নুন, নৌবহর এবং রক্ত: হরমুজ যেভাবে বাণিজ্যের শ্বাস!
পারস্য উপসাগরের ইতিহাসে হরমুজ নামটা শুধু একটি ভূগোল নয়। এ হলো দীর্ঘ সময়জুড়ে গড়ে ওঠা ক্ষমতা, বাণিজ্য আর টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। ইরানিকা অনলাইনে প্রকাশিত উইলেম এম ফ্লোরের গবেষণায় দেখা যায়, এই হরমুজ এক জায়গায় থেমে থাকা কোনো শহর নয়। বরং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া একাধিক অবস্থান। একাধিক বাস্তবতা। আর একটানা অভিযোজনের ইতিহাস। ৬৫০-৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরবদের হাতে হরমুজ পতনের মাধ্যমে এখানে ইসলামি যুগের সূচনা হয়।
এই পতন কোনো অবসান ছিল না; বরং এখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন উত্থান, যেখানে শহরটি ধীরে ধীরে ইসলামি বিশ্বের বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে এবং দশম শতকে এসে কেরমান এবং সিস্তানের প্রধান বন্দর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। অবশ্য তৎকালীন গোটা পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে বড় বন্দর ছিল জান্নাবা। এই সময়ের হরমুজ শুধু বন্দর নয়, এটি উৎপাদনেরও কেন্দ্র ছিল। জোয়ার, নীল, জিরা এবং আখের চাষ হতো। অন্যদিকে খেজুরের জন্য হরমুজ এতই পরিচিত ছিল যে বলা হতো, সমগ্র পারস্যের খেজুরের জোগান এখান থেকেই আসে। এমন এক শুষ্ক অঞ্চলে এই কৃষি সম্ভব হয়েছিল কানাত পদ্ধতির মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে মাটির তল দিয়ে নহর বানিয়ে পানি আনা হতো এবং সেটিই জীবনধারণের ভিত্তি তৈরি করত। শহরটির অবস্থান ছিল জাইয নামে একটি উপসাগরের মাথায়। যেখানে বড় বড় গুদামঘর ছিল এবং আশপাশের গ্রামগুলোতেও এই গুদামের বিস্তার দেখা যেত।
স্বাভাবিকভাবেই এটি কেবল পণ্য আমদানি বা রপ্তানির স্থান নয়, বরং একটি সংরক্ষণ ও পুনর্বণ্টনের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের এক বর্ণনায় এই শহরকে 'হরমুজ আল-সাহেলিয়া' বলা হয়েছে। অর্থাৎ উপকূলের হরমুজ। একই নামের অন্যান্য শহরের সঙ্গে বিভ্রান্তি দেখা না দেয়, সে জন্য এই নাম দেওয়া হয়েছিল। সে যুগের বিবরণ অনুযায়ী 'হরমুজ আল-সাহেলিয়া' ছিল বড়সড়, সুগঠিত এবং কেরমানের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। একাদশ শতাব্দীর পর থেকে হরমুজ ধীরে ধীরে একটি ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয়। 'হরমুজ আল-সাহেলিয়া'র শাসকেরা সম্ভবত ওমান থেকে এসেছিল; তারা শুধু নিজেদের শহরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পারস্য উপসাগরের দুই তীর নিয়ন্ত্রণের জন্য ওমান উপকূলে কালহাত ও জুলফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দখল করে এবং সেগুলোকে উন্নত করে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় কখনো এই শাসকগোষ্ঠী ফার্সের আতাবকদের অধীন, আবার কখনো কেরমানের শাসকদের অধীন হয়ে পড়ে, অর্থাৎ টিকে থাকার জন্য তাদের সব সময় যখন যেমন তখন তেমন নীতি মেনে চলতে হয়েছে।
১২২৮ সালে হরমুজের শাসক কায়েস দ্বীপ দখল করেন এবং পরে সেটি ফার্সের আতাবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, কিন্তু ১২৭৮ সালের পর থেকে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। রাজপরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব, হত্যা এবং ক্ষমতার লড়াই। সে সময় বিভিন্ন দাবিদার কখনো ফার্স, কখনো কেরমানের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ রকম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও হরমুজের বাণিজ্য থেমে থাকেনি। বরং তার সমৃদ্ধি এমন পর্যায়ে ছিল যে মার্কো পোলো, যিনি ১২৭২ ও ১২৯৩ সালে এখানে আসেন, তিনি শহরের জমজমাট বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি এর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও তীব্র গরমের কথাও বলেন।
