গ্রাসকারী ও প্রায়ই আবেশমূলক টান, যা সাধারণ রোমান্টিক অনুভূতির চেয়ে একেবারেই আলাদা।
বেলামি বলেন, 'লিমারেন্সকে সবচেয়ে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় মনের এক পরিবর্তিত অবস্থা হিসেবে।' শুরুতে এটি দারুণ লাগে, মনে হয় যেন এক ধরনের নেশা, যা শক্তি ও আশাবাদ বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, 'এ কারণেই এটি নেশার মতো। আপনার মাথায় চিন্তার ঝড় বয়, আর আপনি সব মিলিয়ে বেশি আশাবাদী ও উল্লসিত বোধ করেন।'
গুগল ট্রেন্ডস বলছে, ২০২০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে লিমারেন্স নিয়ে খোঁজাখুঁজি বেড়েছে। অনলাইনেও এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। মানুষ জানতে চাইছে কখন এবং কেন ভালোবাসা পাগলামিতে রূপ নেয় এবং আক্রান্তরা কী করতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানী ডরোথি টেনভ ১৯৭৯ সালে তার 'লাভ অ্যান্ড লিমারেন্স' বইয়ে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, 'লিমারেন্স এমন একটা বিষয় যা আমাদের ইচ্ছার বাইরেই ঘটে।' রোমান্টিক প্রেম নিয়ে ৩০০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তিনি এমন এক অদ্ভুত ঘটনার খোঁজ পান, যার তখনো কোনো নাম ছিল না। এটি হলো অন্য একজন মানুষের জন্য এক অনিচ্ছাকৃত, অনধিকার প্রবেশকারী এবং অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা।
মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় ওই আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে বলা হয় 'লিমেরেন্ট অবজেক্ট'। তবে লিমারেন্স মানেই যে মানুষটি অপরজনের পিছু নেবে বা তার মনোযোগ পাওয়ার অধিকার ফলাবে, তা নয়। যদিও গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে লিমারেন্স স্টকিং বা পিছু নেওয়ার মতো ক্ষতিকর আচরণেও রূপ নিতে পারে।
টেনভ লিখেছেন, লিমারেন্স জীবনে একবার বা একাধিকবার হতে পারে। এটি গড়ে ১৮ মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে কারও কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
টেনভের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লিমারেন্স যদি ঠিকমতো সামলানো না যায়, তবে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
বেলামি এটিকে একটি 'যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা' বলেছেন। তিনি বলেন, 'আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম—যৌক্তিকভাবে এর কোনো ভালো শেষ নেই, এবং আমি এমনটা হোক তা চাইনি। কিন্তু আমি আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।' তার মতে, এই পর্যায়ে এসে এটি ভীতিকর হতে পারে, কারণ তখন নিজেকে 'অসহায়' ও নিয়ন্ত্রণহীন মনে হয়।
আশার আলো
আপনি কি সত্যিই প্রেমে পড়েছেন নাকি লিমারেন্সে আক্রান্ত, বুঝবেন কীভাবে?
লিমারেন্স নিয়ে বই লেখা বেলামি বলেন, লিমারেন্সের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। সাধারণ প্রেমে মানুষ অনিশ্চয়তার প্রাথমিক ধাপ পার হয়ে যায়। ভালোবাসা পেলে শান্তি ও আনন্দ পায়, আর না পেলে দুঃখ পায়। কিন্তু গবেষকদের মতে, লিমারেন্সে আক্রান্ত ব্যক্তি সেই অনিশ্চয়তা, আকাঙ্ক্ষা এবং আশার জগতেই আটকে থাকেন।
বেলামি বলেন, অনিশ্চয়তাই এটিকে 'নেশা' বা আসক্তিতে পরিণত করার প্রধান চালিকাশক্তি। এই অবস্থাকে তিনি 'গ্লিমার' বা আশার আলো বলেন। অর্থাৎ, সম্পর্ক না হলেও অন্তত একটু যোগাযোগ বা সাড়া পাওয়ার ক্ষীণ আশা।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ চিচেস্টারের কগনিটিভ-বিহেভিয়ারাল সাইকোলজিস্ট ইয়ান টিনডাল বলেন, 'এদের অনেকে শারীরিক বা রোমান্টিক সম্পর্কও চায় না। তারা শুধু চায় তাদের অনুভূতির প্রতিদান দেওয়া হোক।' অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, তাদের প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষাও তত বাড়ে, সঙ্গে থাকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়।
টিনডাল জানান, লিমারেন্স আক্রান্ত ব্যক্তিকে এতটাই যন্ত্রণায় ফেলে যে তারা নিজেদের যত্ন নেওয়া ছেড়ে দেয়। খাওয়া, ঘুম, পরিচ্ছন্নতা ভুলে যায়, চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারে না এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। তারা সারাক্ষণ ওই মানুষের কথা ভাবে, অতীতের ছোট ছোট কথার মানে খোঁজার চেষ্টা করে। অন্য কোনো কিছুর জন্যই তাদের জীবনে আর জায়গা থাকে না।
