ইরান যুদ্ধে ফুরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার, চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত বাধলে পড়তে পারে অপ্রস্তুত অবস্থায়
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ হাজার ১০০ দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে। মূলত চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল এসব মিসাইল। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে থাকা এই মিসাইলের মজুত এখন প্রায় ফুরিয়ে যাওয়ার পথে।
এ ছাড়া দেশটির সামরিক বাহিনী ১ হাজারের বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছে, যা প্রতিবছর এই মিসাইল কেনার পরিমাণের প্রায় ১০ গুণ।
প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই যুদ্ধে ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইল (প্রতিটির দাম ৪০ লাখ ডলারের বেশি) এবং ১ হাজারের বেশি 'প্রিসিশন স্ট্রাইক' ও 'গ্রাউন্ড বেসড' মিসাইল ব্যবহার করেছে পেন্টাগন। এর ফলে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারে আশঙ্কাজনক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
তাই এশিয়া ও ইউরোপ থেকে তড়িঘড়ি করে মধ্যপ্রাচ্যে বোমা, মিসাইল ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে রাশিয়া ও চীনের মতো শত্রুদের মোকাবিলায় ওই অঞ্চলগুলোতে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঘাটতি পূরণে এখন উৎপাদন বাড়ানোর উপায় খুঁজছে দেশটি।
এই যুদ্ধ দামি মিসাইল ও গোলাবারুদের (বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে) ওপর পেন্টাগনের অতিমাত্রায় নির্ভরতার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প কত দ্রুত সস্তা অস্ত্র—বিশেষ করে আক্রমণকারী ড্রোন—তৈরি করতে পারবে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
খরচের বিশাল অঙ্ক
যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আগে ৩৮ দিনের যুদ্ধে ঠিক কী পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানায়নি প্রতিরক্ষা দপ্তর। তবে পেন্টাগন জানাচ্ছে, তারা ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। কিন্তু কর্মকর্তারা বলছেন, এটি দিয়ে ব্যবহৃত বোমা ও মিসাইলের সংখ্যা বোঝ যাবে না। কারণ, যুদ্ধবিমান ও আর্টিলারি সাধারণত বড় লক্ষ্যবস্তুতে একাধিকবার আঘাত হানে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা যুদ্ধের খরচের হিসাব জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে দুটি স্বাধীন সংস্থার মতে, এই খরচের পরিমাণ অকল্পনীয়: প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি (২৮ বিলিয়ন) থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি (৩৫ বিলিয়ন) ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ, প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, শুধু প্রথম দুদিনেই সামরিক বাহিনী ৫৬০ কোটি ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।
সিনেটর জ্যাক রিড চলতি সপ্তাহে বলেন, 'বর্তমান উৎপাদনের হার অনুযায়ী, আমরা যা খরচ করেছি তা পুনরায় মজুত করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।'
পেন্টাগনের অস্বীকার ও আর্থিক সংকট
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, 'বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের। দেশ রক্ষা ও যেকোনো সামরিক অভিযান চালানোর জন্য আমাদের দেশে ও সারা বিশ্বে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত রয়েছে।'
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা গত কয়েক প্রশাসন ধরে গোলাবারুদ উৎপাদনে ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও এই লক্ষ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
এদিকে কর্মকর্তারা বলছেন, অস্ত্র নির্মাতাদের উৎপাদন বাড়াতে যে অর্থের প্রয়োজন, কংগ্রেস সেই অতিরিক্ত তহবিলের অনুমোদন না দেওয়ায় পেন্টাগনের পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
গত জানুয়ারিতে প্রশাসন জানিয়েছিল যে তারা লকহিড মার্টিনসহ বড় বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারের সঙ্গে সাত বছরের চুক্তি করেছে। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল প্রিসিশন-গাইডেড মিউনিশন (নির্ভুলভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম গোলাবারুদ) ও 'থাড' মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন চার গুণ বাড়ানো। কিন্তু তহবিল সংকটের কারণে সেই উৎপাদন এখনো শুরু হয়নি
এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া উড়োজাহাজের কারণেও সামরিক বাহিনীকে অনাকাঙ্ক্ষিত খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে। ইরানে ভূপাতিত হওয়া বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে উদ্ধারে নেভি সিল টিম সিক্সের অভিযানে দুটি এমসি-১৩০ কার্গো বিমান ও তিনটি এমএইচ-৬ হেলিকপ্টার ধ্বংস করতে বাধ্য হয় মার্কিন বাহিনী। বিমানগুলো বালুতে আটকে যাওয়ায় সংবেদনশীল প্রযুক্তি যেন ইরানের হাতে না পড়ে, সে জন্যই এগুলো ধ্বংস করা হয়। এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় প্রায় ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে৷
মজুত ফুরানোর বাস্তব চিত্র
এদিকে, ইরান যুদ্ধে সেন্ট্রাল কমান্ডের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে সামরিক বাহিনী খুব দ্রুতগতিতে তাদের মজুত অস্ত্র ব্যবহার করছে। কিছু অস্ত্রের মজুত অন্যদের চেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, পেন্টাগন তাদের স্টেলথ, দূরপাল্লার জাসম-ইআর (JASSM-ER) ক্রুজ মিসাইলের মজুতের বেশির ভাগই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ হিসাব এবং কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সামরিক বাহিনী প্রায় ১ হাজার ১০০ জাসম-ইআর মিসাইল ব্যবহার করেছে। প্রতিটির দাম প্রায় ১১ লাখ ডলার। বর্তমানে সামরিক বাহিনীর মজুতে প্রায় দেড় হাজার এমন মিসাইল অবশিষ্ট রয়েছে।
প্রতিটি টমাহক মিসাইলের দাম প্রায় ৩৬ লাখ ডলার। ১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করে আসছে। এশিয়াসহ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যুদ্ধগুলোর জন্য এটি একটি মূল অস্ত্র।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ থাকলেও, টমাহক ও অন্যান্য মিসাইলের ব্যাপক ব্যবহার অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ওই গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, মজুতে প্রায় ৩ হাজার টমাহক মিসাইল অবশিষ্ট রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের প্রতিটির দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬০০টি এমন মিসাইল তৈরি করেছে। অথচ পেন্টাগন ও কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে।
আঞ্চলিক কমান্ডগুলোতে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডাররা অস্ত্রঘাটতির এই চাপ এখন ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের হাতে আসা পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের কারণে ইউরোপেও প্রভাব পড়েছে। রুশ আগ্রাসন থেকে ন্যাটোর পূর্ব সীমান্ত রক্ষার জন্য দরকারি অস্ত্রের মজুত সেখানে কমে গেছে।
নজরদারি ও হামলায় সক্ষম ড্রোনের ঘাটতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর স্বাভাবিক মহড়া ও প্রশিক্ষণও কমে গেছে। সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এতে করে ইউরোপে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো এবং রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস জি গ্রিনকেউইচ সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঐতিহাসিক অভিযানে সেন্টকমকে (ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড) সাহায্য করতে পেরে আমাদের যোদ্ধারা গর্বিত।'
তবে অস্ত্রঘাটতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এশিয়ায় থাকা মার্কিন সেনাদের ওপর।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন রণতরিকে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেন। এরপর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেরিন সেনার দুটি ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। ইরানের ড্রোন ও রকেট হামলা ঠেকাতে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সরিয়ে নিয়ে যুদ্ধে কাজে লাগিয়েছে পেন্টাগন।
সরিয়ে নেওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা 'থাড' প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর। উত্তর কোরিয়ার মিসাইল হুমকি মোকাবিলায় এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থা বসিয়েছিল পেন্টাগন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এই প্রথমবারের মতো সেখান থেকে থাডের ইন্টারসেপ্টর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে মার্কিন জাহাজ, উড়োজাহাজ এবং এর কর্মীদের টানা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। সামরিক ভাষায় একে 'হাই অপারেটিং টেম্পো' বলা হয়। এমন হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে সাধারণ যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল জে পাপারোর মুখপাত্র। গত মঙ্গলবার সিনেটের এক শুনানিতে অ্যাডমিরাল পাপারোও অস্ত্রঘাটতির বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যান।
