ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানকে মধ্যপ্রাচ্য ঢেলে সাজানোর এক 'ঐতিহাসিক সুযোগ' হিসেবে দেখছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন তিনি।
গত এক সপ্তাহ ধরে চলা একাধিক কথোপকথনে যুবরাজ মোহাম্মদ ট্রাম্পকে জানিয়েছেন যে, ইরানের কট্টরপন্থী সরকারের পতন নিশ্চিত করতেই হবে।
আলোচনায় অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যুবরাজ যুক্তি দিয়েছেন যে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি, যা কেবল তাদের সরকার পতনের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানকে দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে দেখেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হয়তো মনে করেন, অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য লাভজনক।
অন্যদিকে, সৌদি আরব মনে করে ইরানে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র তৈরি হলে তা তাদের জন্য সরাসরি ও মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তবে সৌদি ও মার্কিন উভয় সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাই উদ্বিগ্ন যে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইরান সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে আরও ভয়ংকর হামলা চালাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকা পড়তে পারে।
প্রকাশ্যে ট্রাম্প অবশ্য স্ববিরোধী কথা বলছেন। কখনো বলছেন যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে, আবার কখনো সংঘাত বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
সোমবার প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তার প্রশাসন এবং ইরান 'আমাদের শত্রুতা সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে অবসানের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা' করেছে। যদিও ইরান এমন কোনো আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে।
এই যুদ্ধের ফলে সৌদি আরবের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বিশাল প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলা এরই মধ্যে বিশ্ব তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তবে সৌদি কর্মকর্তারা যুবরাজের যুদ্ধ প্রলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এক বিবৃতিতে সৌদি সরকার জানিয়েছে, 'সংঘাত শুরুর আগে থেকেই সৌদি আরব এর শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে।'
তারা আরও জানায়, কর্মকর্তারা 'ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন এবং আমাদের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে।'
সরকার আরও জানায়, 'বর্তমানে আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো প্রতিদিনের হামলা থেকে আমাদের জনগণ ও বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষা করা। ইরান গুরুতর কূটনৈতিক সমাধানের বদলে বিপজ্জনক ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট সবারই ক্ষতি হচ্ছে, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে খোদ ইরানের।'
কথোপকথন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, ট্রাম্প মাঝে মাঝে যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও যুবরাজ মোহাম্মদ যুক্তি দিয়েছেন যে সেটি হবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত।
তেহরান সরকারকে দুর্বল করতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য তিনি চাপ দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, প্রশাসন 'প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কথোপকথন নিয়ে কোনো মন্তব্য করে না।'
যুবরাজ মোহাম্মদ একজন একনায়কতান্ত্রিক রাজপরিবারের সদস্য, যিনি ভিন্নমতের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছেন। ট্রাম্প তাকে সম্মান করেন এবং এর আগেও তিনি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুবরাজ মোহাম্মদ যুক্তি দিয়েছেন যে, জ্বালানি অবকাঠামো দখল করতে এবং সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানে সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে, ট্রাম্প ইরানের তেল অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু 'খার্গ দ্বীপ' দখলের সামরিক অভিযানের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
সেনাবাহিনী বা মেরিনদের মাধ্যমে এমন উভচর হামলা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথনে যুবরাজ মোহাম্মদ স্থল অভিযানের পক্ষেই মত দিয়েছেন।
যুদ্ধের বিষয়ে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কারণ দিয়েও প্রভাবিত। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের পাল্টা হামলা হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে, যা এই অঞ্চলের জ্বালানি শিল্পকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
সৌদি, আমিরাত এবং কুয়েতের তেলের সিংহভাগই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই প্রণালি ব্যবহার করতে হয়। যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্রণালি এড়াতে পাইপলাইন তৈরি করেছে, তবে সেই বিকল্প পথগুলোও এখন হামলার শিকার হচ্ছে।
সৌদি সরকারের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত বিশ্লেষকরা বলছেন, যুবরাজ মোহাম্মদ হয়তো যুদ্ধ এড়াতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি উদ্বিগ্ন যে, ট্রাম্প যদি এখন পিছু হটেন, তবে সৌদি আরব এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একাই একটি ক্ষুব্ধ ও বেপরোয়া ইরানের মুখোমুখি হতে হবে।