এ কারণেই এটি 'ইনফ্যাচুয়েশন' বা মোহের চেয়ে আলাদা। মোহ সাধারণত প্রেমের শুরুতে হয় এবং ৩ থেকে ৬ মাস (কখনো এক বছর) থাকে। কিন্তু মোহে শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যের এত ক্ষতি হয় না। টিনডাল বলেন, 'মোহে মানুষ চোখের ইশারা বা ভ্রু কোঁচকানোর মতো প্রতিটি ছোট বিষয় নিয়ে এত পাগলের মতো ভাবে না।'
যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ক্যাথলিন কারসওয়েল বলেন, লিমারেন্স সাধারণ রোমান্টিক আবেগের চেয়েও আলাদা। রোমান্টিক আবেগে মানুষ শারীরিক ও মানসিক নৈকট্য চায়। কিন্তু লিমারেন্সে আক্রান্ত ব্যক্তি নৈকট্যের পাশাপাশি সারাক্ষণ শুধু তাকে নিয়েই ভাবতে থাকে।
অবশ্য রোমান্টিক আবেগ এবং লিমারেন্সের মধ্যে কিছু মিল থাকতে পারে। কারণ রোমান্টিক আবেগেও অনেক সময় নেশার মতো পাগলামি থাকে।
তবে সবাই এর সঙ্গে একমত নন। ২০০৮ সালে দুই গবেষক দাবি করেছিলেন, লিমারেন্স এবং ভালোবাসা সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের মতে, লিমারেন্স হলো 'নেতিবাচক, সমস্যামূলক এবং ক্ষতিকারক'।
লিমারেন্স কি অনন্য?
লিমারেন্স নিয়ে এখনো অনেক কিছুই আমাদের অজানা। গবেষণায় মানুষের সংখ্যা কম থাকায় কতজন এতে ভোগেন, তা-ও বলা মুশকিল। এটিকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মানসিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি যার জন্য কেউ চিকিৎসা নিতে পারে।
কিছু গবেষকের ধারণা, এটি হয়তো কোনো মানসিক আঘাত (ট্রমা) বা অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি), এডিএইচডি বা পিটিএসডি-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে এর প্রমাণ খুব কম।
টিনডাল ও তার দল ৬০০ জনের ওপর একটি সমীক্ষা চালান। তাতে দেখা যায়, লিমারেন্সের সঙ্গে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সম্পর্কের সামান্য মিল থাকলেও এটি তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর।
অনেকে বলেছেন, এই অনুভূতি 'হঠাৎ করেই' এসেছে। আগে থেকে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। মজার ব্যাপার হলো, এরা সামাজিকভাবে খুব একটা লাজুক বা উদ্বিগ্ন না হলেও, যার প্রতি আসক্ত, তাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত থাকেন। সারাক্ষণ তাকে দেখার ইচ্ছা থাকলেও সামনে পড়লে তীব্র উত্তেজনায় তারা হয়তো পালিয়েও যেতে পারেন!
লিমারেন্স কি মানুষকে 'স্টকার' বা পিছু নেওয়া অপরাধী বানাতে পারে? টেনভ তার বইয়ে এমন আশঙ্কা করেছিলেন। তবে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সাইবার সাইকোলজির অধ্যাপক এমা শর্ট বলেন, লিমারেন্স কোনো মানসিক রোগ বা ব্যক্তিত্বের ত্রুটি নয়।
স্টকিংয়ের ক্ষেত্রে মানুষ তার নিজের অনুভূতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং ভাবে অন্যজনও তাকে ভালোবাসে। শর্ট বলেন, লিমারেন্সে আক্রান্ত মানুষ বোঝে যে এই অনুভূতি শুধু তার নিজের মনের ভেতরেই আছে, তাই তারা সাধারণত অন্যের ক্ষতির কারণ হয় না।
ভালোবাসা এবং লিমারেন্স
এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণার পরও কি লিমারেন্স কখনো একটি সুস্থ সম্পর্কে রূপ নিতে পারে?
বেলামির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল তার স্ত্রীর সঙ্গে। তার স্ত্রীও লিমারেন্সে ভুগতেন। বেলামি বলেন, 'আমাদের সম্পর্কটা টিকে যায়। আমরা পারস্পরিক সম্মান, স্নেহ, যত্ন এবং আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে এক খাঁটি প্রেমে পড়েছিলাম।'
বেলামি কখনোই তার সহকর্মীকে তার অনুভূতির কথা জানাননি। তবে তিনি তার স্ত্রীকে সব খুলে বলেছিলেন, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
কিন্তু সহকর্মীর প্রতি সেই পাগলামি থেকে তিনি কীভাবে মুক্তি পেলেন? তিনি বলেন, 'আমি মূলত এর শিকড় কেটে দিয়েছিলাম।' তার মতে, ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি এড়িয়ে চললে ধীরে ধীরে এই আসক্তি কমে আসে।
টেনভও তার বইয়ে বলেছেন, সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে অথবা সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হলে লিমারেন্স বিলীন হয়ে যেতে পারে।
কারণ, আশার সামান্য আলোটুকু নিভে গেলে এই অনুভূতির আর বেঁচে থাকার কোনো সম্বলই থাকে না।
