ট্রাম্পের দাবি ভেনেজুয়েলা আমেরিকার তেল চুরি করেছে! কিন্তু আসল ঘটনা কী?
ভোর ৭টা। হঠাৎ করে কেঁপে উঠল মাটি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড শব্দে মাটি ফুঁড়ে বের হলো তেলের ফোয়ারা। লা রোসা গ্রামের আতঙ্কিত মানুষ দেখল, ২০০ ফুট উঁচুতে উঠে যাচ্ছে সেই তেলের স্রোত।
পৃথিবীর সবচেয়ে উৎপাদনশীল তেলের খনি আবিষ্কৃত হলো এভাবেই। সেই সঙ্গে শুরু হলো ভেনেজুয়েলার তেল-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরের গল্প।
১৫ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা দেখেছিলেন, ভেনেজুয়েলার আদিবাসীরা আগুন জ্বালানো এবং নৌকা মেরামতের কাজে এক ধরনের তেল ব্যবহার করত। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে বিদেশি তেল কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলের তেলের মজুদ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি। যুদ্ধের সময় জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং পশ্চিমা দেশগুলো তেলের ঘাটতির শঙ্কায় নড়েচড়ে বসে।
রয়্যাল ডাচ শেলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান 'ভেনেজুয়েলান অয়েল কনসেশনস' (ভিওসি) ১৯১০-এর দশকে এই অঞ্চলে জরিপ চালায়। কিন্তু খুব একটা সফলতা আসেনি। ১৯২২ সালের ৩১ জুলাই তারা এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়। চার বছর আগে 'লস বারোসোস-২' নামে যে কূপটি তারা খনন করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল, সেটি আবারও খোঁড়ার সিদ্ধান্ত হয়।
মাস কয়েক ধরে খনন চলে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১ হাজার ৪৫০ ফুট গভীরে যাওয়ার পর তেলের বালু পাওয়া যায়। তারপর ১৪ ডিসেম্বর সেই ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। টানা এক সপ্তাহ ধরে মাটি ফুঁড়ে বের হতে থাকে তেল।
এটি ছিল এক বড় পরিবেশগত বিপর্যয়। কিন্তু এই ঘটনাই ভেনেজুয়েলাকে অবিশ্বাস্য সম্পদ, বড় ধরনের পতন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার এক শতাব্দী প্রাচীন পথে ঠেলে দেয়। সেই পথের শেষেই গত শনিবার মার্কিন বাহিনীর হাতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হন। এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর তাদের আধিপত্য ফিরে পেতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির তেল খাতকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সেখানে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
রবিবার রাতে ট্রাম্প বলেন, 'তেল কোম্পানিগুলো সেখানে গিয়ে তাদের সিস্টেম পুনর্নির্মাণ করবে। এটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরি। আমাদের সম্পত্তি এভাবে কেউ কখনো চুরি করেনি। তারা আমাদের তেল নিয়ে গেছে। আমাদের অবকাঠামো দখল করেছে এবং এখন সব পচে নষ্ট হয়ে গেছে।'
তবে কাজটি সহজ হবে না। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর হেলিমা ক্রফট বলেন, 'শ্যাভেজ ও মাদুরো সরকারের আমলে দশকের পর দশক ধরে দেশটির যা ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।'
ক্রফট আরও জানান, ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে প্রায় সরকারের মতো ভূমিকা পালন করতে হবে। তেল নির্বাহীদের মতে, এর জন্য বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর হিসাবেও দেখা যায়, গত ৫০ বছরে তাদের পাইপলাইনগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। আগের মতো উৎপাদনে ফিরতে অবকাঠামো ঠিক করতে ৫৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, পিডিভিএসএ কয়েক দশক ধরে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো রক্ষা করতে মার্কিন সেনাবাহিনীকে দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতে হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে কোম্পানিগুলো দেশটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কিত এবং বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহী নয়।
কৌশলগত গুরুত্ব
১৯২৯ সালের মধ্যে ভেনেজুয়েলা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে তেলভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। ১০০টিরও বেশি বিদেশি তেল কোম্পানি সেখানে ব্যবসা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের পর ভেনেজুয়েলা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়।
তৎকালীন একনায়ক জেনারেল হুয়ান ভিসেন্তে গোমেজ বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু দেশের মানুষ এর সুফল পায়নি। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল, শেল ও গালফের মতো বড় কোম্পানিগুলো দেশটির অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত।
১৯৩৫ সালে গোমেজের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিরা সংস্কারের উদ্যোগ নেন। ১৯৪৩ সালে হাইড্রোকার্বন আইন পাস হয়, যার ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে তাদের লভ্যাংশের অর্ধেক সরকারকে দিতে বাধ্য করা হয়।
কোম্পানিগুলো তা মেনে নেয়, কারণ ভেনেজুয়েলার তেলের মান ছিল অনন্য। তাদের ভারী ও সস্তা অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পের জন্য ডিজেল, হিটিং অয়েল ও অ্যাসফল্ট তৈরিতে খুবই উপযোগী ছিল।
গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
১৯৫৩ সালে ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে যুক্তরাষ্ট্র একে শুভলক্ষণ হিসেবে দেখে। ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রোমুলো বেটানকোর্টকে দক্ষিণ আমেরিকায় 'আমেরিকার সেরা বন্ধু' হিসেবে অভিহিত করেন।
কিন্তু ১৯৬০ সালে ভেনেজুয়েলা ওপেক-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলে সমীকরণ বদলে যায়। দেশটি রাষ্ট্রীয় তেল করপোরেশন গঠন করে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের ৬৫ শতাংশ দাবি করে। তবুও ভেনেজুয়েলা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী।
১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজ তেল শিল্প জাতীয়করণের জন্য পিডিভিএসএ প্রতিষ্ঠা করেন। বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ৬০ শতাংশ মালিকানা নিজেদের হাতে রাখে পিডিভিএসএ।
১৯৮০-এর দশকে তেলের দাম কমে গেলে ভেনেজুয়েলা সংকটে পড়ে। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিটগো রিফাইনারি কেনার ফলে ঋণের বোঝা বাড়ে। প্রেসিডেন্ট পেরেজের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত হুগো শ্যাভেজের উত্থানের পথ তৈরি করে।
শ্যাভেজ, মাদুরো এবং পতন
১৯৯৯ সালে ক্ষমতায় এসে শ্যাভেজ ভেনেজুয়েলাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তিনি এক্সন মবিল ও কনোকো ফিলিপসসহ বিদেশি কোম্পানিগুলোর সম্পদ জাতীয়করণ করেন। পিডিভিএসএ-এর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন এবং এর আয়কে সেনাবাহিনীর এটিএম মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দক্ষ কর্মীরা দেশ ছাড়তে শুরু করে এবং অবকাঠামো ধসে পড়ে।
২০১৩ সালে শ্যাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। এক বছর পর তেলের দাম কমে গেলে অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। শুরু হয় মুদ্রাস্ফীতি ও গণদেশান্তর।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। ২০০৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পিডিভিএসএ থেকে তেল আমদামি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বাইডেন কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিলেও ট্রাম্প তা আবার বাতিল করেন।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলা দিনে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্ব উৎপাদনের মাত্র ০.৮ শতাংশ। মাদুরো ক্ষমতায় আসার আগে যা ছিল এর দ্বিগুণেরও বেশি।