এই অস্থির সময়েই সামনে আসেন আমির বাহা আল-দিন আয়াজ, যিনি একসময় দাস ছিলেন কিন্তু পরে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ১২৯৬ সালে ফার্সের সহায়তায় হরমুজের শাসনভার গ্রহণ করেন; তখন দক্ষিণ-পূর্ব পারস্যে চাগতাইদের আক্রমণ ক্রমাগত বেড়ে চলছিল এবং এই হুমকির মুখে আয়াজ এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা হরমুজের ইতিহাসকে পুরোপুরি বদলে দেয়—তিনি পুরো শহর, তার মানুষ, সম্পদ এবং বাণিজ্যিক কাঠামোকে সরিয়ে নিয়ে যান জারুন নামের একটি ছোট দ্বীপে। এই দ্বীপটি তিনি ফার্সের শাসকদের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত ছিল একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে অত্যন্ত কৌশলী; কারণ, পুরোনো হরমুজ তখন ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছিল—মিনাব নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলো পলি জমে ভরে যাচ্ছিল, জাহাজ চলাচল কঠিন হয়ে উঠছিল এবং একসময়ের ব্যস্ত বন্দর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছিল, যার ধ্বংসাবশেষ আজও মিনাবের কাছাকাছি এলাকায় দেখা যায়। জারুন দ্বীপটি নিজে কোনো আরামদায়ক জায়গা ছিল না—এখানে ছিল না কোনো মিঠাপানি, না কোনো গাছপালা। গ্রীষ্মের দাবদাহে তাপমাত্রা ছিল অসহনীয়; দ্বীপটির সমস্ত সরবরাহ ওমান, পারস্যের মূল ভূখণ্ড এবং কেশম দ্বীপ থেকে আনতে হতো, তবুও এর একটি বড় সুবিধা ছিল এর অবস্থান। এই অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলকে উপজাতীয় আক্রমণ এবং পরবর্তী সময়ে তৈমুরের আক্রমণ থেকেও তুলনামূলক নিরাপদ করে তোলে।
এই দ্বীপেই গড়ে ওঠে নতুন শহর, যার নাম দেওয়া হয় নতুন হরমুজ এবং দ্বীপের উত্তর দিকে একটি সুরক্ষিত বন্দর তৈরি করা হয়, যেখানে শহরটি একটি ত্রিভুজাকৃতির সমতলে বিস্তৃত ছিল এবং যার দক্ষিণ প্রাচীর প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে 'নতুন' শব্দটি হারিয়ে যায় এবং শহর ও দ্বীপ উভয়ই শুধু হরমুজ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে জারুন নামটি স্থানান্তরিত হয় মূল ভূখণ্ডের একটি মৎস্যগ্রামে, যা পরবর্তী সময়ে বান্দার আব্বাস নামে পরিচিত হয়। নতুন হরমুজ দ্রুতই একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। এই বাণিজ্যকেন্দ্রে পারস্য উপসাগরের ছোট ছোট বন্দরগুলো থেকে পণ্য এসে জমা হতো এবং সেখান থেকে ক্যারাভান পথে ভেতরের বাজারগুলোতে পাঠানো হতো। এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য হরমুজে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাজারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থল ও সমুদ্রপথের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিকল্প বন্দরগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলো সব সময় নিজেদের আকর্ষণ বাড়ানোর চেষ্টা করত; আয়াজ ১৩১১-১৩১২ সাল পর্যন্ত শাসন করেন এবং এরপর রাজপরিবারের একজন সদস্য ক্ষমতায় ফিরে আসেন। আর ১৩২০ সালে মির কুতব আল-দিন তাহামতান কায়েস দ্বীপ এবং পরে বাহরাইন দখল করে হরমুজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের হটিয়ে দেন, যার ফলে এটি পারস্য উপসাগর ঘিরে থাকা দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী প্রায় ৩০০ বছর ধরে হরমুজ তার অধিবাসীদের জন্য বিপুল সম্পদ এনে দেয়।
