যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্ভবত 'ইচ্ছা করেই' ইরানের বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা করেছিল: আল জাজিরার অনুসন্ধান
দিনটি ছিল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের 'শাজারেহ তাইয়েবেহ' স্কুলে তখন কেবল ক্লাস শুরু হয়েছে। হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এল ক্ষেপণাস্ত্র। মুহূর্তেই ধসে পড়ল ছাদ, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ল ডজনখানেক শিশু শিক্ষার্থী ও তাদের শিক্ষকেরা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে, ঠিক তখনই এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।
ইরান কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুসারে, এই হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েশিশু। আহত হয়েছে আরও অন্তত ৯৫ জন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নৃশংসতার ছবিতে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ দ্রুতই এ ঘটনার দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী টাইম ম্যাগাজিন ও বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছে, কোনো স্কুলে হামলা হয়েছে কি না, তা তাদের জানা নেই।
কিছু ইসরায়েল-ঘেঁষা ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দাবি করেছে, ওই স্কুলটি আসলে 'ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একটি ঘাঁটির অংশ' ছিল।
তবে আল–জাজিরার ডিজিটাল অনুসন্ধান ইউনিটের তদন্তে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। গত এক দশকের স্যাটেলাইট ছবি, সাম্প্রতিক ভিডিও ফুটেজ, প্রকাশিত খবর এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্কুলটি অন্তত ১০ বছর ধরে পাশের সামরিক স্থাপনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভবন হিসেবেই ছিল।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, হামলার ধরন দেখে গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভুলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমনকি স্কুলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কি না, সেই সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কেন মিনাব শহরটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার লক্ষ্যবস্তু হলো, তা বুঝতে হলে শহরটির ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব জানা প্রয়োজন। মিনাব দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের হরমোজগান প্রদেশে অবস্থিত। সামরিক দিক থেকে এই প্রদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে সরাসরি হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরের ওপর নজরদারি করা যায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখার (NEDSA) প্রধান অপারেশনাল কেন্দ্র হিসেবেও এই এলাকাটি পরিচিত।
আইআরজিসি সংশ্লিষ্টতা কি স্কুলকে লক্ষ্যবস্তু করার অজুহাত?
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখা মূলত 'কৌশলী যুদ্ধ' পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। দ্রুতগতির নৌকা, ড্রোন এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা সমুদ্রপথে শত্রু মোকাবিলা করে। এই যুদ্ধকৌশলে মিনাব শহরের 'সাইয়্যেদ আল-শুহাদা' সামরিক কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানেই আইআরজিসি নৌ শাখার অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট 'আসিফ ব্রিগেড'-এর সদর দপ্তর অবস্থিত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আক্রান্ত 'শাজারেহ তাইয়েবেহ' স্কুলটি মূলত আইআরজিসি নৌ শাখার একটি শিক্ষা নেটওয়ার্কের অংশ। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা মূলত নৌবাহিনীর সদস্যদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
ইরানের নিজস্ব মেসেজিং অ্যাপ 'বালেহ'-তে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর সদস্যদের সন্তানদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। এমনকি সাধারণ নাগরিকদের সন্তানদের জন্য ভর্তির সময়সূচিও থাকত আলাদা।
বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন
স্কুলটি আইআরজিসি-র প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকলেও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী এর মর্যাদা 'বেসামরিক স্থাপনা' হিসেবেই গণ্য হয়। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি সরাসরি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেটি কোনোভাবেই বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।
সেখানে অবস্থানরত শিশু ও শিক্ষকেরা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে 'বিশেষ সুরক্ষা' পাওয়ার অধিকারী। তাদের ওপর উদ্দেশ্যমূলক হামলা চালানো স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ।
মানবাধিকার সংস্থা 'ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর' এই হামলাকে একটি 'ভয়াবহ অপরাধ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, পাশে সামরিক ঘাঁটি থাকার অর্থ এই নয় যে, একটি স্কুল তার বেসামরিক বৈশিষ্ট্য হারাবে। হামলা চালানোর আগে লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। শিশুদের ওপর এমন হামলাকে তারা 'বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম বিপর্যয়' হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরানে শনিবার হলো সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। সেদিন সকালেই মিনাব ও হরমোজগান প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হয়। তবে জনজীবন ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। শিশুরা স্কুলে গিয়েছিল, রাস্তায় যানবাহন চলাচল করছিল। বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজে সে চিত্রই ধরা পড়েছে।
প্রামাণ্য স্যাটেলাইট ইমেজ বা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৩ মিনিট পর্যন্ত স্কুল ভবনটি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। এর কিছু সময় পরেই ভয়াবহ সেই হামলাটি চালানো হয়, যা মুহূর্তেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
মিনাবের স্কুলে হামলা কি 'ভুল' ছিল না 'পরিকল্পিত'?
