‘মাইক্রো-চিটিং’: অন্যের ছবিতে লাইক দেয়াও কি সঙ্গীর সাথে প্রতারণা?
সঙ্গীর প্রতারণার বদলা নিতে গায়িকা লিলি অ্যালেন এক অভিনব কাজ করেছিলেন। তার সেই বিখ্যাত বিচ্ছেদ এবং তার পর প্রকাশিত অ্যালবাম বেশ সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে আজকের যুগে প্রতারণার রূপ বদলে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ আর ডেটিং অ্যাপগুলো আমাদের সামনে এক সমান্তরাল জগত খুলে দিয়েছে। এই ভার্চুয়াল জগতে এমন অনেক ভুল হচ্ছে, যা শারীরিক প্রতারণার চেয়েও মারাত্মক হতে পারে।
স্প্যানিশ সাংবাদিক ম্যানুয়েল জাবোইস এ নিয়ে একটি কলাম লিখেছিলেন। তার এক বন্ধু তাকে বলেছিলেন যে, তিনি মাসের পর মাস এক নারীর সঙ্গে মেসেজে কথা বলছেন। তবে তার সাফাই ছিল, 'কিন্তু আমরা তো শারীরিক সম্পর্কে জড়াইনি... আমি আমার প্রেমিকাকে সম্মান করি।'
কিন্তু প্রতারণা কি শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ? অচেনা বা পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যখন এত সহজ, তখন 'বিশ্বস্ততা'র মানে আসলে কী? ২০২৫ সালে এসে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
ডিজিটাল প্রতারণা
যৌন বিশেষজ্ঞ ও লেখক ভ্যালেরি ট্যাসো বলেন, প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গ বিষয়টি সামাজিক। এর সংজ্ঞা সংস্কৃতির সঙ্গে বদলায়। তিনি বলেন, 'ডিজিটাল জগত এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এখন এমন সব ঘটনা ঘটছে যা আগে ছিল না। অনলিফ্যানস বা চ্যাটজিপিটি নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। সেখানে পর্দার ওপারে সবসময় মানুষ থাকে না, বা কোনো রোমান্টিক উদ্দেশ্যও থাকে না।'
তিনি আরও বলেন, 'অনলিফ্যানসে হয়তো আপনি শুধু কনটেন্ট দেখছেন। কিন্তু সেখানে ব্যক্তিগত মেসেজ চালাচালি হলে বিষয়টি জটিল হয়ে যায়। শারীরিক সম্পর্ক না হলেও কি একে প্রতারণা বলা যায়?'
ভ্যালেরি মনে করেন, প্রযুক্তি নয়, দম্পতিরাই ঠিক করবেন প্রতারণার সংজ্ঞা কী। আলোচনা করেই ঠিক করতে হবে সীমারেখা কোথায়।
অনলিফ্যানসে ক্রিয়েটরদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা বা টাকা খরচ করা কি প্রতারণা? বিষয়টি জটিল। কারণ অনেক সময় সেখানে চ্যাটবট বা এআই উত্তর দেয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রেমময় আলাপ কি প্রতারণা? পর্নোগ্রাফি দেখা বা ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি আদান-প্রদান করা কি দোষের?
সঙ্গীর কাছে গোপন রেখে অন্যের সঙ্গে নিজের মনের কথা বলা, বা কারও কথা সারাক্ষণ ভাবা—এগুলো কি প্রতারণা নয়?
