মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার মাঝেই কঠোর অবস্থান ইরানের, ট্রাম্পের জন্য একগুচ্ছ কঠিন শর্ত
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আজ (২৪ মার্চ) ২৫তম দিন। হামলার প্রথম দিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর জবাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করেছে ইরান। দেশটি ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরেও হামলা হচ্ছে। এতে সংঘাত ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার মাঝেই ইরানের কঠোর অবস্থান: ট্রাম্পের জন্য একগুচ্ছ কঠিন শর্ত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার গুঞ্জন শোনা গেলেও নিজেদের অবস্থানে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনড় ও কঠোর ইরান। তেহরানের উচ্চপদস্থ তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের আলোচনার ভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
বর্তমানে দেশটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় যেকোনো ফলপ্রসূ আলোচনায় বসতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় ইরান কেবল যুদ্ধ বন্ধের দাবিই তুলবে না, বরং এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেবে যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব বা 'রেড লাইন' হতে পারে।
ইরানের এই কঠিন শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভবিষ্যতে দেশটির বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার নিশ্চয়তা, যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ।
এছাড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির ওপর কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতেও সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইরান। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ও এই বিষয়টি তেহরানের জন্য একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত বা 'রেড লাইন' ছিল।
আলোচনা নিয়ে মিশ্র সংকেত
আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত তিন সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে 'অত্যন্ত জোরালো' আলোচনা চলছে। তবে ইরান জনসমক্ষে এই দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
তিনটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আলোচনার কোনো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের সাথে তেহরানের কেবল প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
অন্যদিকে, একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরাসরি কোনো আলোচনা না হলেও মিশর, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশগুলো দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানকারী হিসেবে কাজ করছে।
ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠক
একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা এবং অন্য একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ইসলামাবাদে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। যদি এই বৈঠক চূড়ান্ত হয়, তবে ইরানের পক্ষ থেকে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেবেন।
তবে সূত্রগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আলোচনার যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি মূলত আইআরজিসির হাতেই থাকবে।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান হলেন আইআরজিসির কমান্ডার বাকের জোলকাদর
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অভিজ্ঞ কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত আলী লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হলেন জোলকাদর।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয়ের যোগাযোগ ও তথ্য বিষয়ক উপ-প্রধান মেহেদি তাবাতাবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করবে না কাতার
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কোনো প্রচেষ্টাতেই দোহা জড়িত নয়- এমনটাই জানিয়েছেন কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজিদ আনসারি।
তিনি বলেছেন, "আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং মাতৃভূমিকে রক্ষা করা।"
বিগত বছরগুলোত, বিশেষ করে গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিল কাতার।
আরব দেশগুলোর ওপর হামলার পর কাতার ইরানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আনসারি বলেন, ''হ্যাঁ, আমরা ভূগোল বদলে ফেলতে পারি না।''
'চূড়ান্ত বিজয়' না আসা পর্যন্ত লড়াই চলবে: ইরান
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, 'চূড়ান্ত বিজয়' অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সশস্ত্র বাহিনী লড়াই অব্যাহত রাখবে।
ইরানের খাতাম-আল আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কর্মকর্তা আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, 'ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় গর্বিত এবং অবিচল। চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই যাত্রা থামবে না।'
জেনারেল আলিয়াবাদি তার বক্তব্যে 'চূড়ান্ত বিজয়' বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য কোনো আলোচনায় যাতে ইরান কোনো ধরনের নতি স্বীকার না করে বা বড় কোনো ছাড় না দেয়, সেই লক্ষ্যেই দেশটির সামরিক বাহিনী এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বিমান হামলা বন্ধ না হলে যুদ্ধবিরতির আলোচনা নয়: তেহরান
বিমান হামলা অব্যাহত থাকা অবস্থায় কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় বসবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাবের কথা বলা হলেও ইরান সেই খবর অস্বীকার করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাসের কারণে ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসা তেহরানের জন্য মোটেও সহজ হবে না। গত এক বছরে ইরান অন্তত দুইবার আলোচনায় অংশ নিয়েছিল, কিন্তু উভয়বারই আলোচনার মাঝপথে তাদের ওপর বিমান হামলা চালানো হয়। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখন আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার জন্য তেহরান একটি স্পষ্ট পূর্বশর্ত দিয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, যতক্ষণ পর্যন্ত বিমান হামলা চলবে, ততক্ষণ যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতা ও বৈঠক আয়োজনে প্রস্তুত পাকিস্তান: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করতে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত পাকিস্তান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আল জাজিরাকে বলেন, "সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো চাইলে ইসলামাবাদ সবসময়ই আলোচনার আয়োজন করতে ইচ্ছুক। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবেই সংলাপ এবং কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে।"