এরপরও ভেতরে ভেতরে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বন্ধ হয়নি। বরং চলতেই থাকে। চতুর্দশ শতকের শুরুতে ইতালীয় ধর্মযাজক ওডরিক এই শহরকে একটি শক্তিশালী দুর্গবেষ্টিত নগরী হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে দামি পণ্যের প্রাচুর্য থাকলেও গাছপালা ও মিঠাপানির অভাব ছিল এবং গরম ছিল প্রায় অসহনীয়। এরও কয়েক বছর পর ইবনে বতুতা এখানে এসে উল্লেখ করেন যে উপকূলের শহর এবং দ্বীপের শহর মিলিয়ে এটি ছিল একটি বিশাল ও সমৃদ্ধ নগরী। এই সমৃদ্ধ নগরীর বাজারগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যস্ত। পঞ্চদশ শতকে এসে হরমুজ হয়ে ওঠে এক বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র; যেখানে মিসর, সিরিয়া, আনাতোলিয়া, পারস্যের বিভিন্ন প্রদেশ, তুর্কিস্তান, দক্ষিণ রাশিয়া, চীন, জাভা, বাংলা, তেনাসেরিম (বর্তমান মিয়ানমারের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল), থাইল্যান্ড, সোকোত্রা (ইয়েমেন উপকূলের কাছের আরব সাগরের দ্বীপ), বিজাপুর (দক্ষিণ ভারতের একটি ঐতিহাসিক সালতানাত), মালদ্বীপ, মালাবার, আবিসিনিয়া, জাঞ্জিবার, গুজরাট, কাম্বে (ভারতের গুজরাটের প্রাচীন বন্দরনগরী), আরব, আদেন, জেদ্দা, ইয়েমেনসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসত। ১৪৪২ সালে আবদ আল-রাজ্জাক সামরকন্দি এ নগরীকে এক বিশাল এম্পোরিয়াম হিসেবে বর্ণনা করেন, আর রুশ পর্যটক আফানাসি নিকিতিন এটিকে এমন এক জায়গা বলেন, যেখানে পৃথিবীর সব জায়গার মানুষ ও পণ্য পাওয়া যায়, যদিও তিনি উচ্চ শুল্কের কথাও উল্লেখ করেন। একইভাবে ভেনিসের জে বারবারোও এটিকে এক অসাধারণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রশংসা করেন।
পারস্য উপসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা হরমুজ যখন তার বাণিজ্যিক শক্তির চূড়ায়, ঠিক তখনই দিগন্তে দেখা দেয় নতুন এক শক্তি, ইউরোপীয় সমুদ্র সাম্রাজ্য। ইরানিকা অনলাইনে উইলেম এম ফ্লোর দেখিয়েছেন, ১৫০৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পর্তুগিজ নৌবহর আলফোঁসো দে আলবুকার্কের নেতৃত্বে হরমুজে এসে হামলা চালায়। এই আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত ও নির্মম। স্থানীয় নৌবহরকে পরাজিত করা হয়, বহু মানুষ নিহত হয়, আর শহরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এক নতুন বাস্তবতা, যেখানে স্থানীয় শক্তির বদলে বিদেশি কামানের আওয়াজই হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের ভাষা।
আলবুকার্ক প্রথম ধাক্কাতেই পুরোপুরি দখল নেননি; বরং তিনি বুঝেছিলেন, এই বন্দরকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর বাণিজ্য চালু রাখতে হবে। তাই জারুন বা নতুন হরমুজকে সরাসরি ধ্বংস না করে সেটিকে একটি খাজনাদাতা শহরে পরিণত করা হয়। বছরে ১৫ হাজার আশরাফি কর ধার্য করা হলো। এই অঙ্ক বেশ বিশাল এবং সেই করের বিনিময়ে শহরটি বেঁচে থাকার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে একটি দুর্গ নির্মাণ শুরু হয়, যাতে ভবিষ্যতে এই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করা যায়। কিন্তু ভাগ্যের খেলা—নিজের নৌবহরের ভেতরেই চারজন ক্যাপ্টেন বিদ্রোহ করে বসে, ফলে ১৫০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলবুকার্ককে অসমাপ্ত দুর্গ ফেলে দ্বীপ ছেড়ে ভাগতে হয়। এই পিছু হটা স্থায়ী হয়নি। ১৫১৫ সালে তিনি আবার ফিরে আসেন। এবার আর কোনো ঝুঁকি নেননি। সরাসরি পর্তুগিজ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী এই শাসন এক শ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে থাকে।
এই সময় পারস্যের সাফাভি শাসক শাহ ইসমাইল প্রথম এই দখলের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন, তিনি তখন একসাথে উজবেক ও উসমানীয় শক্তির সঙ্গে লড়ছেন, আর তার নিজের কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনীও নেই। ফলে প্রতিবাদ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। হরমুজ এর মধ্যে তার পুরোনো নীতি—মূল ভূখণ্ডের শাসকদের নির্দিষ্ট কর দিয়ে নিরাপদ বাণিজ্যপথ নিশ্চিত করা—চালিয়ে যেতে চাইলেও পর্তুগিজরা এসে সেই ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যের প্রবাহ আটকে ফেলে।
