আ.লীগকে সরাতে ১৬ বছর লেগেছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না: এটিএম আজহার
আওয়ামী লীগকে সরাতে ১৬ বছর লেগেছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, 'আপনাদের পাশে এমন কেউ নেই, আপনারা ভালোই করেই জানেন। জনগণ আন্দোলন করে ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারকে সরিয়েছে, আপনাদের সরাতে ১৬ দিনও লাগবে না।'
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে আইনজীবী ঐক্য পরিষদের সবুজ প্যানেলের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, 'সরকার দুই মাসের মধ্যে জনগণকে রাজপথে আসতে বাধ্য করছে। যে ইস্যু সংসদে সমাধান হওয়া উচিত, সেটিকে রাজপথে আনা উচিত নয়। ফলাফলে কারচুপি করে আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন এটা আপনারাও জানেন, জনগণও জানে। গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করবেন না।'
তিনি বলেন, 'মানুষ বিচারকের কাছে গিয়ে বিচার পায়, সম্মান পায়; কিন্তু আমি সেখানে অসম্মানিত হয়েছি, অবিচারের শিকার হয়েছি। আমরা সংসদে লড়াই করব এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেও আন্দোলন গড়ে তুলব। এ ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।'
অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী ২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, 'আমরা জুলাই শহীদের মাকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করিয়ে জুলাইকে সংসদে নিয়ে যাচ্ছি, আর একটি দল ফ্যাসিস্টদের প্রতিনিধিত্ব করেছে এমন ব্যক্তিকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করাচ্ছে।'
গণভোট ইস্যুতে তিনি বলেন, 'তারা [বিএনপি] ৭০% জনগণের রায় গণভোটকে বাতিল করে টানেল ও বাঙ্কার নির্মাণ করে প্রমাণ করছে জনগণের আস্থার জায়গায় তারা যেতে পারবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'দুই মাসে লক্ষ্য করেছি, সরকার পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দলীয়করণ করছে এবং নব্য ফ্যাসিবাদকে স্থানান্তর করছে।'
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, 'জুলাইয়ের পরে এই বাংলাদেশ অতীতে কখনো কল্পনা করা যায়নি। যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই হয়েছিল, সেটি নিছক ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনের জন্য ছিল না; বাংলাদেশকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্যই জুলাই হয়েছিল।'
তিনি বলেন, 'আমরা এমন একটি বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে বিচারকরা এক্সিকিউটিভের কাছে মাথা নত করবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা পরিবর্তিত বিচার ব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও আদেশ দিতে দ্বিধাবোধ করবেন না। এমন বিচারালয় না হলে আমাদের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার স্বপ্ন ব্যর্থ হবে।'
তাজুল ইসলাম বলেন, 'আমরা ইঙ্গিতনির্ভর সুপ্রিম কোর্ট দেখতে চাই না। আমরা এমন বিচারাঙ্গন চাই, যেখানে সবচেয়ে তুচ্ছ মানুষটিও বিচার পাবে এবং সবচেয়ে ছোট বিচারকও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আদেশ দিতে পারেন।'
তিনি বলেন, 'আপনারা ন্যায়ের পথে থাকুন, বিবেককে কাজে লাগান, কেউ আপনাদের পরাজিত করতে পারবে না। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি এবং সেই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করব।'
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, 'বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না হলে এবং আইনজীবীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য না হলে সমাজের মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না।'
তিনি বলেন, 'আমরা রিট করেছি; আজ তিনটি আপিল ফাইল হয়েছে। আমরা এই সচিবালয়ের স্থিতাবস্থা চেয়েছি। আমরা বিজয়ী না হলে আগামী পাঁচ বছরে ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'এক্সিকিউটিভের লোক এসে যদি বিচারকে বদলে দেন, আইন মন্ত্রণালয়ের করায়ত্ত থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত না করা যায়, তবে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা যাবে না। এই দেশে যদি জবাবদিহি তৈরি করতে হয়, তাহলে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে; তবেই বাংলাদেশ একটি নতুন সূচনা দেখতে পারবে।'
শিশির মনির বলেন, 'জুডিশিয়ারিকে রক্ষা করতে না পারলে টু-থার্ড মেজরিটির জোরে সংবিধানকে তছনছ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।'
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, 'জনগণ জিম্মিদশা ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্তি চায়। তারা চায় তাদের ভোটটা রক্ষা হোক।'
তিনি বলেন, 'জাতীয় নির্বাচনে অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা বা যেকোনো কারণে আমরা ভোট রক্ষা করতে পারিনি। উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কারচুপি হলে ভোট হবে না, কিন্তু ভোটকেন্দ্র ছাড়া যাবে না। আমরা প্রয়োজনে আপনাদের পাশে এসে দাঁড়াব, আপনাদের সাহস দেব, কিন্তু ভোট বর্জন করা যাবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'বিচারাঙ্গনও বিএনপির দখল থেকে মুক্ত হচ্ছে না। আপনারা নির্বাচনে একটি ভোটও চুরি করতে দেবেন না। আমরা যারা ইনসাফের পক্ষে, আমাদের লড়াইয়ে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। সামান্য বিভাজনও বিজয় থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। এই নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে আগামী সব জেলা নির্বাচনে ইনসাফের পক্ষের প্রত্যেক প্রার্থী বিজয়ী হবে।'
ল'ইয়ার্স ফোরামের সভাপতি মতিউর রহমান আকন বলেন, 'ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির পর এই প্রথম ঢাকা বারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভূতপূর্ব খেলা হয়েছে। সরকার গঠনের পর তারা অগণতান্ত্রিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ঢাকা বারের নির্বাচন কমিশন যেভাবে গঠন হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।'
এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা বার ইউনিটের সভাপতি ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আবু বাক্কার সিদ্দিক।
ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে [২০২৬-২০২৭] বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামী সমর্থীত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ সবুজ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রার্থী মো. শহিদুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মো. লুৎফর রহমান (আজাদ), সাধারণ সম্পাদক মো. আবু বকর সিদ্দিকী, সিনিয়র এজিএস মো. শাহীন আক্তার ভূঁইয়া, এজিএস মো. মেহেদী হাসানসহ প্রমুখ নেতারা।
উল্লেখ্য, ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনের আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ হবে।
গত ২৯ মার্চ নির্বাচনের এই তফসিল ঘোষণা করা হয়। এবার ঢাকা বারে ৩০ হাজার আইনজীবী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি, সম্পাদকসহ ২৩টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশন মনোনীত হয়েছেন সমিতির সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন।
