ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের সময়সীমা নিয়ে কেন তর্কে জড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুনরায় শুরু করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরান ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে।
ইরানের বর্তমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং এটি আরও সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের দীর্ঘদিনের দাবির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন চায় তেহরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারই করবে না, বরং এ ধরনের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও পুরোপুরি ত্যাগ করবে।
বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট মতপার্থক্য এখন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসেছিল। কিন্তু কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান এখন দুই পক্ষকে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসানোর চেষ্টা করছে।
ইসলামাবাদে আলোচনার এই অচলাবস্থার মূলে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি শর্ত। ওয়াশিংটন চায়, নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার বিনিময়ে ইরান অন্তত ২০ বছরের জন্য তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখুক। কিন্তু তেহরান পাঁচ বছরের বেশি সময় এই কর্মসূচি বন্ধ রাখতে রাজি নয়।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, কেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সময়সীমা নিয়ে তর্কে জড়িয়েছে? এবং এই বিষয়টি কি যুদ্ধবিরতি আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলবে?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বলতে কী বোঝায়?
ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় পদার্থ যা পাথর, মাটি এবং পানিতে পাওয়া যায়। এটি সমৃদ্ধ করার পর পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম মূলত তিনটি প্রাকৃতিক আইসোটোপ আকারে থাকে (রাসায়নিক উপাদান যাদের নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু নিউট্রন সংখ্যা ভিন্ন): ইউরেনিয়াম-২৩৪, ইউরেনিয়াম-২৩৫ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৮। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম-২৩৫ অত্যন্ত তেজস্ক্রিয়; বাকি আইসোটোপগুলো তেমন নয়।
জাতিসংঘের পারমাণবিক শক্তি পর্যবেক্ষণ সংস্থা (আইএইএ)-এর মতে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর অনুপাত ০.৭২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়।
আইএইএ জানায়, ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর অনুপাত ২০ শতাংশের নিচে থাকলে তাকে 'নিম্ন-সমৃদ্ধ' ইউরেনিয়াম বলা হয়। এটি সাধারণত ঘরবাড়ি বা শিল্প-কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেসামরিক বা বাণিজ্যিক চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়। আর এই অনুপাত ২০ শতাংশের উপরে গেলে তাকে 'উচ্চ-সমৃদ্ধ' ইউরেনিয়াম ধরা হয়। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হতে হলে এই সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৯০ শতাংশ পার হতে হয়।
সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য ইউরেনিয়ামকে গ্যাসীয় অবস্থায় থাকতে হয়। ইরানসহ বেশিরভাগ দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে 'ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড' গ্যাসকে দ্রুতগতিতে ঘোরানোর পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিতে গ্যাসটিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘূর্ণায়মান সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রে প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে হালকা ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভারী ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে আলাদা হয়ে যায়।
পরবর্তীতে এই প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।
ইরানের কাছে কতটুকু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে?
বর্তমানে ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই স্তরে পৌঁছালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধির মাত্রায় পৌঁছানো অনেক বেশি সহজ ও দ্রুত হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-র প্রধান রাফায়েল গ্রসি গত মার্চের শুরুতে আল জাজিরাকে জানান, তাত্ত্বিকভাবে এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ১০টিরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ এই ইউরেনিয়ামের প্রায় অর্ধেকই সম্ভবত এখনো ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি ভূগর্ভস্থ টানেল কমপ্লেক্সে রয়ে গেছে।
এছাড়া, নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রেও আরও কিছু ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় এই দুটি ভূগর্ভস্থ কেন্দ্র এবং ফোরদোর আরেকটি কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমান সংঘাতের সময়ও এই কেন্দ্রগুলোকে পুনরায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তবে এই ইউরেনিয়াম মজুতগুলো এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে কি না এবং বর্তমানে সেগুলো কী অবস্থায় আছে—তা এখনো অস্পষ্ট।
ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে সমস্যা কী?
