দ্য টেরোরিস্ট ইন চিফ: আমাদের এই কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে
কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে সবকিছু উড়িয়ে দেওয়া হবে- ইরানকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারণ করা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হুমকির সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান। আমেরিকান অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাবস্ট্যাক-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এই হুমকিকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। পাঠকদের জন্য তার লেখাটি তুলে ধরা হলো-
আইসিই — হ্যাঁ, সেই আইসিই-এর মতে, সন্ত্রাসবাদ বলতে বোঝায় 'মানুষ বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকির মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শকে এগিয়ে নেওয়া।'
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে এও বলা হয়েছে, 'সন্ত্রাসীরা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাকে আঘাত কিংবা হত্যা করছে, তার কোনো পরোয়া করে না।'
গত রোববার ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যে পোস্ট করেছেন, সেটি যদি আপনি না পড়ে থাকেন, তাহলে একটু সময় নিয়ে পোস্টটি পড়ে নিন। মিডিয়ায় নরম সুরে বলা বর্ণনার ওপর নির্ভর করবেন না। পড়া শেষে তারপর আমাকে বলুন যে ট্রাম্পের বক্তব্য তার নিজের কর্মকর্তাদের দেওয়া সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আমাকে বলবেন না যে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ন্যায়সঙ্গত, আর ইরানের শাসনব্যবস্থা খারাপ। সন্ত্রাসীরা সবসময়ই এমন কথা বলে। কখনো কখনো তাদের এসব কথা সত্য হলেও সন্ত্রাসবাদকে এর লক্ষ্য দিয়ে নয়, বরং এর পদ্ধতি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। অর্থাৎ, নিরীহ মানুষের ওপর সহিংস আক্রমণের মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টাই এর মূল বৈশিষ্ট্য।
ট্রাম্প ঠিক এটাই করছেন। তিনি কথা না মানলে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছেন। আর যেহেতু তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জরুরি পরিষেবাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলছেন, তাই এটি শুধু সম্পত্তির ওপর নয়, বরং মানুষের ওপরও সম্ভাব্য আক্রমণের হুমকি।
পরবর্তীতে রোববার ট্রাম্প এক্সিওসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে 'গভীর আলোচনা' চালাচ্ছে। এমন কিছু আদৌ হচ্ছে কি না- তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করার জন্য আমাকে আপনারা ক্ষমা করুন।
ট্রাম্প এ হুমকিও দিয়েছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে 'আমি ওখানে সবকিছু উড়িয়ে দেব'।
কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হবে- এমন কিছু বলেও ভণিতা করেননি ট্রাম্প। বরং তিনি সরাসরি এসব হুমকি দিয়েছেন। তার এমন পদক্ষেপের ফলে যে মৃত্যু ও দুর্ভোগ তৈরি হবে, সেটির জন্য অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে তিনি যেন তা উপভোগই করছেন।
অন্যদিক থেকে ভাবলে, আমি এটা বলছি না যে ট্রাম্প সহিংসতার হুমকি দিচ্ছেন; বরং তিনি সহিংসতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ওই জঘন্য পোস্টটি কোনো আলোচনার কৌশলের অংশ নয়। কারণ, আগামীকাল সন্ধ্যার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে- এমন সম্ভাবনাও শূন্য। আসলে ইরান চাইলেও এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রণালিটি খুলে দিতে পারবে না।
এর কারণ হলো- মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রভাব কমাতে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বিকেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। ফলে তেহরান যদি চায়ও, তবুও তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরো সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারবে না। আর অবশ্যই তারা এমনটা করতে চায়ও না। কারণ, তারা মনে করে ইরান জয়ী হচ্ছে। ট্রাম্প এবং তার আশপাশের লোকেরাও অবশ্য তা মনে করেন, যদিও তারা কখনো এটি স্বীকার করবেন না।
