প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ‘অবৈধ’: যুক্তরাজ্যের আদালতের এই রায়ের মানে কী?
ফিলিস্তিনপন্থী প্রচার গোষ্ঠী 'প্যালেস্টাইন অ্যাকশন'-এর ওপর যুক্তরাজ্য সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞাকে 'অবৈধ' ঘোষণা করেছে লন্ডন হাইকোর্ট। শুক্রবারের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং এতে যুক্তরাজ্যের সমর্থনের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল সংগঠনটি। এর জেরে গত বছরের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার গোষ্ঠীটিকে নিষিদ্ধ করে। তাদের আল-কায়েদা ও আইএসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাতারে ফেলে 'সন্ত্রাসী' সংগঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
শুক্রবার সকালে রয়্যাল কোর্টস অব জাস্টিসের বিচারকরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেন। রায়ে বলা হয়, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি ছিল 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ'।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শন সামারফিল্ড আল জাজিরাকে বলেন, শুক্রবারের এই রায় মূলত তাদের নির্দোষ প্রমাণ করেছে, যারা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন।
ক্যাম্পেইন গ্রুপ 'ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস'-এর তথ্যমতে, নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকে যুক্তরাজ্যজুড়ে 'আমি গণহত্যা বিরোধিতা করি' বা 'আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশন সমর্থন করি' লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে নীরব অবস্থান কর্মসূচির কারণে পুলিশ ২ হাজার ৭৮৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। শুক্রবারের রায়ের পর এ ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন আর বেআইনি বলে গণ্য হবে না।
ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস আরও জানায়, 'লিফট দ্য ব্যান' প্রচারণার অংশ হিসেবে জুম কলে বক্তব্য দেওয়ায় সন্ত্রাসবাদ আইনের ১২ ধারায় (সেকশন ১২) সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। রায়ের ফলে তাদের গ্রেপ্তারও অবৈধ বলে গণ্য হবে।
মামলা ও আইনি জটিলতা
ব্যারিস্টার শন সামারফিল্ড জানান, ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে এখন যুক্তরাজ্যের ডিরেক্টর অব পাবলিক প্রসিকিউশনসকে (ডিপিপি) সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, 'মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা প্ল্যাকার্ড বহনের জন্য আর কাউকে গ্রেপ্তার করবে না। তবে সরকার আপিল করলে এবং সেই আপিল সফল হলে আবারও গ্রেপ্তার হতে পারে।'
সরকার আপিল করার ইঙ্গিত দেওয়ায় প্ল্যাকার্ড হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য এখনো ঝুলে আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে যারা সরাসরি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অস্ত্র কারখানায় প্রবেশ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে 'অপরাধমূলক ক্ষতিসাধন'-এর অভিযোগে বিচার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল প্যালেস্টাইন অ্যাকশন?
২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠিত প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিজেদের এমন একটি আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করে, যা 'ইসরায়েলের গণহত্যামূলক ও বর্ণবাদী শাসনে বৈশ্বিক অংশগ্রহণ বন্ধ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ'। গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটে গোষ্ঠীটিকে 'টেররিজম অ্যাক্ট ২০০০'-এর আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীরা যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বিমানঘাঁটি আরএএফ ব্রাইজ নর্টনে প্রবেশ করে সামরিক বিমানে লাল রং স্প্রে করে দেয়। তাদের দাবি ছিল, এই বিমানগুলো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্ট্যামার ওই ঘটনাকে 'লজ্জাজনক' বলে নিন্দা জানিয়েছিলেন।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে এই গোষ্ঠীর কর্মীরা ব্রিস্টলে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানি এলবিটের সদর দপ্তরে ভ্যান নিয়ে হামলা চালায় এবং ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। একই সময়ে তারা লন্ডনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে লাল রং স্প্রে করে এবং হাউজ অব কমন্সের ভেতরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের মূর্তিতে টমেটো কেচাপ লেপন করে। বেলফোর ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য 'জাতীয় আবাস' স্থাপনে সমর্থন জানিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
নিষেধাজ্ঞার পর প্যালেস্টাইন অ্যাকশন জানিয়েছিল, যুদ্ধবিমানে লাল রং দেওয়া আসল অপরাধ নয়, বরং আসল অপরাধ হলো যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যা।
রায়ের প্রতিক্রিয়া
আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি বলেন, 'এটি ব্রিটেনে আমাদের মৌলিক স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির সংগ্রামের জন্য একটি বিশাল বিজয়। এই রায় এমন একটি সিদ্ধান্তকে বাতিল করল, যা সাম্প্রতিক ব্রিটিশ ইতিহাসে বাকস্বাধীনতার ওপর অন্যতম চরম আঘাত হিসেবে চিরকাল মনে রাখা হবে।'
আদালতের বাইরে উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত মেডিসিন অধ্যাপক জন মোক্সাম বলেন, 'আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমার স্ত্রী শুধুমাত্র বসে থেকে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করার কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। প্রথমে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটিই ছিল প্রহসন।' তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিচারমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
কেজ ইন্টারন্যাশনালের পাবলিক অ্যাডভোকেসি প্রধান আনাস মুস্তাফা বলেন, 'আজকের সিদ্ধান্তটি সঠিক আইনি ফলাফল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই রায় এখন কারাগারে থাকা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মী এবং হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ প্রত্যাহারের পথ সুগম করবে।'
ব্রিটিশ গ্রিন পার্টির এমপি অ্যাড্রিয়ান রামসে এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, 'সরকারকে অবিলম্বে বৈধ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে এবং গাজায় চলমান গণহত্যায় তাদের অংশীদারিত্বের বিষয়টি পুরোপুরি সুরাহা করতে হবে।'
সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, তারা আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এক বিবৃতিতে বলেন, 'আমি আদালতের সিদ্ধান্তে হতাশ। এই সন্ত্রাসী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল—এমন ধারণার সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করি। আমি আপিল আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়ব।'
আইনজীবী শন সামারফিল্ড জানান, সরকার আপিল করার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে। আপিল করার জন্য সরকারের হাতে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সময় আছে। সরকার আপিল করলে সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে, যা দীর্ঘ সময় নিতে পারে।
এদিকে, মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সরকারকে আপিল না করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা এক্সে লিখেছে, 'হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: সরকার প্রতিবাদ দমানোর জন্য নির্বিচারে সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না। আমরা সরকারকে এই রায় মেনে নেওয়ার এবং আপিল না করার আহ্বান জানাচ্ছি।'
