ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ ডোনাল্ড ট্রাম্প
সব যুদ্ধে বিজয়ী থাকে না, কিন্তু অন্তত একজন পরাজিত পক্ষ থাকে। আর যদি—একটি বড় 'যদি'—এই যুদ্ধবিরতিই ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায়, তবে এর সবচেয়ে বড় পরাজিত ব্যক্তি হবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাত তার প্রধান যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো থেকে তাকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং মার্কিন শক্তি প্রয়োগের নতুন পথ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির অগভীরতাকে প্রকাশ্যে এসেছে।
এই শান্তি অত্যন্ত নাজুক। লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির আওতায় ধরা হবে কি না, সে বিষয়ে আমেরিকা ও ইরান একমত হতে পারেনি—এদিকে ইসরাইল সেখানে এমন তীব্র হামলা চালাচ্ছে যে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ইচ্ছাকৃত বলেই মনে হচ্ছে।
আলোচনায় আমেরিকার পূর্বশর্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। কিন্তু তা কীভাবে খুলে দেওয়া হবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে। এমনকি তাদের আলোচনার বিষয়বস্তুগুলো অবস্থান এতটাই দূরে যে তারা এই সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে কোন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবে, তা নিয়েও একমত হতে পারছে না।
'মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় যুদ্ধে ফিরবেন না'—এমনটি মনে করার সেরা কারণ হলো, তিনি এখন বুঝতে পারছেন যে তার কখনোই এই যুদ্ধ শুরু করা উচিত হয়নি। ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে তার দেওয়া ঘৃণ্য সব পোস্টগুলো আসলে তার পিছুটানকে আড়াল করার একটি চেষ্টা মাত্র। তিনি জানেন, পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে বাজার আতঙ্কিত হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি 'স্বর্ণযুগ' আনার দাবি করার পর, এই ফোর-ডাইমেনশনাল দাবাড়ু নিজেকে বোকা হিসেবে জাহির করার ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
ইরানেরও পিছু হঠার কারণ রয়েছে। তাদের নেতারা একে একে নিহত হচ্ছেন। যদিও তারা তাদের নাগরিকদের তোয়াক্কা করে না (যুদ্ধে নিহত হাজার হাজার মানুষসহ), তবুও বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাপক ধ্বংস দেশটির শাসনকার্য পরিচালনা কঠিন করে তুলবে। তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও চায়। তেহরান মনে করতে পারে যে আলোচনার টেবিলে সময় তাদের পক্ষেই থাকবে। আমেরিকা স্থায়ীভাবে তার সেনাদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত রাখতে পারবে না। যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা হবে ইরানের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে।
তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো—একটি আহত ইরানি শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় টিকে থাকবে এবং আলোচনায় সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে। ইরানের এখন কোনো নৌবাহিনী বা বিমান বাহিনী নেই; তারা তাদের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হারিয়েছে এবং ব্যবহার করে ফেলেছে। সেগুলো পুনরায় তৈরি করতে গেলে তাদের এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে, ২১ হাজারের বেশি আমেরিকান ও ইসরায়েলি হামলায় তাদের অর্থনীতি কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
যদিও ট্রাম্প এটাকে এক বিরাট বিজয় বলছেন। কিন্তু যুদ্ধে তার তিনটি প্রধান লক্ষ্যের বিপরীতে এটিকে বিজয় বলে মনে হয় না: ইরানকে দমনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করা; শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো; এবং ইরানকে চিরতরে পারমাণবিক শক্তি হওয়া থেকে বিরত রাখা।
এই যুদ্ধ আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি শুরু হওয়ার আগে ইসরায়েল ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়া নেটওয়ার্ককে আংশিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। তবুও ইরান এখন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে নতুন এক দরকষাকষির সুযোগ তৈরি করেছে।
ইরান এখন এই প্রণালি ব্যবহারের জন্য মাশুল বা টোল দাবি করছে। ট্রাম্প এমনকি এই রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে ভাবছেন। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের গ্রাহকরা সম্ভবত নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এই আঘাত প্রতিহত করতে পারবে। তবে সামনে একটি বড় লড়াই রয়ে গেছে।
তেল উৎপাদনকারীরা উপসাগর এড়িয়ে নতুন পাইপলাইন তৈরি করার পরেও (যা কয়েক বছরের কাজ), ইরান গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশের প্রতীক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা উপসাগরী দেশগুলো এখন ভাবছে—তারা কি এখনও আমেরিকার ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাববে, নাকি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যাবে?