ইরানের স্থানীয় সময় তখন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিট। মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ গার্লস স্কুলে সরাসরি আঘাত হানে একটি 'গাইডেড মিসাইল' । হামলার ভয়াবহতা ও প্রকৃত ধরন বুঝতে আল জাজিরার ডিজিটাল অনুসন্ধান ইউনিট ঘটনার পরপরই টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিডিওর বিশ্লেষণ করেছে। স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ভিডিও দুটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রথম ভিডিওটি ছিল সেনাঘাঁটির দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ধারণ করা। এতে দেখা যায়, 'সাইয়্যেদ আল-শুহাদা' ঘাঁটির ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে। অর্থাৎ, ওই সামরিক এলাকাটি যে হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল, এটি তার প্রমাণ।
তবে দ্বিতীয় ভিডিওটি এই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ঘাঁটির দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একই সময়ে দুটি আলাদা জায়গা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া আকাশে উঠছে। একটি ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে সেনাঘাঁটির গভীর ভেতর থেকে, আর অন্যটি উঠছে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত ওই বালিকা বিদ্যালয় থেকে।
স্যাটেলাইট ইমেজে ঘাঁটি ও স্কুলের মধ্যে যে দূরত্ব দেখা যায়, ভিডিওতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দুটির দূরত্বও ঠিক ততটাই। এটি প্রমাণ করে যে, পাশের সেনাঘাঁটিতে হামলার কোনো ধ্বংসাবশেষ বা স্প্লিন্টার উড়ে এসে স্কুলে পড়েনি। বরং স্কুল ভবনটিতে আলাদাভাবে এবং সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
যেভাবে সেনাছাউনি স্কুল হয়ে উঠল
আক্রান্ত ভবনটি আসলে কোনো সামরিক ব্যারাক ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে অনুসন্ধান দল ২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গুগল আর্থের আর্কাইভ করা সব ছবি পরীক্ষা করেছে।
২০১৩ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, তখন ওই স্কুল ভবনটি 'সাইয়্যেদ আল-শুহাদা' সামরিক কমপ্লেক্সেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। পুরো এলাকাটি একটিমাত্র সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল এবং চারকোণে ছিল পাঁচটি নিরাপত্তা চৌকি বা ওয়াচ টাওয়ার। তখন সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের কোনো সুযোগ ছিল না এবং পুরো ভবনটি সামরিক ব্যারাক হিসেবেই ব্যবহৃত হতো।
তবে ২০১৬ সাল থেকে সেখানে আমূল পরিবর্তন শুরু হয়। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বরের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, মূল সামরিক ব্লক থেকে স্কুল এলাকাটিকে আলাদা করতে মাঝখানে নতুন ও মজবুত অভ্যন্তরীণ দেয়াল তোলা হয়েছে। স্কুল এলাকাটির ওপর নজরদারি করা দুটি ওয়াচ টাওয়ারও ভেঙে ফেলা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাত্র ও শিক্ষকদের যাতায়াতের জন্য সরাসরি পাবলিক রোডের দিকে তিনটি নতুন গেট তৈরি করা হয়।
আল জাজিরার এই অনুসন্ধান বলছে, গত ১০ বছর ধরে ভবনটি যে সম্পূর্ণ বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, তার স্পষ্ট ছাপ ছিল স্থাপত্য ও প্রকৌশলগত নকশায়। ফলে এটি যে একটি স্কুল, তা চিহ্নিত করা হামলাকারী বাহিনীর জন্য মোটেও কঠিন ছিল না।
দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের সেই বালিকা বিদ্যালয়টি যে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল, তার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে স্যাটেলাইট ছবিতে। ২০১৮ সালের ৫ মে তোলা ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটির আঙিনায় শিশুদের খেলার মাঠ তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালগুলো রাঙানো হয়েছে উজ্জ্বল রঙে এবং তাতে আঁকা হয়েছে নানা দেয়ালচিত্র। এমনকি স্কুলের গেটে অভিভাবকদের বেসামরিক গাড়ির সারিও দেখা গেছে ছবিতে। অর্থাৎ, গত ১০ বছর ধরে এটি যে একটি পুরোদস্তুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল, তা যেকোনো আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়ার কথা।
ক্লিনিক বাঁচলেও কেন রক্ষা পেল না স্কুল?