মনোবিজ্ঞানী ইরাৎসে লোপেজ মনে করেন, ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যোগাযোগ খুব জরুরি। যেমন, প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। কারও কাছে এটা স্বাভাবিক, আবার কারও কাছে অসম্মানের। তিনি বলেন, 'এটা সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়, বরং সম্পর্কের যত্ন নেওয়া। 'এতে আমার খারাপ লাগছে' বা 'আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি'—এগুলো খোলাখুলি বলা মানসিক পরিপক্বতার লক্ষণ।'
তিনি আরও বলেন, 'আজকাল সোফায় বসেই অন্যের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। আবেগঘন মেসেজ পাঠানো বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে 'লাইক' দেওয়া—এগুলো শারীরিক সম্পর্কের চেয়ে কম নয়। এখানে শরীর দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।'
সম্পর্কে গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি থাকা জরুরি। তবে ফোনের পাসওয়ার্ড দেওয়া-নেওয়া বা সঙ্গীর ওপর নজরদারি করা সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। ভ্যালেরি ট্যাসো বলেন, 'অবিশ্বাস নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সীমারেখা ঠিক করতে হবে। সুস্থ সম্পর্কে সবারই নিজস্ব জগত থাকা উচিত।'
মনোবিজ্ঞানী লারা ফেরেইরো বলেন, 'স্বচ্ছতা মানে এই নয় যে সব মেসেজ দেখাতে হবে। বিশ্বাসই হলো আসল। কৌতূহলবশত কিছু দেখা আর প্রতারণা এক নয়। তবে প্রযুক্তিকে গোয়েন্দাগিরির কাজে ব্যবহার না করে খোলামেলা কথা বলাই শ্রেয়।'
অ্যাশলে ম্যাডিসন অ্যাপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫% মানুষ মনে করেন শারীরিক সম্পর্ক প্রতারণা। তবে ৪২% মানুষ মনে করেন ভার্চুয়ালি ফ্লার্ট করাও প্রতারণা। অর্থাৎ বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের সীমারেখা এখন বদলে গেছে।
'মাইক্রো-চিটিং' কী?
কাউকে আকর্ষণীয় মনে করে তার ছবিতে 'লাইক' দেওয়া বা মেসেজ করাকে অনেকে 'মাইক্রো-চিটিং' বা ছোটখাটো প্রতারণা বলেন। কিন্তু ইরাৎসে লোপেজ এই 'মাইক্রো' শব্দটির সঙ্গে একমত নন।
তিনি বলেন, 'যদি এতে বিশ্বাস ভাঙে, তবে তা 'ছোট' নয়। মাইক্রো-চিটিং মানে হলো আবেগের জায়গাটা অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া।'
সঙ্গীর কাছে গোপন রেখে অন্যের সঙ্গে আবেগঘন কথা বলা, নিজের সমস্যা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা, বা সঙ্গীকে এড়িয়ে অপরিচিত কাউকে দ্রুত রিপ্লাই দেওয়া—এসবই মাইক্রো-চিটিং।
ইরাৎসে সতর্ক করে বলেন, 'মাইক্রো-চিটিং কোনো নির্দিষ্ট কাজ নয়, বরং উদ্দেশ্য। যখন আপনার মনোযোগ বা আবেগের প্রয়োজনগুলো সম্পর্ক থেকে সরে অন্য কোথাও যায়, তখনই ফাটল ধরে।'
কাপল কোচ ভিকি মোরানডেইরা বলেন, নারী ও পুরুষের কাছে প্রতারণার সংজ্ঞা আলাদা হতে পারে। নারীরা সাধারণত আবেগ ভাগ করে নেওয়াকে প্রতারণা মনে করেন, আর পুরুষরা শারীরিক সম্পর্ককে।
তিনি বলেন, 'বেশিরভাগ পরকীয়া বা প্রতারণা যৌনতা দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে। যখন কেউ ঘরে অবহেলার শিকার হন এবং বাইরে গুরুত্ব পান, তখনই বিপদ ঘটে। অনলাইন ফ্লার্টিং হলো এর জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র।'
সাংবাদিক জাবোইস বলেছিলেন, 'দিনে ২০০ মেসেজ, ছবি পাঠানো আর সারাক্ষণ ফোনে কথা বলা—অথচ দাবি করা যে আমি প্রতারণা করছি না কারণ আমরা একে অপরকে ছুঁইনি—এটা আসলে হাস্যকর। পাশের মানুষটির সঙ্গে বসে টিভি দেখার সময় অন্যকে 'শুভরাত্রি' মেসেজ পাঠানোর মধ্যেই আসলে বড় প্রতারণা লুকিয়ে আছে।'
সমস্যা হলো, আজকের দিনে শুধু 'শুভরাত্রি' মেসেজ নয়, অনলিফ্যানস বা রহস্যময় 'লাইক'-এর মতো বিষয়গুলো প্রতারণাকে আরও সহজ করে দিয়েছে।শেষ কথা হলো, বাইরের চেয়ে ফোনেই এখন প্রতারণা বেশি ঘটছে।