আন্দ্রাবির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের "খুব ভালো" আলোচনা চলছে।
যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি—পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্ক গত কয়েক দিন ধরে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। দেশগুলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে এমন আভাসও দেওয়া হয়েছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে উভয় দেশের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হতে পারে, যদিও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ইরানে 'উৎপাদন কেন্দ্র' লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা
ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন 'উৎপাদন কেন্দ্র' লক্ষ্য করে এক দফা ব্যাপক হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে ইরানের ঠিক কোন কোন এলাকায় বা কী ধরনের স্থাপনায় এই হামলা চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা স্থগিতের ঘোষণার পরদিনই ইরানের গ্যাস স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার হুমকি থেকে সরে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরানে দুটি গ্যাস স্থাপনা এবং একটি পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ জানিয়েছে, 'জায়নবাদী এবং আমেরিকান শত্রুদের' চলমান হামলার অংশ হিসেবে ইসফাহানের কাভে স্ট্রিটে অবস্থিত গ্যাস প্রশাসন ভবন এবং গ্যাস প্রেশার রেগুলেশন স্টেশনকে (গ্যাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্য ইরানের এই স্থাপনাগুলো 'আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত' হয়েছে।
এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত খোররামশাহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি গ্যাস পাইপলাইনেও হামলা চালানো হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে।
ইসরায়েলে মিসাইল হামলার 'ঢেউ'
ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে 'ফলপ্রসূ' আলোচনার দাবি করে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তার আলোচনার দাবি খারিজ করে দিয়ে ইসরায়েলে মিসাইল হামলার 'ঢেউ' চালিয়েছে ইরান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ হামলার খবর নিশ্চিত করেছে।
হামলার জেরে তেল আবিব-সহ ইসরায়েলের বিভিন্ন প্রান্তে বেজে ওঠে সতর্কতামূলক সাইরেন। মাঝ-আকাশে ইরানের মিসাইল ধ্বংসে সক্রি হয় ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তেল আবিব থেকে সেই সংঘর্ষের বিকট শব্দ শোনা যায়। ধ্বংস হওয়া মিসাইলের টুকরো ছিটকে পড়ে উত্তর ইসরায়েলের কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের এলিড ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, আমেরিকার বিভিন্ন ঘাঁটিতে তারা নতুন করে হামলা শুরু করেছে। ট্রাম্পের আলোচনার দাবিকে 'পুরনো মনস্তাত্ত্বিক কৌশল' বলে কটাক্ষ করেছে তারা।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরায়েলের দক্ষিণাংশেও নতুন করে আছড়ে পড়ছে ইরানের একের পর এক মিসাইল। দিমোনা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতেও সাইরেন বেজে উঠেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনা।
ইরানের নতুন এই হামলায় তেল আবিবের একাংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইসরায়েল থেকে সম্প্রচারিত সরাসরি ভিডিয়ো ফুটেজে সেই ধ্বংসলীলার ছবি ধরা পড়েছে।
এক জায়গায় দেখা গেছে, রাস্তায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ভিড় করে রয়েছেন পুলিশ ও জরুরি সেবা কর্মীরা। বেশ কয়েকটি গাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একটি গাড়ি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে, কয়েকটি দুমড়েমুচড়ে গেছে।
উত্তর ইসরায়েলে বেশ কিছুদিন ধরেই রকেট হামলা চালাচ্ছে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহ। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের মধ্যাংশেও আছড়ে পড়ছে একাধিক মিসাইল।
তবে ইরানের নতুন হামলার মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ ইসরায়েল। ওই এলাকায় মিসাইল আছড়ে পড়ার কথা স্বীকার করে নিলেও প্রথমে কোনো হতাহতের খবর নিশ্চিত করেনি ইসরায়েলের জরুরি পরিষেবা কার্যালয়। পরে ইসরায়েলি ব্রডকাস্টিং অথরিটি জানায়, দক্ষিণাংশে এই হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন।
ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ফের ১০০ ডলার পার
সোমবার বড়সড় পতনের পর ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পার করল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম।
মঙ্গলবার সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত তেলের এই বেঞ্চমার্ক সূচক ৩.৭৫ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম পৌঁছেছে ১০৩.৬৯ ডলারে। অন্যদিকে নাইমেক্স লাইট সুইট-এর দাম ৩.৪২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১.৫৫ ডলারে ঠেকেছে।
সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেন। সেইসঙ্গে দাবি করেন, শীঘ্রই দুদেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বার্তার পরেই সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ধাক্কায় ১০ শতাংশেরও বেশি পড়ে যায়।
কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার দাবি খারিজ করে দিয়েছে তেহরান। এরপরই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন লগ্নিকারীরা। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে তেলের দাম।
হরমুজ সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনার আহ্বান ভন ডার লিয়েনের
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে অতিদ্রুত আলোচনার টেবিলে বসতে হবে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিরস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
একটি নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করতে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া সফরে রয়েছেন ভন ডার লিয়েন। ক্যানবেরায় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা থামাতে এই যুদ্ধের অবসান জরুরি। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
