পছন্দ না হলেই ‘গদিচ্যুত’; বিশ্বজুড়ে সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন হস্তক্ষেপের যত ইতিহাস
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিশ্বের নানা প্রান্তে অভ্যুত্থানে কলকাঠি নেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব বিশ্বনেতার নীতি ওয়াশিংটনের পছন্দ নয়, তাদের গদি থেকে সরাতে বিরোধী পক্ষ আর বিদ্রোহী সেনাদের মদদ দিয়েছে তারা।
কিন্তু সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্রের এত আগ্রহ কেন? কারণ, ওই সব নেতা হয়তো ভূমি সংস্কার, শ্রমিক ইউনিয়ন শক্তিশালী করা কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়নের মতো জনবান্ধব উদ্যোগ নিতেন। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করতেন। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব নেতা আসলে 'কমিউনিস্ট' বা 'সমাজতান্ত্রিক'। আর তাদের এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ও করপোরেট বা ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য হুমকি।
আগেকার দিনে যুক্তরাষ্ট্র এসব কাজ করত খুব গোপনে। কারণ, জাতিসংঘ ও অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের (ওএএস) সনদে সই করেছিল তারা। ওই সনদে জোর করে কোনো দেশের সরকার পরিবর্তনকে অবৈধ বলা হয়েছে। তাই তখন ওয়াশিংটন যা করত, তা লোকচক্ষুর আড়ালেই করত।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে সেই রাখঢাক আর থাকল না। মার্কিন রাজনীতিকরা গোপনীয়তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। যা সত্য, তা সোজাসাপটাই বলতে শুরু করলেন। উদাহরণ হিসেবে ডানপন্থী চিন্তাবিদ উইলিয়াম ক্রিস্টল ও রবার্ট কাগানের কথাই ধরা যাক। 'প্রজেক্ট ফর আ নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি'র এই দুই কারিগর ১৯৯৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে ইরাক নিয়ে খোলাখুলি লিখলেন। তাদের সাফ কথা ছিল—'আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করতেই' সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাত করা উচিত।
এরপর থেকে আর কোনো রাখঢাক নেই। জর্জ বুশ প্রশাসনের জমানায় ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, পল উলফোভিৎজদের মতো কট্টরপন্থীরা যখন দলভারী করলেন, তখন গোপনীয়তার খোলস পুরোপুরি খসে পড়ল। তাদের সোজা কথা, ওয়াশিংটনের বাতলে দেওয়া পথে না চললে সেই দেশের সরকারে হস্তক্ষেপ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের 'হুমকি'র তালিকায় সবশেষ সংযোজন ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের ভাণ্ডার রয়েছে এই দেশটিতে, যা কি না যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ এবং তার উত্তরসূরি নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারি না করে স্বাধীন পথে হাঁটা শুরু করেন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তারা চীন, ভারত, কিউবা, তুরস্ক, এমনকি ইতালি ও স্পেনেও তেল পাঠাচ্ছিলেন।
কিন্তু ওয়াশিংটন এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না।
এরপরই আসরে নামে ট্রাম্প, হেগসেথ ও রুবিও—এই 'যুদ্ধবাজ ত্রয়ী'। ভেনেজুয়েলার উপকূলে পাঠানো হয় যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র আর ১৫ হাজার সেনা। ১১ ডিসেম্বর ভেনেজুয়েলার একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে দেশটির ২৩টি ছোট নৌকা ধ্বংস করা হয়, যাতে প্রাণ হারান ৮৭ জন আরোহীর সবাই।
ওই তিনজনের দাবি, নৌকাগুলো দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল নামের মাদক পাচার করা হচ্ছিল। যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি। ট্রাম্পের দাবি, ধ্বংস করা প্রতিটি নৌকায় যে পরিমাণ মাদক ছিল, তা দিয়ে ২৫ হাজার আমেরিকানকে মেরে ফেলা সম্ভব।