ইরান সব সময় দাবি করে আসছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেবল বেসামরিক কাজে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। তবে তারা বেসামরিক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।
ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার অভিযোগ করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো, ইরানের ওপর বেশ কয়েক দফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যস্থতায় বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল ইরান, যা 'জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন'নামে পরিচিত। এই চুক্তির অধীনে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছিল এবং বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই চুক্তিকে 'একপেশে' বলে অভিহিত করে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখান থেকে বের করে নেন এবং ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
এরপর থেকেই ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থাকা উচিত নয়। গত এক বছর ধরে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে এটিই ছিল ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান দাবি। এমনকি গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ১২ দিন ধরে চলা বিমান হামলার পেছনেও এটিই ছিল প্রধান কারণ।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পেছনেও যুক্তরাষ্ট্র এই একই কারণ দেখিয়েছে, যদিও সেই সময় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন ইরান থেকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছিনিয়ে আনতে দেশটিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী (স্পেশাল ফোর্স) পাঠানোর পরিকল্পনাও বিবেচনা করছেন।
বিগত আলোচনাগুলোতে ইরানি কর্মকর্তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানোর বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলেও, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে সাফ অস্বীকার করেছেন।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের সময়সীমা নিয়ে কেন তর্কে জড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান?
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেছে মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের অনড় অবস্থানের কারণে। যেখানে ওয়াশিংটন এই কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছে, সেখানে ইরান মাত্র ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে।
কিন্তু এই সময়সীমা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার নিরস্ত্রীকরণ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যাপক এম ভি রামানা আল জাজিরাকে বলেন, সমৃদ্ধকরণ কতদিন বন্ধ থাকবে তা নিয়ে এই বিতর্ক আসলে একটি 'দরকষাকষির প্রক্রিয়া'।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় সরকারই এই কর্মসূচির পেছনে তাদের রাজনৈতিক পুঁজি বাজি ধরেছে। গত কয়েক মাস ও বছর ধরে চলা বিরোধের মূল কারণ ছিল ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করুক, যা ইরান কখনোই করতে রাজি হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'এখন তারা সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে একটি মাঝামাঝি সময়সীমা খুঁজছে। এর পেছনে ৫ বা ২০ বছরের কোনো সুনির্দিষ্ট কারিগরি কারণ নেই, এটি মূলত রাজনৈতিক দরাদরি।'
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) শর্তগুলোও বর্তমান এই বিতর্কের পেছনে কাজ করছে। ওই চুক্তির অধীনে ইরান ১৫ বছরের জন্য তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি হয়েছিল। এছাড়া, ১০ বছরের জন্য নতুন কোনো সেন্ট্রিফিউজ তৈরি না করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ৩০০ কেজির নিচে রাখার শর্ত মেনে নিয়েছিল।
ট্রাম্প যখন ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান, তখন পর্যন্ত ইরান সব শর্ত যথাযথভাবে পালন করছিল।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশিষ্ট ফেলো ইয়ান লেসার বলেন, ট্রাম্প এবং তার সমমনা সমালোচকরা সেই সময় মনে করেছিলেন ১০ বছরের সময়সীমা খুবই কম। তাই এখন উভয় পক্ষই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি 'আরও ভালো চুক্তি' আদায় করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, ইরান চাইছে সময়সীমা ১০ বছরের কম (৫ বছর) করতে, আর যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তা এক দশকের বেশি (২০ বছর) করতে।
ইসলামাবাদে প্রথম দফার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, 'এখন বল ইরানের কোর্টে।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ইরানিরা কেবল মুখে বলবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—সেটি এক বিষয়। কিন্তু সেটি যাতে সত্যিই না ঘটে, তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং জরুরি একটি বিষয়।'
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন মনে করেন, ইরান স্বাভাবিকভাবেই এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে সবথেকে কম ছাড় দিতে চায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন দীর্ঘতম সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখে। কারণ, ইরান যত বেশি দিন এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকবে, তাদের পক্ষে এই কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা ততটাই কঠিন হবে।
ফেদারস্টোনের মতে, ট্রাম্পের জন্য এটি একটি রাজনৈতিক বিজয়ের প্রশ্নও বটে।
তিনি বলেন, 'ইরানকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত রাখা গেলে ট্রাম্প একে তার যুদ্ধের সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে পারবেন। তিনি দেখাতে পারবেন যে এই যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি সত্যিই কিছু অর্জন করেছেন।'