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় মোড় হলো পাশের 'শহীদ আবসালান' ক্লিনিক। ২০২৫ সালের শুরুতে মূল সামরিক এলাকা থেকে আলাদা করে এই বিশেষায়িত ক্লিনিকটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় দেখা গেছে, মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পাশের সামরিক ঘাঁটি এবং স্কুলে আঘাত করলেও মাঝখানে থাকা এই ক্লিনিকটিকে স্পর্শও করেনি।
এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে এসেছে—হামলাকারী বাহিনীর কাছে যদি মাত্র এক বছর আগে তৈরি হওয়া ক্লিনিকের সঠিক মানচিত্র থাকে, তবে তারা ১০ বছর আগে আলাদা হওয়া স্কুলটি চিনতে পারল না কেন? এই বৈপরীত্য এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, স্কুলটিতে হামলা কোনো 'ভুল' ছিল না; বরং এটি ছিল সুপরিকল্পিত।
হামলার পরপরই ইসরায়েল-পন্থি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, কোনো বিদেশি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং ইরানের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে স্কুলের ওপর পড়েছে। প্রমাণ হিসেবে তারা একটি ভিডিও প্রচার করে।
তবে ডিজিটাল অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেই ভিডিওটি মিনাব শহরেরই নয়। ভিডিওতে যে তুষারাবৃত পাহাড় দেখা গেছে, তা উত্তর-পশ্চিম ইরানের জানজান প্রদেশের। জানজান একটি পাহাড়ি এলাকা যেখানে শীতে বরফ পড়ে। অন্যদিকে মিনাব হলো সমুদ্র উপকূলীয় উষ্ণ এলাকা, যেখানে বরফ পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ, বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করতেই জানজানের একটি পুরনো ভিডিও মিনাবের বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
পুরনো অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি?
মিনাবের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী এর আগেও বারবার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে প্রথমে তা অস্বীকার করেছে এবং পরে স্বাধীন তদন্তে সত্য বেরিয়ে এসেছে।
১৯৭০, মিশর: ইসরায়েলি বিমান হামলায় মিশরের বাহর আল-বাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৬ শিশু নিহত হয়। ইসরায়েল তখন দাবি করেছিল, সেটি একটি সামরিক স্থাপনা ছিল।
১৯৯১, ইরাক: বাগদাদের আমিরিয়া বেসামরিক আশ্রয়কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের 'স্মার্ট বোমা' হামলায় ৪০৮ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী ও শিশু।
১৯৯৬, লেবানন: দক্ষিণ লেবাননের কানায় জাতিসংঘ কম্পাউন্ডে ইসরায়েলি হামলায় ১০৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘ তদন্তে একে 'পরিকল্পিত' বলা হয়েছিল।
২০১৫, আফগানিস্তান: কুন্দুজে 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস' (এমএসএফ) পরিচালিত হাসপাতালে মার্কিন বিমান হামলায় ৪২ জন নিহত হন।
গাজা (২০২৩-২৫): গত দুই বছরে গাজার প্রায় ৯৫ শতাংশ স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কুলগুলোকে 'বিশেষ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে চিহ্নিত করে হামলা চালানোর তথ্যও মিলেছে।
মিনাবের ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সামরিক ঘাঁটির পাশে স্কুল থাকা কোনোভাবেই সেখানে হামলার অজুহাত হতে পারে না। এই হামলা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, এটি বিশ্বজুড়ে বেসামরিক সুরক্ষার যে কাঠামো রয়েছে, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার এক নির্মম দৃষ্টান্ত।
ইরানের শিক্ষক সমিতির কো-অর্ডিনেটিং কাউন্সিলের প্রতিনিধি শিবা আমিলাইরাদ টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ামাত্রই স্কুলটি খালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার মধ্যবর্তী সময়টা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ফলে অনেক মা-বাবাই স্কুলে পৌঁছে তাঁদের সন্তানদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি।
শিবা আমিলাইরাদ আরও জানান, হামলার পর হতাহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে হাসপাতালের মর্গে আর ঠাঁই ছিল না। বাধ্য হয়ে ছোট ছোট মেয়েদের নিথর দেহগুলো সংরক্ষণের জন্য বড় বড় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ট্রাক ব্যবহার করতে হয়েছে। অনেক পরিবার এই এক বিষ্ফোরণেই তাঁদের একাধিক সন্তানকে হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাশের নতুন ক্লিনিকটি অক্ষত রেখে ১৭০ জন শিক্ষার্থীসহ একটি স্কুলে হামলার পেছনে দুটি বিষয় কাজ করতে পারে। এবং এই দুটিই সমানভাবে নিন্দনীয়।
প্রথমত, হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২০১৩ সালের আগের পুরনো কোনো গোয়েন্দা মানচিত্র ব্যবহার করে এই হামলা চালিয়েছে। যদি তাই হয়, তবে তা হবে বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবহেলা ও চরম দায়িত্বহীনতার প্রমাণ।
দ্বিতীয়ত, এটি হতে পারে একটি পরিকল্পিত আঘাত। ইরানি সমাজের মূলে চরম আঘাত হানা এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন ও আস্থা ধসিয়ে দিতেই সম্ভবত জেনেশুনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে।