তবে ২০ ডিসেম্বর দ্বিতীয় তেলবাহী ট্যাংকারটি জব্দের সময় আর মাদকের গল্প ফাঁদেনি যুক্তরাষ্ট্র। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান ক্রিস্টি নোয়েম দম্ভ করে বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেল বেচতে যাওয়ায় 'বজ্রগতিতে হানা' দিয়ে ভেনেজুয়েলাকে থামানো হয়েছে। তার হুঁশিয়ারি, 'তোমরা যেখানেই থাকো, আমরা তোমাদের খুঁজে বের করব এবং থামিয়ে দেব।'
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ বা ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা সরাসরি সেনা নামিয়ে নতুন কোনো যুদ্ধ চান না। তাই ভেনেজুয়েলায় হয়তো পুরোদমে সামরিক আগ্রাসন চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে কোনো দেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য তাদের সব সময় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দরকার হয় না। অতীতেও আগ্রাসন ছাড়াই বহু দেশের সরকার ফেলে দিয়েছে তারা।
দেশ বা মানচিত্র বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরোনো খেলায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সিআইএ গোপনে কলকাঠি নেড়ে সরকার উৎখাত করত। বিরোধীদের অর্থ জোগান দেওয়া কিংবা বিদ্রোহী বাহিনী গড়ে তোলা ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। যেমন আশির দশকের শুরুর দিকে নিকারাগুয়ায় 'কন্ট্রা' বিদ্রোহীদের সহায়তা করেছিল তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপের তালিকা বেশ লম্বা। কোনো কোনো দেশে তারা সরাসরি নির্বাচনে নাক গলিয়েছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডভ লেভিনের তথ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্তত ৮১টি দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তার মতে, ১৯ শতকের শেষ দিক থেকে হিসাব করলে এই তালিকা দ্বিগুণ লম্বা হবে। এই তালিকায় রাশিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়।
নির্বাচনে হস্তক্ষেপের একটি বড় উদাহরণ ১৯৪৮ সালের ইতালি। ওই নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকায় তাদের জয়ের প্রবল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সিআইএ তাদের হারানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। কমিউনিস্ট প্রার্থীরা জিতলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে—এমন প্রচারের পাশাপাশি লাখ লাখ ভুয়া চিঠি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সিআইএর সেই কৌশলই সফল হয়েছিল।
নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার চেয়েও সিআইএর অন্য রূপটি ছিল বেশি ভয়ংকর। গত সাত দশকে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত—অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকেই ক্ষমতাচ্যুত বা হত্যায় সহায়তা করেছে তারা। এই তালিকায় পানামা (১৯৪১ ও ১৯৮৯), ইরান (১৯৫৩), গুয়াতেমালা (১৯৫৪), কঙ্গো (১৯৬০), ব্রাজিল (১৯৬৪), ইন্দোনেশিয়া (১৯৬৫–৬৭), চিলি (১৯৭৩) থেকে শুরু করে লিবিয়া (২০১১) ও ইউক্রেনের (২০১৪) মতো দেশ রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণই ধরা যাক। সেখানে প্রেসিডেন্ট সুকর্ণকে সরিয়ে জেনারেল সুহার্তোকে ক্ষমতায় বসাতে কলকাঠি নেড়েছিল সিআইএ। বিরোধী দলকে টাকা দেওয়া, কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারণা চালানো, এমনকি অস্থিরতা তৈরিতে মনস্তাত্ত্বিক খেলাও খেলেছে তারা। সুকর্ণকে হেয় করতে তার মুখোশ পরিয়ে এক ব্যক্তিকে দিয়ে একটি অশ্লীল সিনেমাও বানিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দারা। সুহার্তো ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে সাড়ে সাত লাখ থেকে দশ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।