তিনি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের এই শত্রুতা বন্ধে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধান খুঁজে বের করা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি আরও জানান, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী রক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি ইইউ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সদস্য দেশ একটি বিশেষ অভিযানে (মিশন) সহায়তা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ভন ডার লিয়েন বলেন, 'জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমাজের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তা আমরা সবাই অনুভব করছি।' বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে এই বাণিজ্যিক পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তেল আবিবের বিভিন্ন স্থানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত ৪
ইরানের সর্বশেষ দফার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তেল আবিবের বেশ কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র বা তার ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল। এতে একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত চারজন সামান্য আহত হয়েছেন।
এদিকে ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসা সেবা সংস্থা জানিয়েছে, পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা দেশের মধ্যাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে তাদের উদ্ধারকারী ও মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে।
ইসরায়েলজুড়ে ইরানের তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত একাধিক, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা নিশ্চিত করেছে।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, 'ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে'।
উত্তর ইসরায়েলের হাইফা অঞ্চলের নেশার এলাকায় গত রাতে অন্তত একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এর আগে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সতর্কবার্তা দিয়েছিল, ইরান থেকে দেশটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
দেশটির জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হামলার পর নিরাপদ আশ্রয়ে (শেল্টার) যাওয়ার পথে স্প্লিন্টারের আঘাতে এক নারী আহত হয়েছেন।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবরের পর বেশ কয়েকটি এলাকায় তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
শিগগিরই খুলবে হরমুজ প্রণালি, আমি আর আয়াতুল্লাহ মিলে নিয়ন্ত্রণ করব: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি 'খুব শিগগিরই খুলে দেয়া হবে।' একই সাথে এও বলেছেন, তিনি এবং ইরানের আয়াতুল্লাহ 'যৌথভাবে' হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করবেন।
সোমবার (২৩ মার্চ) সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সিএনএনের কেইটলান কলিন্স যখন তাকে প্রশ্ন করেন যে প্রণালিটি কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, তখন ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা যদি এই গতিতে এগোতে থাকে, তবে 'এটি খুব শিগগিরই খুলে যাবে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এটি যৌথভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। আমি এবং আয়াতুল্লাহ, তিনি যে-ই হোন না কেন, বা পরবর্তী আয়াতুল্লাহ যিনিই হোন না কেন।'
তেহরানে সরকারপন্থিদের বিশাল সমাবেশ
ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ২৫তম দিনে তেহরানের রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার সরকারপন্থি মানুষ। নতুন করে বোমাবর্ষণের হুমকি এবং ভারী বৃষ্টি উপেক্ষা করেই তারা এই সংঘাতের প্রতিবাদে রাজপথে নামেন।
মেহের নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ছবি ও তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের দীর্ঘতম সড়ক ভালিয়াসর-এ বিশাল জনসমাবেশ ঘটে। সেখানে পতাকা হাতে মানুষ লাউডস্পিকারে সরকার ও দেশের সমর্থনে বিভিন্ন দেশাত্মবোধক স্লোগান দেন।
মঙ্গলবার ভোরেও তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে শত শত মানুষকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। পুরো এলাকাটি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং তার পূর্বসূরিদের ছবিতে ছেয়ে ছিল।
তেহরান ছাড়াও দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে একই ধরণের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তেহরানের উপকণ্ঠ কারাজ, ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন ইলাম এবং কাস্পিয়ান সাগরের তীরের শহর সারি উল্লেখযোগ্য। মূলত দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শান্তির জন্য ইরান 'আরো একবার সুযোগ' পাচ্ছে: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে অপরাধ দমন সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সাথে একটি 'বৃহত্তর চুক্তিতে' পৌঁছানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করার কাজ করছে।
তিনি বলেন, 'আমার পুরো জীবনই কেটেছে দরকষাকষি বা আলোচনার মধ্য দিয়ে। ইরানের সঙ্গে আমরা অনেকদিন ধরে আলোচনা করছি। তবে এবার তারা আসলেও গুরুত্বের সাথে বিষয়টি নিয়েছে।' ট্রাম্প আরও যোগ করেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হয়েছে বলে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, শান্তির জন্য ইরান 'আরো একবার সুযোগ' পাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কার সঙ্গে আলোচনা করছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ট্রাম্প বলেন, 'আমরা আশা করি তারা এই সুযোগটি গ্রহণ করবে। যেভাবেই হোক, এর ফলে আমেরিকা এবং পুরো বিশ্ব অনেক বেশি নিরাপদ হবে।'
এর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরণের আলোচনার খবর অস্বীকার করেছিলেন এবং একে 'ভুয়া খবর' বলে অভিহিত করেছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার খবর 'ভুয়া': ইরানের স্পিকার
গত এক ঘণ্টা বা তার কিছু সময় ধরে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম সূত্রের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবফের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
তবে মোহাম্মদ-বাঘের গালিবফের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে এই দাবি অস্বীকার করে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমঝোতা হয়নি।
ওই পোস্টে আরও বলা হয়েছে, তেলের বাজারকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই 'ভুয়া খবর' (ফেক নিউজ) ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ইরানের জনগণ আক্রমণকারীদের জন্য 'কঠোর ও অনুশোচনা জাগানোর মতো শাস্তি' দাবি করছে।
