নিজস্ব শর্তেই যেভাবে যুদ্ধে জয়ী হতে পারে ইরান
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং টানা পাঁচ বছরের খরার কারণে দুর্বল অবস্থায় ছিল ইরান, এরমধ্যেই শুরু হয় যুদ্ধ। এই সংঘাতে দেশটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখিও হয়েছে।
তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যেও ইরানের সামনে একটি বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে—যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা এমনভাবে গড়ে তোলার, যাতে তুলনামূলকভাবে সে নিজে শক্ত অবস্থানে থাকে এবং প্রতিপক্ষ দুর্বল অবস্থানে চলে যায়। আধুনিক যুদ্ধের জটিল বাস্তবতায়—একেই এক ধরনের বিজয় হিসেবে ধরা যেতে পারে।
এই 'বিজয়' অর্জনের জন্য ইরানকে তিনটি কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে হবে: যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা, আমেরিকার যুদ্ধের ন্যায্যতার ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং এমন একটি যুদ্ধ-পরবর্তী ঐকমত্য তৈরি করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
বর্তমান যুদ্ধ ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে সে যুদ্ধ-পরবর্তী একটি নতুন স্বাভাবিকতা গড়ে তুলতে পারে—যা তার অর্থনীতির জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার সুযোগ, জ্বালানি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য সরবরাহের নিরাপত্তা এবং প্রণালির দুই পাড়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা তৈরি করবে। এটি আবেগ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাস্তব স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে।
১. আগে যুদ্ধবিরতি
প্রথম ধাপ হলো বিচ্ছিন্নকরণ। ইরান কোনোভাবেই তার বিরুদ্ধে গঠিত যুদ্ধজোটকে আরও বিস্তৃত হতে দিতে পারে না। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোকে সরাসরি হামলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য ইরানের নেই। তাছাড়া আরব বিশ্বের লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে একদিকে যেমন ইরান বিরোধিতা আরও কঠোর হয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহারের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে জিসিসি দেশগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা ইরানের পক্ষে সম্ভব। এটা জিসিসি দেশগুলোর সেনাবাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখতে পারে। এই যুদ্ধবিরতি ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ার শর্তে হওয়া উচিত। জিসিসি দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে বিদেশি ঘাঁটি বা নিজস্ব আকাশপথ ব্যবহারে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনীকে বাধা দিতে সক্ষম হবে না—ইরানকে এমন বাস্তবতাকেও মেনে নেওয়া উচিত।
২. পারমাণবিক 'অফ-র্যাম্প'
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের তরফে এই যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। এই লক্ষ্য বাস্তব হোক বা কৃত্রিমভাবে তৈরি—এটি এমন কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত, যা সহজে উপেক্ষা করা যায় না।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরানের কাছে নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, ফলে এটি এখন কার্যত অচল। এখানে ইরানের প্রয়োজন একটি কৌশলগত উদ্যোগ, যা তৃতীয় পক্ষগুলোর জন্য রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি পরিসর তৈরি করবে।
দ্বিতীয় ধাপে ইরানকে পারমাণবিক পরিদর্শন এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব থেকে আলাদা করতে হবে। ইরান একতরফাভাবে এমন একটি প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে তার পারমাণবিক স্থাপনায় পরিদর্শন হবে—কিন্তু সেই দলে কোনো মার্কিন প্রতিনিধি থাকবে না। এটি আইএইএ বা বিকল্প কোনো সক্ষম সংস্থার মাধ্যমে হতে পারে।
শুধুমাত্র এমন একটি প্রস্তাব দেওয়া, যা পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে মার্কিন নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে—ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য (ইরানের ওপর) নিষেধাজ্ঞা শিথিলের রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এই প্রস্তাব না থাকলে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুরোপুরি বিশ্বাস নাও করতে পারে, কিন্তু তাদের কাছে সম্পৃক্ত হওয়ার মতো 'সৎ উদ্দেশ্যের' প্রমাণও থাকবে না। আর এই প্রস্তাব থাকলে ইরান তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ খুলে দিতে পারে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরানের পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েন করা প্রায় অসম্ভব—এবং তা করলে বৈশ্বিকভাবে আত্মঘাতী বিচ্ছিন্নতা তৈরি হবে। ফলে এই প্রস্তাব বাস্তবে ইরানের কোনো বড় কৌশলগত ক্ষতি করবে না; বরং এটি একটি অসম লেনদেন, যা তার পক্ষেই যাবে।