ব্রাজিলেও জেনারেলদের অভ্যুত্থানে মদদ দিয়েছিল সিআইএ। প্রেসিডেন্ট জোয়াও গৌলার্টকে 'বামপন্থী হুমকি' মনে করত যুক্তরাষ্ট্র। তাকে সরানোর ফলে ব্রাজিলে ২৪ বছরের জন্য সামরিক শাসন চেপে বসে। ওই সময়ে অন্তত এক হাজার রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ও অ্যাকটিভিস্টকে হত্যা বা গুম করা হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপের পথ আরও প্রশস্ত করে ওয়াশিংটন।
চিলির ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক। ১৯৭৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে হটাতে পিনোশের অভ্যুত্থানে সমর্থন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। ওই হামলার সময় আলেন্দে আত্মহত্যা করেন।
কেন এই হস্তক্ষেপ? কারণটা কিসিঞ্জারের কথাতেই পরিষ্কার। তিনি নিক্সনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, 'চিলিতে যদি মার্ক্সবাদী সরকার সফল হয়ে যায়, তবে তা বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। তাতে আমাদের আধিপত্যে টান পড়তে পারে।'
আর্জেন্টিনাতেও একই চিত্র। ১৯৭৬ সালে 'বামপন্থী হুমকি' দমনের নামে সেখানে সামরিক অভ্যুত্থানে মদদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জান্তা সরকারকেও গোয়েন্দা তথ্য ও সব ধরনের রসদ জোগান দেয় সিআইএ। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সফল হয়, কিন্তু ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
ওই সময় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ 'গুম' হয়ে যান। জান্তা সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের অপহরণ করে নির্যাতনের পর হত্যা করত। কাউকে কাউকে তো জীবন্ত অবস্থাতেই বিমান থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হতো। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষা ও স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে ওয়াশিংটন তখন এসব দেখেও না দেখার ভান করেছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব ছক যে কাজে লেগেছে, তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তেও গেছে। কিউবার ফিদেল কাস্ট্রোর কথাই ধরা যাক। কয়েক দশক ধরে তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে সিআইএ।
'অপারেশন মঙ্গুজ'-এর আওতায় কাস্ট্রোকে মারার জন্য বিস্ফোরক চুরুট, বিষমাখা খাবার, কলম, এমনকি বিষাক্ত স্কুবা ডাইভিংয়ের পোশাকও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কপাল ভালো কাস্ট্রোর, কোনো ফন্দিই কাজে আসেনি। ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুই হয় তার।
এরও অনেক আগে, ১৯১৮ সালে রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় বলশেভিকদের বিজয় ঠেকাতে সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জাপান। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সেখানে সোভিয়েত শাসন টিকে ছিল।
১৯৩৫ সালে অবসরের পর মার্কিন মেরিন কোরের জেনারেল স্মেডলি বাটলার বিখ্যাত এক উক্তি করেছিলেন। নিজের কাজের ধরণ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমি আমার সময়ের বেশির ভাগই ব্যয় করেছি বড় ব্যবসায়ী আর ব্যাংকারদের লাঠিয়াল হিসেবে। আমি ছিলাম পুঁজিবাদের গ্যাংস্টার।'
আমেরিকান মিলিটারি ইউনিভার্সিটির 'ইনটেলিজেন্স স্টাডিজ' বিভাগের সহকারী চেয়ারম্যান ড. ডেভিড কার্ক ২০২৫ সালের এপ্রিলে অকপটে স্বীকার করেন, শত্রুর কাছে নিজেদের পরিকল্পনা লুকাতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো 'অস্বীকার ও প্রতারণা'র আশ্রয় নেয়। যদিও গত কয়েক দশকে গোপনীয়তার কৌশলে কিছুটা বদল এসেছে।
তবে পুরোনো অভ্যাস কি আর সহজে যায়? ২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েল ও ইউক্রেনে পাঠানো অস্ত্র নিয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র লে. কর্নেল ব্রায়ান ম্যাকগারির কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, 'আমরা বিস্তারিত কিছু বলি না।'
বিখ্যাত মার্কিন লেখক কার্ট ভনেগাট যেমনটা বলতেন—'অ্যান্ড সো ইট গোজ।'