জুলফার, আজকের রাস আল-খাইমা (সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্তরাঞ্চলের একটি উপকূলীয় আমিরাত), ছিল হরমুজের অধীনস্থ এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। এখানকার বাণিজ্য থেকেও হরমুজের রাজকোষ ভরে উঠত। ফলে পর্তুগিজদের কাছে খুব দ্রুতই পরিষ্কার হয়ে ওঠে—হরমুজ ধরে রাখতে হলে শুধু দ্বীপ নয়, আশপাশের বন্দরগুলোকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। তারা দ্রুত জুলফারসহ পারস্য উপসাগরের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর দখল করে নেয়।
এই সময় হরমুজের রাজাদের পুরোপুরি ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি, কিন্তু তাদের ক্ষমতা কার্যত শূন্যে নেমে আসে। তারা নামমাত্র শাসক হিসেবে থেকে যায়, কিন্তু তাদের আনুগত্য চলে যায় পর্তুগালের রাজার দিকে। নিজেদের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোর ওপরও তারা আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না।
তবুও এক অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে, এই রাজনৈতিক দখলদারির মধ্যেও হরমুজের বাণিজ্য একেবারে ভেঙে পড়েনি। ১৫২১-২২ সালে স্থানীয় বিদ্রোহ হয়। ১৫৫২ এবং ১৫৮১ সালে উসমানীয়রা নৌ-আক্রমণ চালায়। কিন্তু শহরটি তার বাণিজ্যিক প্রাণশক্তি ধরে রাখে। কারণ, একবার কোনো জায়গা বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠলে সেটাকে সহজে হটানো যায় না।
১৫৪০ সালে ইতালীয় পর্যটক মিকেলি মেমব্রে যে বিবরণ দিয়েছেন, তাতে এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি দেখেছেন—শহরটি আকারে ছোট, প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসতি, দুর্গটিও খুব বড় নয়, কিন্তু সেখানে প্রচুর কামান বসানো। শহরের ঘরবাড়ি দুর্গকে ঘিরে তৈরি, আর ভেতরে রয়েছে একটি পানির বড় সঞ্চয়কেন্দ্র। শহরের মানুষ মূলত মুসলমান, তার মধ্যে অল্পসংখ্যক পর্তুগিজ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখানে বাণিজ্য চলছে জোরকদমে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসছে। কখনো খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, আবার কখনো প্রাচুর্য। বসরা থেকে জাহাজ আসছে, হিন্দুস্তান থেকে আসছে, এমনকি মক্কার দিকের সমুদ্রপথ থেকেও আসছে—মানে এটি এখনো একটি বৈশ্বিক সংযোগস্থল।
১৬১৭ সালে দে সিলভা ই ফিগুয়েরোয়া হিসাব করে দেখেন, শহরে আড়াই থেকে তিন হাজার পরিবারের বসবাস। এদের মধ্যে প্রায় দুই শ পরিবার পর্তুগিজ। এই সংখ্যাটা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এতে বোঝা যায়, পর্তুগিজরা এখানে শুধু সামরিক শক্তি হিসেবে নয়, সামাজিকভাবেও জায়গা করে নিয়েছিল।
এই সময় হরমুজ আর শুধু বাণিজ্যের জায়গা নয়, এটি হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিস্তারের কেন্দ্র। এখান থেকেই পর্তুগিজরা পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রচার চালায়। ফ্রান্সিস জেভিয়ার নিজে যাজক গাসপার বারজেউসকে এই কাজ শুরু করার জন্য পাঠান। ১৫৮৫ সালের দিকে এখানে অগাস্টিনীয় মঠ গড়ে ওঠে, যা একদিকে ধর্মপ্রচারের ঘাঁটি, অন্যদিকে সাফাভি দরবারের সঙ্গে যোগাযোগের একটি সেতু হিসেবেও কাজ করে।
কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। প্রথম শাহ আব্বাস ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি বিদেশি শক্তির উপস্থিতি মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। তার কাছে এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, মর্যাদার প্রশ্নও ছিল।
বহু বছর ধরে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাহরাইন ১৬০২ সালে দখল করেন তার সেনাপতি আল্লাহভেরদি খান। এরপর ১৬১৪ সালে গামরু দখল করা হয়। এই গামরু পরে বান্দার আব্বাস নামে পরিচিত হয়। এটিই ছিল পারস্যের মূল ভূখণ্ডে পর্তুগিজদের শেষ ঘাঁটি।
