জ্বালানি আমদানির চাপ কমাতে বৈদ্যুতিক যানে শুল্ক কমানোর চিন্তা সরকারের
জ্বালানি সংকটের অব্যাহত চাপ এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির মুখে সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), বিশেষ করে বাণিজ্যিক পরিবহনে এর ব্যবহার বাড়াতে আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি বছরের মার্চের শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ করেছে, যাতে বৈদ্যুতিক বাস, ট্রাক, ডাম্পার ও এক্সকাভেটরের ওপর আরোপিত কাস্টমস ডিউটি ও সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের তুলনায় নিচে নামানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ পদক্ষেপ শিল্প ও বাণিজ্য খাতে পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই প্রস্তাব এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য ইতোমধ্যে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে ব্যবসায়িক খাতে চাপ সৃষ্টি করছে এবং মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, "বর্তমান শুল্ক কাঠামো ইভি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে। বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ওপর জ্বালানিচালিত যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি কর আরোপ করা হয়েছে, আমরা যখন জ্বালানি নির্ভরতা কমানো ও জ্বালানি ব্যয় ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি— তখন এটা উল্টো রেজাল্ট দিচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, প্রচলিত যানবাহন পর্যায়ক্রমে বাদ দিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিকে উৎসাহিত করতে চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
ইভিতে করের বাধা
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি ডিজেল বা পেট্রলচালিত বাস আমদানিতে প্রায় ৩৯.৭৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, যেখানে একটি বৈদ্যুতিক বাসের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৯৩.১৬ শতাংশ। একইভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত ট্রাকে ৩৯.৭৫ শতাংশ শুল্ক থাকলেও বৈদ্যুতিক ট্রাকে তা ৬১.৮০ শতাংশ।
অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য বিদ্যমান। বৈদ্যুতিক ডাম্পার ও টিপারে ৬১.৮০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যেখানে প্রচলিত যানবাহনে তা ৪৫.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক এক্সকাভেটরের ওপর শুল্ক ৯৩.১৬ শতাংশ পর্যন্ত, যেখানে জ্বালানিচালিত এক্সকাভেটরে তা মাত্র ২৮.৭৩ শতাংশ।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে ইভি ব্যবহারে খরচ কম হলেও এই বৈষম্যমূলক কর কাঠামো ব্যবসায়ীদের বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তর থেকে বিরত রাখছে। তাদের মতে, ইভিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
যেমন একটি ডিজেলচালিত ভারী ট্রাক প্রতি ১০০ কিলোমিটারে সাধারণত ২৫ থেকে ৪০ লিটার জ্বালানি খরচ করে, যা লোড ও সড়ক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ট্রাকের জ্বালানি বা ডিজেলের দামের অস্থিরতার কারণে পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়ছে। বিপরীতে বৈদ্যুতিক ট্রাক বিদ্যুৎমূল্য ও ব্যবহারের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয় কমাতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো এখনো পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, "সরকার পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহী। তবে নীতিটি এখনো খসড়া পর্যায়ে থাকায় এতে পরিবর্তন আসতে পারে—কিছু প্রস্তাব যুক্ত হতে পারে, আবার কিছু সংশোধনও হতে পারে।"
২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% ইভির লক্ষ্য খসড়া নীতিতে
শুল্ক কমানোর এই প্রস্তাবটি খসড়া "ইলেকট্রিক ভেহিকল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫"-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও কর্পোরেট বহরের অন্তত ৩০ শতাংশ যানবাহন বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই খসড়া নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি ইভি আমদানিতে শুল্ক ৩৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের ইভির ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিবন্ধন ফি, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ফিটনেস সার্টিফিকেটের ওপর কর ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নিবন্ধন ফি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হতে পারে।
এছাড়া ক্রেতারা গাড়ির মূল্যের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ সুবিধা পেতে পারেন, যা আট বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য হবে—এটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের জন্য রূপান্তর সহজ করতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য পুরনো জ্বালানিচালিত যানবাহন প্রতিস্থাপন করা, বিশেষ করে গণপরিবহন ও লজিস্টিক খাতে।
গত বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই খসড়া নীতি প্রণয়ন করে, যেখানে যানবাহনের নির্গমন কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহনে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
ইভি গ্রহণে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ইভি বিক্রি ২ কোটির বেশি ছাড়িয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
চীনে মোট যানবাহন নিবন্ধনের ১২ শতাংশই ইভি এবং দেশটির স্থানীয় বাজারে গাড়ি বিক্রির প্রায় অর্ধেকই এখন বৈদ্যুতিক। বৈশ্বিক ইভি শিল্পের নেতৃত্বে থাকা এই দেশটি গত বছর জ্বালানি আমদানি ব্যয় ১০ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানের দ্রুত প্রচলন এবং তেল নির্ভরতা কমাতে—ভারত ও ভিয়েতনাম করছাড়, ভর্তুকি এবং স্থানীয় উৎপাদন সহায়তার মতো আগ্রাসী প্রণোদনা চালু করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে ইভি গ্রহণের হার এখনো রীতিমতো শ্লথগতির। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে ১৭৮টি এবং ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মাত্র ৮২টি ইভি আমদানি হয়েছে। এদিকে ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস ক্রয়ের পরিকল্পনাও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা ইভি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও—আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, "বিশ্ব দ্রুত বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে এগোচ্ছে, বাংলাদেশকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। তবে কর প্রণোদনা আমদানির চেয়ে স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজনের পক্ষেই বেশি হওয়া উচিত।"
তিনি জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বে দেশে ইভি সংযোজন ও উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। "নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠবে," বলেন তিনি।
দেশেই ইভি উৎপাদনের অন্যতম অগ্রদূত বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড—চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০০ একর জমিতে ১,৪৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি কারখানা নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। তবে গ্যাস সংযোগে বিলম্বের কারণে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবির বলেন, আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর বর্তমানে প্রায় ৬১ শতাংশ শুল্ক থাকাটা একটি বড় বাধা। "প্রতিযোগিতামূলক ইভি শিল্প গড়ে তুলতে হলে—সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ির তুলনায়, যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কম হওয়া জরুরি। রপ্তানিতে প্রণোদনাও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে," বলেন তিনি।
এদিকে রানার অটোমোবাইল লিমিটেড সম্প্রতি চীনের বিওয়াইডি-র সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সংযোজন বা উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করতে একটি চুক্তি করেছে, যা বাংলাদেশের বাজার নিয়ে বৈশ্বিক ইভি নির্মাতাদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
