ইরান যুদ্ধের পর ন্যাটো থেকে সরে আসার ইঙ্গিত ট্রাম্প প্রশাসনের
ইরান যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দশক ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে থাকা ট্রান্সআটলান্টিক জোট ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।
বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধকে একটি 'পরীক্ষা' হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই পরীক্ষায় ন্যাটো ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্পের চাপ সত্ত্বেও ন্যাটোর মিত্ররা প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ ছাড়া এই যুদ্ধে সামরিক বাহিনী পাঠাতে রাজি হয়নি।
লেভিটের এ মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠক করেন।
লেভিট বলেন, 'ন্যাটো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের একটি সরাসরি মন্তব্য আমার কাছে রয়েছে, যা আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, এবং তারা ব্যর্থ হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'গত ছয় সপ্তাহে ন্যাটো আমেরিকান জনগণের প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ তাদের প্রতিরক্ষার খরচ বহন করে আসছে আমেরিকান জনগণই।'
তিনি জানান, বিকেলে রুটের সঙ্গে ট্রাম্প 'খোলামেলা ও সরাসরি' আলোচনা করতে যাচ্ছেন।
বৈঠকের পর সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুটে এই বৈঠককে 'খোলামেলা ও উন্মুক্ত' বলে বর্ণনা করেন। তিনি ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে
তিনি বলেন, ন্যাটো মিত্ররা লজিস্টিক সহায়তা ও ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সহায়তা করেছে।
সিএনএনের উপস্থাপক জেক ট্যাপার রুটেকে প্রশ্ন করেন, প্রেসিডেন্ট কি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, নাকি অন্তত আগের প্রেসিডেন্টদের মতো ন্যাটোকে সমর্থন করবেন না?
জবাবে রুটে বলেন, 'নিশ্চিতভাবেই কিছু হতাশা রয়েছে। তবে একই সময়ে তিনি আমার যুক্তিগুলোও মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন।'
এরপর তিনি ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক মিশ্র ছিল। কখনো তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনও জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
২০২৫ সালে আবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প ন্যাটোর ইউরোপীয় অংশীদারদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে নতুন করে চাপ প্রয়োগ শুরু করেন।
গত জুনে ২০২৫ সালের ন্যাটো সম্মেলনে তিনি এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হন। ন্যাটোর সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর জন্য বাধ্যবাধকতাহীন অঙ্গীকার করে।
তবে স্পেন এ ক্ষেত্রে ছাড় চায়, যার ফলে গত এক বছরে ট্রাম্প বারবার দেশটির সমালোচনা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উত্তেজনা গত বছর আরও বেড়ে যায়, যখন ট্রাম্প স্বশাসিত ডেনিশ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দেন।
তিনি দাবি করেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এর মালিকানা অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্র ওই হুমকি থেকে কিছুটা সরে এসেছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দা ও ইউরোপীয় নেতাদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও ট্রাম্প এখনও দাবি করে আসছেন যে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফাভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কারণ তারা এই অভিযানে অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি।
অনেক আইনবিদ এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আগ্রাসনের শামিল বলে মনে করেন।
বুধবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, যুদ্ধের বিষয়ে অবস্থানের কারণে শাস্তি হিসেবে স্পেন ও জার্মানির মতো দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘাঁটি বন্ধ করা বা সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে লেভিট বলেন, ট্রাম্প ন্যাটো ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন কি না—এটি প্রেসিডেন্ট 'আলোচনা করেছেন' এবং রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন।
ট্রাম্প ও রুটের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে রুটে একাধিকবার হোয়াইট হাউস সফর করেছেন, যার মধ্যে গত বছরের মার্চ, জুলাই, আগস্ট ও অক্টোবর উল্লেখযোগ্য।
অতীতে রুটে সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ন্যাটো 'কার্যকর হবে না'।