ট্রাম্পের তুচ্ছ দাবি সত্ত্বেও ইরানি শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তিনি হয়তো আশা করছেন, ইরানিরা শীঘ্রই তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে যাতে তিনি এর কৃতিত্ব নিতে পারেন। এটি সম্ভব, তবে যুদ্ধের আগের তুলনায় এখন এটি কম সম্ভাব্য বলে মনে হয়।
যুদ্ধের আগে শাসনব্যবস্থাটি তার ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অজনপ্রিয় ছিল। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অসুস্থতার কারণে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ উত্তরণের মুখে ছিল। যুদ্ধ সেই উত্তরণকে ত্বরান্বিত করেছে এবং আলীর ছেলে মোজতবাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। আলীর মতো তিনি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নন; আসল নিয়ন্ত্রণ এখন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং এর প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলগুলোর হাতে—যাদের সবাই যুদ্ধংদেহী জাতীয়তাবাদী।
এবং এই যুদ্ধ পারমাণবিক হুমকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের অবকাঠামোর আরও ক্ষতি করেছে, কিন্তু ৪০০ কেজির মতো উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম—যা দশটি বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট—এখনো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত আছে।
ট্রাম্প জেদ ধরে আছেন এই বলে যে ইরানকে এই 'পারমাণবিক ধুলো' সমর্পণ করতে হবে।
ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু ভবিষ্যতে আক্রমণ ঠেকাতে তাদের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির অনুপ্রেরণা এখন আরও বেড়েছে, যা সম্ভাব্যভাবে আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি একটি ভয়াবহ ফলাফল হবে, কিন্তু এটি থামাতে ট্রাম্প এবং ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টদের প্রতি কয়েক বছর পরপর হামলা চালাতে হতে পারে। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, এটি বজায় রাখা খুব কঠিন হবে।
এই সংঘাতের কারিগরদের অবস্থা এখন কোথায়? ইসরায়েল আজ যে সামরিক শক্তির অধিকারী, তা আগে কখনো ছিল না। কিন্তু এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে এই শক্তির সীমাবদ্ধতা কোথায় এবং কীভাবে তাদের আগাম হামলার ক্ষুধা অঞ্চলে ভীতি ও ঘৃণার সৃষ্টি করছে। অনেক ইসরায়েলের কাছে আমেরিকার সমান হয়ে লড়াই করা ছিল জাতীয় গর্বের বিষয়। কিন্তু ইসরায়েল রিপাবলিকান রাজনীতিবিদদের প্রশংসা পেলেও ৬০ শতাংশ আমেরিকান এখন দেশটিকে নেতিবাচকভাবে দেখে, যা গত বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এটি ইসরায়েলকে দুর্বল করে দিয়েছে।
ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকারও অনেক কিছু ভাবার আছে। দেশটি একসময় তার সামরিক শক্তির সাথে নৈতিক কর্তৃত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে ক্ষমতা অর্জন করত। কিন্তু যখন এই প্রেসিডেন্ট ইরানি সভ্যতা মুছে ফেলার হুমকি দেন—যা প্রকারান্তরে একটি গণহত্যা—তখন তিনি নৈতিকতাকে দুর্বলতার উৎস হিসেবে গণ্য করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ কেউ এমন আচরণ করছেন যেন আমেরিকা আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের মতো বিষয়গুলোতে আটকা পড়ে আছে। তাদের ধারণা, এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হলে তারা আরও শক্তিশালী হবে।
এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে 'জোর যার মুলুক তার' নীতিটি কেবল কয়েক দশকের পররাষ্ট্রনীতির অবমাননা নয়, বরং একটি ভ্রান্তি। যদিও ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব পূর্ণরূপে প্রদর্শিত হয়েছে—অপারেশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ভূপাতিত পাইলটদের উদ্ধার, কম খরচে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন—তবুও এটি গভীর সমস্যাগুলোকে উন্মোচিত করেছে।
এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে আমেরিকার শক্তির মূল্যকে অতিমূল্যায়ন করা সহজ। তাদের কারখানাগুলো সশস্ত্র বাহিনীকে দ্রুত রসদ সরবরাহ করতে পারছে না, যেখানে ইরান সীমিত অস্ত্র নিয়ে একটি অপ্রতিসম যুদ্ধ চালিয়েছে। অতিরিক্ত পুরুষত্ব বা শক্তি প্রদর্শনের নেশা এমন সব বিচারবুদ্ধিহীন সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায় যা প্রাণঘাতী আক্রমণকে বিজয়ের সাথে গুলিয়ে ফেলে। কৌশলহীন অন্ধ গোলাবর্ষণ কেবল আমেরিকার শক্তিকেই ক্ষয় করেছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা নিষ্ঠুর, কিন্তু ন্যায়সংগত যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথায় বিচার—যেখানে সহিংসতা শেষ বিকল্প। অথচ ট্রাম্প ইরানকে একটি ব্যক্তিগত প্রকল্পের মতো দেখেছেন, যেখানে আমেরিকার শক্তি তাকে পরিণতি নিয়ে ভাবার দায়িত্ব থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু শুধু শক্তিই ন্যায় নয়। কখনো কখনো তা বিজয়ও এনে দিতে ব্যর্থ হয়।
