ব্যবসায়ী মানেই চোর, এনবিআরকে এ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান ফিকি’র
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সব ব্যবসায়ীকে সন্দেহের চোখে দেখার মনোভাব থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি ও বার্জার পেইন্ট এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুপালী হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, 'ব্যবসায়ী মানেই চোর, এই ব্লেম গেম থেকে বের হতে হবে। ইউ মাস্ট সাম ট্রাস্ট অন আস। কিছু লোকের জন্য আমরা সবাই দায়ী নই।'
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
এসময় রুপালী হক চৌধুরী বলেন, 'সরকারকে এমপ্লয়মেন্ট এবং রেভিনিউ জেনারেশনের মধ্যে ব্যালেন্স করতে হবে। যারা ট্যাক্স দিচ্ছে, তাদের ওপর আবার ট্যাক্স বাড়ালে তারা এক্সপ্যানশন করতে পারবে না।'
তিনি বলেন, 'যখন ইন্ডাস্ট্রি ভালো করছে না, তখন রেভিনিউ বাড়াতে গেলে আমাদের ওপর চাপ বাড়বে।'
রুপালী হক চৌধুরী বলেন, 'গত বছর পর্যন্ত আমাদের কোম্পানি আর্নিং নেগেটিভে ছিল। এবার বছর মাত্র ১ শতাংশ গ্রো করেছে।'
তিনি বলেন, 'আমি কিছু কিছু কোম্পানির বোর্ডে আছি বলে জানি, কোনো কোনো কোম্পানির ২৫% পর্যন্ত নেগেটিভ গ্রোথ হয়েছে।'
রুপালী হক চৌধুরী বলেন, 'বাংলাদেশ মার্কেট ক্রমান্বয়ে নেগেটিভে যাচ্ছে। যার কারণে কোম্পানিগুলো নতুন করে এক্সপ্যানশনে যাচ্ছে না।'
এ সময় তিনি বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করা, এনবিআরের কর আদায় সংক্রান্ত কার্যক্রমে ইন্ড টু ইন্ড অটোমেশনের আওতায় আনা, ট্যাক্স বেইজ সম্প্রসারণ করার প্রস্তাব দেন। এছাড়া, বাংলাদেশে ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট কমাতে বিদ্যমান মিনিমাম ট্যাক্স রেট ক্রমান্বয়ে বাতিল করা, আমদানি পর্যায়ে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) ব্যবস্থা বাতিল করার দাবি জানান।
তাছাড়া ভ্যাটের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে সবার জন্য স্ট্যান্ডার্ড ১০ শতাংশ রেট করা, আমদানি পর্যায়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের আরবিট্রারি ভ্যালয়েশন পরিবর্তনে ট্রান্সজেকশন ভ্যালুর ওপর অ্যাসেসমেন্ট করার প্রস্তাব দেন।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ছাড়াও জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং বাংলাদেশে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহুজাতিক কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বহুজাতিক কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্যে বিদ্যমান ট্যাক্স পলিসি সহজ ও ডিজিটাইজ করা, করের বেইজ সম্প্রসারণ করা এবং সবার জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড করার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ ও রাজস্ব প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য করে আগামী বাজেটে পলিসি ডিসিশন নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
যুদ্ধের কারণে চাপ, বাজেটে নতুন করে করের চাপ না দেওয়ার আহ্বান ব্যবসায়ীদের
দেশের স্থানীয় কিংবা বিদেশি ব্যবসায়ীরা গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট চাপের মধ্যে আগামী বাজেটে নতুন করে কোনো ধরনের ট্যাক্সের চাপ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী বিদেশি ব্যবসায়ীরা।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা বলেন, 'আমরা (বিদেশি বিনিয়োগকারীরা) এখন সতর্ক। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এনার্জি ক্রাইসিসে আমরা একটা শক এর মধ্যে আছি।'
তিনি বলেন, 'তারপর আবার যদি (বাজেটে) কোনো পলিসি শক আসে, সেটা আমাদের জন্য ডাবল ক্রাইসিস তৈরি করবে।'
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি- এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং ফিকির উপদেষ্টা স্নেহাশিস বড়ুয়া সভায় আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন।
এ সময় মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী দীর্ঘমেয়াদী অটোমেশন রোডম্যাপ স্ট্রাটেজি দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যাতে এনবিআরের লিডারশিপ চেঞ্জ হলেও অটোমেশন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।
এছাড়া, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে ডিলে হওয়ার কারণে কীভাবে বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটি তুলে ধরেন তিনি।
সভা শেষে তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস)- বলেন, 'একটি প্রজেক্ট হয়তো এক বছরের মধ্যে শুরু করতে পারার কথা, কিন্তু ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে বিভিন্ন পক্ষের পারমিশনে ডিলে হওয়ার কারণে তা দুই বছরেও শুরু করা যায় না।'
স্নেহাশিস বড়ুয়া বিদেশি বিনিয়োগ আনতে কোম্পানির করহার কমানোর প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, 'ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় কর্পোরেট করহার যথাক্রমে ২০% ও ২২%, সেখানে বাংলাদেশে কয়েক বছরে কমানোর পরও এখনও ২৭.৫%। তাহলে একজন বিনিয়োগকারী কেন এখানে বিনিয়োগ করতে আসবেন?'
তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশে যে ট্যাক্স রেট রয়েছে, বিভিন্ন ডিজঅ্যালাউয়েন্স এর কারণে ইফেক্টিভ ট্যাক্স অনেক বেশি হয়ে যায়।'
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সমস্যা ও সক্ষমতার বিষয়টি স্বীকার করেন।
এছাড়া, গত দেড় বছরে এনবিআরের পক্ষ থেকে কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাইজেশনে নেওয়া তাদের বেশকিছু উদ্যোগ ও পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