তাদের মতে, একটি অসমাপ্ত অভিযান সৌদি আরবকে ঘন ঘন ইরানি হামলার মুখে ফেলবে। এমন পরিস্থিতি ইরানকে পর্যায়ক্রমে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতাও এনে দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয় ও আরব উপদ্বীপ প্রকল্পের পরিচালক ইয়াসমিন ফারুক বলেন, 'সৌদি কর্মকর্তারা অবশ্যই চান যুদ্ধ শেষ হোক, কিন্তু সেটা কীভাবে শেষ হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।'
২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় ইরান-সমর্থিত হামলার ফলে দেশটির অর্ধেক তেল উৎপাদন কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা যুবরাজকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি তার বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছিল।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সৌদি কর্মকর্তারা কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন। সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের জোট ইরান থেকে কেবল আংশিক সুরক্ষাই দিতে পারে।
একই কারণে গত কয়েক বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পরামর্শ উপেক্ষা করে ট্রাম্প যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, ইরান এই অঞ্চলের দেশগুলোতে হাজার হাজার মিসাইল ও ড্রোন ছুড়ে জবাব দেয়। উপসাগরীয় কর্মকর্তারা জানান, এর ফলে ইরানকে নিজেদের বলয়ে আনার তাদের চেষ্টা ভেস্তে যায়।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, 'আগে যে সামান্য বিশ্বাসটুকু ছিল, তা এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।'
সৌদি আরবের কাছে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা তারা তেলক্ষেত্র, শোধনাগার এবং শহরগুলোতে বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা ইরানি হামলা ঠেকাতে ব্যবহার করছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এই ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি রয়েছে।
সৌদি আরবে ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ইতিমধ্যে একটি শোধনাগার এবং মার্কিন দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ইন্টারসেপ্ট করা প্রজেক্টাইলের বা গোলার টুকরো পড়ে দুজন বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং এক ডজনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই নেতানিয়াহু এমন সামরিক অভিযানের জন্য চাপ দিয়ে আসছেন যা ইরান সরকারের পতন ঘটাতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের মিসাইল ও নৌ-সক্ষমতা কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন এবং ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। ইসরায়েলি হামলায় বিপুল সংখ্যক নেতা নিহত হলেও, কট্টরপন্থী সরকার এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন যে, ইরানে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র তাদের জন্য মারাত্মক হুমকি।
তারা আশঙ্কা করেন, ইরান সরকারের পতন হলেও সেনাবাহিনীর কিছু অংশ বা ক্ষমতার শূন্যতায় গড়ে ওঠা মিলিশিয়ারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে যাবে এবং বিশেষ করে তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
কিছু সরকারি গোয়েন্দা বিশ্লেষক অন্যান্য কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তারা মনে করেন যুবরাজ মোহাম্মদ এই যুদ্ধকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের প্রভাব বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, যুদ্ধ চললেও সৌদি আরব নিজেকে রক্ষা করতে পারবে।
যুবরাজ মোহাম্মদের সাথে কথোপকথনে ট্রাম্প তেলের দাম এবং অর্থনীতির ক্ষতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি নেতা তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে এটি সাময়িক।
তবে মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা গভীরভাবে সন্দিহান যে তেলের বাজার খুব দ্রুত এই যুদ্ধের ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি সৌদি আরব পূরণ করতে পারবে না, কারণ তাদের ওভারল্যান্ড পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক তেলের কেবল একটি সামান্য অংশই বহন করতে পারে।
অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব সামলাতে ভালো অবস্থানে থাকলেও, এই জলপথ শিগগিরই খুলে দেওয়া না হলে তাদেরও মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই যুবরাজ মোহাম্মদ ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি আরবকে বৈশ্বিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা নিয়ে আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে ছিলেন।
উচ্চাভিলাষী মেগাপ্রকল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশাল বিনিয়োগের কারণে সীমিত সম্পদের ওপর চাপ পড়ায় তার সরকার আগামী কয়েক বছরের জন্য বাজেট ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে।
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এই সবকিছুকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে। কারণ যুবরাজের সাফল্য নির্ভর করছে বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ওপর।
গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সৌদি সরকার কি এখনই যুদ্ধ শেষ করতে চায়, নাকি এমন একটি দীর্ঘ সংঘাত চায় যেখানে ইরানের সক্ষমতা কমে যাবে?
জবাবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল জানান, কর্মকর্তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলা বন্ধ করা।
প্রিন্স ফয়সাল বলেন, 'এই হামলা বন্ধ করতে আমাদের হাতে থাকা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিকসহ সব ধরনের মাধ্যম আমরা ব্যবহার করব।'