৩. মার্কিন ক্ষমতার ভিত্তিতে সূক্ষ্ম আঘাত
তৃতীয় ধাপ হলো মার্কিন ক্ষমতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানা—যা বর্তমানে ইরানের জন্য একটি অনন্য সুযোগ।
মার্কিন সামরিক শক্তির ভিত্তি মূলত ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ঘাটতি বজায় রাখতে পারে। সাবেক ফরাসি অর্থমন্ত্রী ভ্যালে জিসকা দ্য এস্টিং একে বলেছিলেন আমেরিকার "অতিরিক্ত বিশেষ সুবিধা"।
১৯৭৪ সালে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি উইলিয়াম সিমন নিশ্চিত করেন, যে সৌদি আরবের তেল বিক্রির আয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হবে। এর ফলে ডলার হয়ে ওঠে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের (তেল) লেনদেনের মুদ্রা—এবং পরিণত হয় বৈশ্বিক প্রধান মুদ্রায়।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের নেটওয়ার্ক সুইফট-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে, কীভাবে সে তার আর্থিক ক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে ডলার নির্ভরতা কমানোর প্রবণতা আরও জোরদার হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ইরানকে একটি সুযোগ দিয়েছে—যেখানে সে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে তেহরান নতুন শর্ত আরোপ করতে পারে। ইরান তেল বাণিজ্যে নির্দিষ্ট কিছু মুদ্রায় লেনদেনের শর্তে নিরাপদ চলাচলের প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে ডলার থাকবে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লেনদেনের একটি ছোট অংশ—প্রায় ৩ শতাংশ—ইরানি মুদ্রা রিয়ালে করার শর্তও আরোপ করা যেতে পারে। এতে রিয়ালের চাহিদা স্থিতিশীল থাকবে এবং অংশীদার দেশগুলো নিজেদের অবকাঠামো গড়ে তোলার সময় পাবে।
এটি মূলত ভাড়া আদায়ের মতো হলেও বাণিজ্য সুরক্ষার ধারণা জিসিসি দেশগুলোর জন্য নতুন নয়। ইউরো, রেনমিনবি, রুপি, উন এবং ইয়েন—এই মুদ্রাগুলোকে কেন্দ্র করে একটি অর্থনৈতিক জোট তৈরি হতে পারে। কারণ চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জ্বালানির ৭৫ শতাংশের বেশি ক্রয় করে।
রপ্তানিকারকদের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ যুদ্ধকালীন ঝুঁকির তুলনায় অনেক কম হবে। আর যখন নিয়ন্ত্রণই মূল লক্ষ্য, তখন প্রতি ব্যারেলে সামান্য কিছু বাড়তি খরচ নিয়েও কেউ মাথা ঘামাবে না।
@ডি-ডলারাইজেশন জোট
এই কৌশল বাস্তবায়ন করা কঠিন হলেও বহুমুখী স্বার্থের কারণে তা সম্ভব। ইরান একা ডলার নির্ভরতা ভাঙার বিশাল দায়িত্ব নিতে পারবে না—এবং সেটি তার প্রয়োজনও নয়।
বরং সে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যার মধ্যে অন্য দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে অংশগ্রহণ করবে। এটি হয়তো শেষ নয়, কিন্তু একটি নতুন শুরুর সূচনা হতে পারে।
চাপ দিয়ে বাধ্য করা যায়, কিন্তু সেই চাপ যতক্ষণ বিশ্বাসযোগ্য থাকে ততক্ষণই কার্যকর। যুদ্ধের কারণে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় হচ্ছে। ফলে এই নতুন ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার ওপর।
এই সম্ভাবনায় ধরে নিতে হবে যে, জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের মদতদাতার (যুক্তরাষ্ট্র) চেয়ে প্রকৃত ক্রেতাদের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। বিশেষ করে যখন ইরান সামরিক শক্তি নয়, বরং সংযমের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
উপসাগরীয় কোনো জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষা নিয়ে ইরানের শর্ত অমান্য করতে পারে। কিন্তু তাতে তার লাভ কী? সে কেবল ডলারে মূল্য নেওয়ার সুযোগ পাবে, যখন তার ক্রেতারা নিজস্ব মুদ্রায় পরিশোধ করতে চাইবে। তাছাড়া বাড়তি নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রিমিয়াম দিতেও রাজি হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ব্যবস্থা অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং যেসব দেশকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা, তাদেরই ঝুঁকির মুখে ফেলে। এর বিপরীতে ইরানের 'ইসলাহ'—অর্থাৎ সংস্কার—একটি স্থিতিশীল কাঠামো প্রস্তাব করে, যা এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক ও জিসিসি রপ্তানিকারকদের যৌথ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে।
ইরানের জন্যও এটি একটি সুযোগ—দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও আর্থিক চাপ থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও স্থিতিশীলভাবে যুক্ত হওয়ার। একটি দূরদর্শী রাষ্ট্র এই সাময়িক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের শর্তে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
লেখক: মানোসিজ মজুমদার লেখকের ছদ্মনাম; তিনি একজন স্বাধীন লেখক ও বিশ্লেষক।
