এশিয়ার পলিয়েস্টারে ইরান যুদ্ধের ধাক্কা; সংকটে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো
ইরান যুদ্ধের পর জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভারত ও বাংলাদেশের পলিয়েস্টার সরবরাহকারী এবং পোশাক প্রস্তুতকারকরা চাপে পড়েছে। এর ফলে জারা ও এইচএন্ডএম-এর মতো ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ডরা পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
ভারতের অন্যতম বৃহৎ পলিয়েস্টার সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফিলাটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মধু সুধন ভাগেরিয়া রয়টার্সকে জানান, চীনা সরবরাহকারীরা দাম বাড়ানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে তারা পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামাল—পিউরিফায়েড টেরেফথ্যালিক অ্যাসিড (পিটিএ) এবং মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি)—এর জন্য তাদের এখন প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এই প্রভাব পুরো এশীয় পোশাক সরবরাহ চেইনে পড়ছে। বিন্দাল সিল্ক মিলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অবিচল আর্য বলেন, জ্বালানি সংকট কেমিক্যাল ও রঙের খরচ 'মারাত্মকভাবে' বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জারা, এইচএন্ডএম, টার্গেট এবং ওয়ালমার্টের মতো বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতার কাছে পলিয়েস্টার কাপড় সরবরাহ করে।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া রান্নার গ্যাসের সংকটের কারণে ভারতের সুরাট টেক্সটাইল হাব থেকে অনেক অভিবাসী শ্রমিক চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমরা বর্তমানে বৈশ্বিক অর্ডারগুলোর চাহিদা ঠিকমতো পূরণ করতে পারছি না।'
তেল থেকে উৎপাদিত পলিয়েস্টার বর্তমানে টেক্সটাইল শিল্পের মূল ভিত্তি, যা বিশ্বের মোট তন্তু উৎপাদনের ৫৯ শতাংশ। রানিং শর্টস থেকে শুরু করে দামী পোশাক—সবকিছুতেই এর ব্যবহার রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের সংকটে এই খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফাস্ট ফ্যাশনের খরচ বাড়তে পারে
এই চাপ ধীরে ধীরে খুচরা বিক্রেতাদের ওপরও পড়তে পারে, বিশেষ করে যারা এশিয়ার পলিয়েস্টার-নির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। যদিও অগ্রিম কেনাকাটার কারণে তারা আপাতত কিছুটা সুরক্ষিত।
ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা প্রাইমার্ক জানিয়েছে, তাদের বসন্ত/গ্রীষ্মের মজুদ এবং শরৎ/শীতের বেশিরভাগ পণ্যে প্রভাব পড়বে না। তাদের মূল কোম্পানি অ্যাসোসিয়েটেড ব্রিটিশ ফুডসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জর্জ ওয়েস্টন বলেন, 'আমরা যদি এখন জ্বালানি-সম্পর্কিত কাঁচামাল কিনতাম, তাহলে উল্লেখযোগ্য মূল্যস্ফীতি দেখতাম। তবে আমরা এখন তা করছি না।'
তিনি আরও বলেন, 'ভবিষ্যতে বাজারে গেলে দাম কমতেও পারে, কিন্তু নিশ্চিত নই।'
শিল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এইচএন্ডএম আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাওয়ার আশা করছে।
এক বিবৃতিতে এইচএন্ডএম জানায়, তারা বাংলাদেশে উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত দেখছে না এবং জ্বালানি খরচের কারণে অর্ডার পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য অনুরোধও পায়নি।
অন্যদিকে জারা-র মালিকানাধীন ইনডিটেক্স এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
উল্লেখ্য যে, জারা ও এইচএন্ডএম বর্তমানে রিসাইকেলড বা পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার ব্যবহার করছে, যা তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে। তবে বিশ্বজুড়ে মাত্র ১২ শতাংশ পলিয়েস্টার রিসাইকেল করা হয়।
পলিয়েস্টারের ধাক্কা
ভারতের সুরাটে রাধেশ্যাম টেক্সটাইলের ২০০টি তাঁতের অর্ধেকই ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে।
কারখানার মালিক কৌশিক দুধাত বলেন, 'যুদ্ধের আগে আমাদের দৈনিক উৎপাদন ছিল ১০ হাজার মিটার, এখন তা কমে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার মিটারে নেমে এসেছে।'
তিনি নতুন পলিয়েস্টার সুতা কেনা বন্ধ করেছেন, কারণ দাম বাড়লে তাকে প্রায় ১৫ শতাংশ মূল্য বাড়াতে হবে—যা ক্রেতারা মেনে নেবে না।
বর্ধিত খরচের কারণে সুরাটের রং ও প্রিন্টিং কারখানাগুলো এখন সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ থাকছে, আগে যা ছিল একদিন। ফেডারেশন অব সুরাট টেক্সটাইল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৈলাশ হাকিম বলেন, 'এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কাঁচামালের সংকট দেখা দেবে এবং কারখানা বন্ধ করতে হবে।'
উড ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী, ভারতে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারের দাম ফেব্রুয়ারির শেষে প্রতি কেজি ১০০ রুপি থেকে এক মাসে বেড়ে ১২৬.৫ রুপিতে পৌঁছায়। পরে আমদানি শুল্ক কমানোর পর কিছুটা কমে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ১২০ রুপিতে ছিল।
চীনেও, যা বিশ্বের বৃহত্তম পলিয়েস্টার উৎপাদক, দাম বেড়েছে।
চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশে কারখানাগুলো মূলত তুলার পোশাক তৈরি করলেও, পলিয়েস্টার সুতা ও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে তারা চাপের মুখে।
৫ এপ্রিলের একটি চিঠিতে কোটস বাংলাদেশ (যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোটস-এর একটি ইউনিট) ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫.৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। এতে বলা হয়, তেল থেকে উৎপাদিত কাঁচামালের দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণেই এই সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, 'ক্রেতারা এখন বেশি সতর্ক, অর্ডার দেওয়ার আগে ঝুঁকি হিসাব করছে, যা অর্ডারের পরিমাণ কমাতে পারে।'
উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক ব্রুনা অ্যাঞ্জেল বলেন, 'এই পরিস্থিতি আর এক মাস চললে উৎপাদন কমে যাবে এবং "ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন" হবে—অর্থাৎ খুচরা বিক্রেতারা দাম বাড়াবে, আর ক্রেতারা কেনাকাটা কমিয়ে দেবে।'
জুতার বাজারেও প্রভাব
পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি ইভিএ (ইথিলিন-ভিনাইল অ্যাসিটেট) নামক উপাদান স্নিকার্সের সোলে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতারাও সতর্ক করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জুতা আমদানিকারক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি ম্যাট প্রিস্ট বলেন, 'জুতার উৎস যেখান থেকেই হোক, এই প্রভাব সর্বত্র পড়ছে।'
তাদের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুতায় ২৫ ধরনের পেট্রোকেমিক্যাল-ভিত্তিক উপাদান ব্যবহৃত হয়—সিন্থেটিক রাবার সোল থেকে শুরু করে পলিউরেথেন ফোম ও আঠা পর্যন্ত।
খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা মূল্য বাড়তে পারে এবং চাহিদার বিষয়েও আগেভাগে বলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নাইকির এক মুখপাত্র বলেন, 'তেলের দামের পরিবর্তন তাদের পণ্যের উৎপাদন খরচে প্রভাব ফেলছে।'
