ইরান যুদ্ধে অসহযোগিতা: স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
রয়টার্সকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে ইরান যুদ্ধে মার্কিন অভিযানকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হওয়া ন্যাটো মিত্রদের শাস্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পেনকে জোট থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর ব্রিটেনের দাবির বিষয়ে বিষয়ে মার্কিন অবস্থান পুনর্বিবেচনার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার, ঘাঁটি এবং ওভারফ্লাইট অধিকার দিতে মিত্র দেশগুলোর অনীহা বা অস্বীকৃতির প্রেক্ষিতে পেন্টাগনের উচ্চপর্যায়ে এই ইমেইলটি চালাচালি হচ্ছে। ই-মেইলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের সহযোগিতা ন্যাটোর সদস্য হওয়ার 'ন্যূনতম ভিত্তি' বা বেসলাইন।
একটি প্রস্তাবে 'অসহযোগী' দেশগুলোকে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ বা মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আকাশপথে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ন্যাটো মিত্রদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, তারা এই পথটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে তাদের নৌবাহিনী পাঠায়নি। এমনকি তিনি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।
১ এপ্রিল রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, 'আপনি আমার জায়গায় হলে কি বেরিয়ে আসতেন না?' তবে ইমেইলটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরাসরি বেরিয়ে যাওয়া বা ইউরোপের ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়নি।
পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন এই ই-মেইলের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য এত কিছু করার পরেও তারা আমাদের পাশে ছিল না। যুদ্ধ বিভাগ নিশ্চিত করবে যেন প্রেসিডেন্টের কাছে নির্ভরযোগ্য বিকল্প থাকে যাতে আমাদের মিত্ররা আর শুধু কাগজের বাঘ হয়ে না থাকে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করে।'
ইউরোপীয়দের 'অধিকারবোধ' নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি
বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা বলছেন, ইরান ও ইসরায়েলের সাথে এই যুদ্ধ ৭৬ বছরের পুরোনো ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এর ফলে অভূতপূর্ব উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলো আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর তাদের সাহায্যে আসবে না।
এ বিষয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো বলছে, মার্কিন নৌ-অবরোধে যোগ দেওয়ার অর্থ হলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। তবে যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ শেষ হলে তারা প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সাহায্য করতে আগ্রহী।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ন্যাটো কোনো 'একতরফা রাস্তা' হতে পারে না। বিশেষ করে স্পেনের ওপর তারা চরম ক্ষুব্ধ, কারণ স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্ব তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে দিতে অস্বীকার করেছে। স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—রোভা নেভাল স্টেশন এবং মোরন এয়ার বেস।
ই-মেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, স্পেনকে জোট থেকে বরখাস্ত করার সামরিক প্রভাব সীমিত হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব হবে বিশাল।
এছাড়া একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইউরোপের পুরোনো 'সাম্রাজ্যবাদী অধিকার' যেমন আর্জেন্টিনার কাছে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর ব্রিটেনের দাবির বিষয়ে কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনার বর্তমান লিবার্টারিয়ান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ট্রাম্পের একজন ঘনিষ্ঠ মিত্র।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে বারবার অপমান করেছেন এবং ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে অনিচ্ছুক হওয়ায় তাকে 'কাপুরুষ' বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন স্টারমার কোনোভাবেই 'উইনস্টন চার্চিল' নন এবং ব্রিটেনের বিমানবাহী রণতরিগুলো 'খেলনা' ছাড়া আর কিছু নয়।
ব্রিটেন শুরুতে মার্কিন অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেও পরে ইরানি পাল্টা হামলার মুখে নিজেদের নাগরিক ও অঞ্চল রক্ষার খাতিরে সীমিত 'প্রতিরক্ষামূলক' অভিযানের অনুমতি দেয়।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ পেন্টাগনে সাংবাদিকদের বলেন, ইরান যুদ্ধের ফলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে না পৌঁছালেও ইউরোপে পৌঁছাতে সক্ষম।
হেগসেথ বলেন, 'আমরা মিত্রদের কাছ থেকে শুধু প্রশ্ন আর বাধার সম্মুখীন হচ্ছি … আপনার প্রয়োজনে যদি আপনার মিত্ররা পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছুক না হয়, তবে সেই জোটের কোনো মূল্য নেই।'
