ভারতের গঙ্গোত্রী মন্দিরে প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের পান করতে হবে ‘গোমূত্র’
ভারতের হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত অন্যতম পবিত্র হিন্দু মন্দির 'গঙ্গোত্রী'-তে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীদের বিশ্বাসের পরীক্ষা হিসেবে গোমূত্র পান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ড রাজ্যের এই মন্দিরে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার আগে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে 'পঞ্চগব্য' সেবন করতে হবে।
পঞ্চগব্য হলো গরুর পাঁচটি উপজাত—দুধ, দই, ঘি, মধু এবং গোমূত্রের একটি মিশ্রণ। মন্দির পরিচালনা কমিটির মতে, অবিশ্বাসী বা অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রবেশ ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গঙ্গোত্রী মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান ধর্মেন্দ্র সেমওয়াল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট'-কে বলেন, "এটি মূলত অ-সনাতনী এবং অবিশ্বাসীদের গঙ্গোত্রী মন্দির থেকে দূরে রাখার জন্য করা হয়েছে। যারা প্রকৃত বিশ্বাসী, তাঁদের এটি পান করতে কোনো সমস্যা হবে না। যারা ছদ্মবেশে ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াই মন্দিরে প্রবেশ করতে চায়, কেবল তাঁরাই সমস্যায় পড়বে। তাঁদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।"
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, মন্দিরের প্রবেশদ্বারে নিয়োজিত কর্মীরা দর্শনার্থীদের ভেতরে যাওয়ার আগে এই 'পবিত্র জল' সরবরাহ করবেন। ধর্মেন্দ্র সেমওয়াল আরও বলেন, "এটি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা ফিরিয়ে আনবে এবং যারা এটি পান করার সুযোগ পাচ্ছে, তাঁদের নিজেদের ভাগ্যবান মনে করা উচিত।"
গত রবিবার থেকে হিন্দুদের বার্ষিক বড় তীর্থযাত্রা 'চারধাম যাত্রা' শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এই নতুন নিয়ম ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর হিমালয়ের উঁচুতে অবস্থিত গঙ্গোত্রীসহ চারটি মন্দিরে লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমবেত হন। সাধারণত তীর্থযাত্রীরা প্রথমে যমুনোত্রী মন্দির দর্শন করেন এবং এরপর পর্যায়ক্রমে গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথ পরিদর্শন করেন। এই যাত্রা অত্যন্ত দুর্গম এবং অনেক ক্ষেত্রে খাড়া পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়।
ভারতের অনেক মন্দির পর্যটক এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও সব জায়গায় চিত্রটি এক নয়। গত মার্চ মাসে বদ্রীনাথ-কেদারনাথ মন্দির কমিটি তাদের অধীনে থাকা ৪৭টি মন্দিরে অ-হিন্দুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে একটি আদেশ জারি করেছিল।
সেমওয়াল জানান, চারধাম যাত্রার তীর্থযাত্রীরা আসতে শুরু করেছেন এবং এখন পর্যন্ত গঙ্গোত্রী মন্দিরে গোমূত্র মিশ্রিত এই 'পবিত্র জল' পানের বিষয়ে কেউ আপত্তি জানাননি।
হিন্দুধর্মে গরুকে পবিত্র মনে করা হয় এবং পবিত্রকরণের আচার-অনুষ্ঠানে গোমূত্র ব্যবহারের রীতি থাকলেও, এটি পান করা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি অনেক হিন্দুর কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে। মন্দির কমিটির এই নির্দেশ ইতিমধ্যে অ-হিন্দুদের আলাদা করে দেখার এবং ধর্মীয় স্থানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখার ঐতিহ্যের পরিপন্থী হিসেবে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
গোমূত্র পানের বিষয়টি ভারতে রাজনৈতিকভাবেও বিভাজন তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সাথে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো নিয়মিতভাবে এর ওষধি গুণের কথা প্রচার করে থাকে। বিজেপিকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া যোগগুরু বাবা রামদেব তাঁর আয়ুর্বেদিক ব্র্যান্ডের অধীনে গোমূত্র সম্বলিত বিভিন্ন পণ্য বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করেন। যদিও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অপ্রমাণিত এই স্বাস্থ্য দাবির বিরুদ্ধে বারবার সতর্ক করে আসছেন।
বিজেপি কর্মীরা প্রায়ই গোমূত্র ব্যবহার করে শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান করে থাকেন। এমনকি করোনা মহামারির সময় পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি ইউনিটের তৎকালীন প্রধান ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মানুষকে গোমূত্র ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছিলেন যে, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তীর্থমৌসুমের এই ব্যস্ত সময়ে, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অঞ্চলে সমবেত হন, তখন মন্দির কমিটি কীভাবে প্রতিটি দর্শনার্থীর ক্ষেত্রে এই নিয়ম নিশ্চিত করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গত বছর কেবল কেদারনাথ মন্দিরেই ১৭ লাখ ৭০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। রাজ্য পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাত মাসেরও কম সময়ে এই চারটি মন্দিরে মোট ৫১ লাখ দর্শনার্থী এসেছিলেন।