সন্ত্রাসবাদ হলো দুর্বলদের কৌশল। যখন চরমপন্থীরা সামরিক শক্তি বা অন্য বৈধ উপায়ে তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তখন তারা এই পথ বেছে নেয়।
আর এখানেই ট্রাম্প ও তার কর্মকর্তারা এসে দাঁড়িয়েছেন। তারা একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী পেয়েছিলেন (যেটিকে তারা দ্রুত দুর্বল করে দিচ্ছেন)। কিন্তু এত শক্তি থাকার পরেও এই বাহিনীর পক্ষে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে চালু করা সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্পপন্থীরা এখন নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর কষ্ট ও মৃত্যু চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনে কোনো কাজে দেবে না।
আমি জানি না সময়সীমা শেষ হলে এবং প্রণালিটি বন্ধই থাকলে ট্রাম্প কী করবেন। সম্ভবত তিনি নিজেও জানেন না। কিন্তু তিনি ব্যাপক পরিসরে যুদ্ধাপরাধ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিশ্বের যেসব দেশের এই ক্ষেত্রে প্রভাব রাখার মতো সক্ষমতা রয়েছে এবং যারা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার বৃত্তের বাইরে আছেন, তাদের সবার দায়িত্ব তাকে থামানোর জন্য যা যা সম্ভব তার সবকিছুই করা।
সবচেয়ে জরুরি হলো, সামরিক কর্মকর্তাদের জানা উচিত যে অবৈধ আদেশ অমান্য করার দায়িত্ব ও অধিকার তাদের আছে। এত দ্রুত আমরা এই অবস্থায় পৌঁছেছি—এটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
আপনার হয়তো মনে আছে, অ্যাডমিরাল অ্যালভিন হলসি ডিসেম্বর মাসে পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ, তিনি অবৈধ হামলায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ট্রাম্প এখন যা করার কথা বলছেন, তা এর চেয়েও বহু গুণে ভয়াবহ। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অস্বীকৃতিই হয়তো একমাত্র উপায়, যা এই মন্দ কাজকে থামাতে পারে।
এখনই সময় বোঝা যাবে, আমাদের এক সময়ের মর্যাদাপূর্ণ সামরিক বাহিনী ভেতর থেকে কতটুকু নষ্ট হয়ে গেছে।
সামরিক বাহিনীর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক রাজনীতিবিদ, এমনকি প্রত্যেক জনপরিচিত ব্যক্তিরও স্পষ্ট করে এটাই বলা উচিত যে ট্রাম্প তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন না।
রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা জানেন—তাদের বেশিরভাগই জানেন, ট্রাম্প নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। তবুও রিপাবলিকানরা কেবল এই ভয়ে চুপচাপ থাকবেন, যাতে ট্রাম্প তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কাউকে সমর্থন না করেন। আশা করা যায়, রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনো কিছু প্রকৃত দেশপ্রেমিক আছেন।
আবার এটি এমন সময়ও নয় যে ডেমোক্র্যাটরা কৌশলবিদদের কথা শুনে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চুপ থাকবেন এবং শুধু নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে কথা বলবেন। বাস্তবে এটি খারাপ রাজনৈতিক কৌশলও। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাবের একটি কারণ হলো- তাদের দুর্বল ও অকার্যকর মনে করা। ট্রাম্পের এই অপরাধমূলক উন্মত্ততাকে উপেক্ষা করলে সেই ধারণা আরও জোরদার হবে। তাছাড়া এই যুদ্ধে জনসমর্থনও দিন দিন কমছে।
যাই হোক, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে নাগরিক দায়িত্বই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
বিষয়টি ভয়াবহ হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে একজন সন্ত্রাসী প্রেসিডেন্ট আছে। পুরো বিশ্ব তা জানে। তবে এখনো আমাদের সুযোগ আছে বিশ্বকে এটাই দেখানোর যে তিনি (ডোনাল্ড ট্রাম্প) ব্যতিক্রম, আমরা সন্ত্রাসী জাতি নই। আর তা আমরা করতে পারি সেই মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়ে, যা সবসময় আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করেছে।
লেখক: নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ
