ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে মার্কিনীদের ব্যয় ইতোমধ্যে ১১ বিলিয়ন ডলার, এটি কেবল শুরু
সাধারণভাবে বলতে গেলে, আপনি যখন অন্য কোনো দেশে বোমা ফেলেন এবং সেই দেশ পাল্টা আঘাত করে, তখন তাকে 'যুদ্ধ' বলা হয়। খুব সাধারণ একটি শব্দ। মাত্র তিনটি অক্ষর। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানেন এটি কীভাবে বানান করতে হয়।
কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে 'যুদ্ধ' বলার ক্ষেত্রে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে, যা এখন লেবাননে ইসরায়েলি স্থল অভিযানেও প্রসারিত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের কুশলীরা মনে হয় বুঝে উঠতে পারছেন না যে তারা আসলে কী করছেন। হাউসের স্পিকার মাইক জনসন গত ৫ মার্চ ঘোষণা করেছেন, "আমরা যুদ্ধে নেই" এবং যুক্তরাষ্ট্রের "যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই"। ইতিমধ্যে সিনেটর সিনথিয়া লুমিসের মতো কিছু আইনপ্রণেতা যুক্তি দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে ইরানের সাথে 'চিরস্থায়ী যুদ্ধে' লিপ্ত রয়েছে।
তবে আপনি একে যে নামেই ডাকুন—একটি যুদ্ধ, একটি সীমিত অভিযান অথবা সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্যের একটি রক্তপিপাসু কাজ—'অপারেশন এপিক ফিউরি'-র খরচ অত্যন্ত আকাশচুম্বী। ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের বেসামরিক নাগরিকরা তাদের জীবন দিয়ে এর মূল্য দিচ্ছে: রিপোর্ট অনুযায়ী ইরানে ২০০-এর বেশি শিশুসহ ১,৩০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে লেবাননে ১০০-এর বেশি শিশুসহ ৮০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৮১৫,০০০-এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
তেহরানের মতো ওয়াশিংটন ডিসিতে হয়ত ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি হচ্ছে না, কিন্তু সাধারণ আমেরিকানরাও এর জন্য চড়া মূল্য দিচ্ছে। কেউ জানে না এই যুদ্ধ কীভাবে বা কখন শেষ হবে, তবে আমি আপনাকে নিশ্চিতভাবে একটি কথা বলতে পারি: এর কারণে আমেরিকানরা নিজেদের আরও দরিদ্র হিসেবে আবিষ্কার করবে।
প্রথমত, অর্থনীতির ওপর অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রভাব বাদ দিয়ে কেবল যুদ্ধের প্রত্যক্ষ খরচটি দেখা যাক। স্কুলগামী শিশুদের হত্যা করতে এবং একটি মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাতে ঠিক কত টাকা করদাতার অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। গত সপ্তাহে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ মাত্র প্রথম ছয় দিনেই ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সেই ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে স্থাপনা মেরামত বা ক্ষয়ক্ষতির প্রতিস্থাপনের কোনো হিসাব ধরা হয়নি। এমনকি প্রথম হামলার আগে ওই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের খরচও এতে অন্তর্ভুক্ত নেই। এদিকে অন্যান্য সূত্র দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে যে, প্রকৃত খরচ সম্ভবত আরও অনেক বেশি।
গত রোববার হোয়াইট হাউসের জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট যুদ্ধের খরচের একটি হালনাগাদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি সিবিএস-কে জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সাথে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আবারও বলছি, এটি সম্ভবত একটি অবমূল্যায়িত হিসাব।
এক সেকেন্ডের জন্য কল্পনা করুন যদি আমরা এমন একটি দেশে বাস করতাম যেখানে সরকার আসলে তার নাগরিকদের যত্ন নেয়। সেই ১২ বিলিয়ন ডলার—যা মাত্র দুই সপ্তাহের একটু বেশি সময়ের যুদ্ধের খরচ—তা কত মানুষের জীবন বদলে দিতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, আমি ফিলাডেলফিয়ায় থাকি, যেখানে বর্তমানে তহবিলের অভাবে স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলো ৩০০ মিলিয়ন ডলারের কাঠামোগত ঘাটতির মুখে রয়েছে এবং এর কারণে বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছে। সেই ঘাটতি মেটানো যেত যুদ্ধের মাত্র আধাদিনের খরচ দিয়ে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, আমেরিকার স্কুলগুলো ঠিক করার চেয়ে ইরানের স্কুলপড়ুয়াদের ওপর বোমা ফেলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, ফুটেজে দেখা গেছে যে টমাহক ক্রুজ মিসাইলটি ইরানের স্কুলে আঘাত করেছে, তার এক একটির দাম প্রায় ২.৫ মিলিয়ন ডলার। শিশু হত্যা মোটেও সস্তা নয়!
ফিলাডেলফিয়া একমাত্র অর্থসংকটে থাকা স্কুল ডিস্ট্রিক্ট নয়: সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯০% শিক্ষক গড়ে বছরে তাদের নিজস্ব পকেটের ৫০০ থেকে ৯০০ ডলার ক্লাসরুমের সামগ্রীর পেছনে ব্যয় করেন। এই সামগ্রীগুলোর দাম গত এক বছরে অনেক বেড়েছে, যার আংশিক কারণ হলো ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক। সেই ১২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে আমেরিকার ৩.৭ থেকে ৩.৮ মিলিয়ন পাবলিক স্কুল শিক্ষকের ক্লাসরুমের পকেট খরচ চার বছরের বেশি সময় ধরে মেটানো সম্ভব ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশে শিক্ষকরা যদি বাচ্চাদের শেখানোর জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ না করতেন, তবে বিষয়টি কি চমৎকার হতো না?
ফেডারেল স্টুডেন্ট লোনের বা ছাত্রঋণের গড় ব্যালেন্স হলো ৩৯,৫৪৭ ডলার। ১২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ৩০০,০০০ মানুষের ঋণ পরিশোধ করা যেত। আর এর অর্থ হতো ৩০০,০০০ মানুষ যারা বর্তমানে ছাত্রঋণ পরিশোধে ব্যয় করা টাকা হঠাৎ করেই বাসা ভাড়া, খাবার এবং পরিবারের পেছনে ব্যয় করতে পারত। তারা সেই টাকা প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের পকেটে না দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে পারত।
সেই ১২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ১.৬২ মিলিয়ন শিক্ষার্থীর এক বছরের পূর্ণ 'পেল গ্রান্ট' অর্থায়ন করা যেত। এটি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ফেডারেল আর্থিক সহায়তা যা পরিশোধ করতে হয় না; যার সর্বোচ্চ পরিমাণ বছরে ৭,০০০ ডলারের একটু বেশি। অন্য একটি দেশ ধ্বংস করতে যে টাকা ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে ১.৬২ মিলিয়ন আমেরিকান তাদের জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারত।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৭০,০০০ গৃহহীন মানুষ রয়েছে। ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স টু এন্ড হোমলেসনেস-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আমেরিকার প্রতিটি গৃহহীন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারকে আবাসন সুবিধা দিতে বিদ্যমান তহবিলের সাথে অতিরিক্ত ৯.৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। যুদ্ধের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের খরচ দিয়ে আপনি গৃহহীনতা দূর করার ক্ষেত্রে একটি বিশাল পরিবর্তন আনতে পারতেন। আর এটি হতো একটি সার্থক বিনিয়োগ: গবেষণা বলছে যে মানুষকে আবাসন দিলে দীর্ঘমেয়াদে করদাতার অর্থ সাশ্রয় হয়।
১২ বিলিয়ন ডলার দিয়ে 'লো ইনকাম হোম এনার্জি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম', যা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে তাদের হিটিং বিল পরিশোধে সহায়তা করে—তা দুই থেকে তিন বছর চালানো যেত। এটি দিয়ে 'দ্য ইমারজেন্সি ফুড অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম', যা নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যের যোগান দেয়—তা কয়েক বছর চালানো যেত। এটি ব্রডব্যান্ড এবং স্কুলের দুপুরের খাবারের জন্য ভর্তুকি দিতে পারত এবং চিকিৎসার ঋণ কমাতে সাহায্য করতে পারত। এটি স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ করা যেত। এটি পুরো আমেরিকাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারত।
কিন্তু আমরা এখন এমন 'র্যাডিক্যাল সমাজতান্ত্রিক ধারণা' পোষণ করতে পারি না, পারি কি? অস্ত্র নির্মাতা এবং তাদের তোয়াজ করা রাজনীতিবিদদের জন্য বিষয়টি কতটা ধ্বংসাত্মক হবে একবার ভাবুন তো, যদি আমরা অর্থহীন যুদ্ধে ব্যয় কমিয়ে দিতাম?
পুনরায় বলছি, ব্যয়ের কথা বলতে গেলে ওই ১২ বিলিয়ন ডলারের ট্যাগটি কেবল শুরু মাত্র। কেউ জানে না এই যুদ্ধ কতদিন চলবে। আর অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব কেবল শুরু হচ্ছে: মুদি পণ্যের উচ্চমূল্য, বাড়তি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম—সবই আসছে। তবে চিন্তা করবেন না, আপনি যখন বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খাবেন, আমি নিশ্চিত যে ট্রাম্প পরিবার এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে আরও ধনী হওয়ার পথ খুঁজে পাবে।
জো বাইডেন একটি কথা বলতে পছন্দ করতেন, "আপনার মূল্যবোধ কী তা আমাকে বলবেন না। আমাকে আপনার বাজেট দেখান, আমি বলে দেব আপনার মূল্যবোধ কী।" ইরানে বোমা হামলার জন্য ক্রমাগত বর্ধিত বাজেট একটি বিষয় পরিষ্কার করে দেয়: মার্কিন সরকার তার নিজের নাগরিকদের বিন্দুমাত্র মূল্য দেয় না। যে টাকা স্কুল, অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবায় যাওয়া উচিত ছিল, তা মৃত্যু এবং ধ্বংসের পেছনে ব্যয় হতে দেখা প্রত্যেক মার্কিন করদাতার জন্য চরম ক্ষোভের কারণ হওয়া উচিত। সত্যিই এটি এক 'অপারেশন এপিক ফিউরি'।