এরপর আসে চূড়ান্ত লড়াই। ১৬২২ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌ-সহায়তা নিয়ে ইমামকুলি খান কেশম এবং হরমুজ আক্রমণ করেন। যুদ্ধটি ছিল তীব্র, দীর্ঘ ও সিদ্ধান্তমূলক। শেষ পর্যন্ত পর্তুগিজরা পরাজিত হয়। হরমুজের দুর্গ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ দিয়ে বান্দার আব্বাসে ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়, এমনকি জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্যও সেই পাথর ব্যবহার করা হয়। একসময়ের শক্তিশালী দুর্গ পরিণত হয় অন্য শহরের নির্মাণসামগ্রীতে।
এখানে এসে গল্পটা অদ্ভুতভাবে মোড় নেয়। হরমুজকে পুনরায় দখল করার পর শাহ আব্বাস ও তার উত্তরসূরিরা এই দ্বীপকে আর বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন, বাণিজ্যের কেন্দ্র থাকুক মূল ভূখণ্ডে, বিশেষ করে বান্দার আব্বাসে। ফলে হরমুজ ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।
তবুও এটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে যায়নি। পারস্য সেনাদের কিছু কর্মকর্তা দ্বীপের প্রশাসনের দায়িত্ব পায় এবং তাদের জীবিকার জন্য মিনাব এলাকায় জমি দেওয়া হয়। তাদের প্রধান কাজ ছিল, এই দ্বীপ যেন আবার কোনো বিদেশি শক্তির ঘাঁটি হয়ে না ওঠে।
দ্বীপের বাস্তবতা খুব একটা বদলায় না। নিজের মতো করে বড় কোনো উৎপাদন নেই, প্রায় সবকিছুই বাইরে থেকে আনতে হয়। গ্রীষ্ম এলেই মানুষ মূল ভূখণ্ডে, বিশেষ করে মিনাবের খেজুরবাগানগুলোতে চলে যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ তখনো সীমিতই থেকে যায়—পাথুরে নুন আর লৌহ অক্সাইড উত্তোলন, সঙ্গে মাছ ধরা—এই ছিল জীবিকার মূল ভরসা।
তবুও ভৌগোলিক অবস্থান হরমুজকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হতে দেয়নি। ডাচরা সতেরো শতকে এই দ্বীপের প্রতি আগ্রহ দেখায়। বিশেষ করে বাণিজ্যিক সংঘাতের সময় তারা দ্বীপটিতে ঘাঁটি করার কথা ভাবে।
১৭১৭ সালে মাসকাটের ইমাম দ্বীপটি অবরোধ করেন, কিন্তু দখল করতে পারেন না। পরে বনি মাঈন গোত্র দ্বীপের প্রশাসন নেয় এবং নাদির শাহের নৌবহরের জন্য নাবিক সরবরাহ করে। পরে তারা বিদ্রোহেও জড়িয়ে পড়ে। ১৭৯৫ সালে মাসকাটের ইমাম কিছু গোষ্ঠীকে এখানে বসতি স্থাপন করান, যারা পরে কর না দেওয়া জাহাজে হামলা শুরু করে। ১৮০৩ সালে তারা ব্রিটিশ জাহাজেও আক্রমণ চালালে ব্রিটিশরা হস্তক্ষেপ করে এবং তাদের সরিয়ে দেয়। এরপর আবার বনি মাঈন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আশপাশের দ্বীপ ও বান্দার আব্বাসও তাদের অধীনে আসে। ১৭৯৮-১৮৫৪ সাল পর্যন্ত পারস্যের সঙ্গে ইজারা চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ কার্যত মাসকাটের প্রশাসনের অংশ হয়ে থাকে।
এই সময় হরমুজ আর আগের মতো বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি হয়ে যায় এক সাধারণ দ্বীপ, যেখানে নুন আর লৌহ অক্সাইড খনন হয়। গরমের সময় মানুষ মূল ভূখণ্ডে চলে যায়, স্থায়ী বাসিন্দা থাকে মূলত জেলেরা।
বিশ শতকে এসে প্রায় তিন হাজার মানুষ এখানে বাস করত, আর তাদের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা। ১৯৯০-এর দশকে এসে চোরাচালানও একটি বড় আয়ের উৎস হয়ে ওঠে।
আজকের পৃথিবীতে হরমুজ আবার গুরুত্বপূর্ণ—তবে ভিন্ন কারণে। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। আর ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরিতার কারণে এই প্রণালি এখন বিশ্ব রাজনীতির এক স্পর্শকাতর স্নায়ুতে পরিণত হয়েছে।
একসময়ের বাণিজ্য শহর, পরে সাম্রাজ্যের ঘাঁটি, তারপর প্রায় ভুলে যাওয়া দ্বীপ—হরমুজ আজ আবার ফিরে এসেছে, তবে অন্য রূপে—একটি সংকীর্ণ পানিপথ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা।