আশির দশকেই লেখা হয়েছিল ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের ‘প্লেবুক’
"আয়াতুল্লাহর প্রতি আল্টিমেটাম: কয়েক দিনের মধ্যে নির্দেশ মানুন অথবা পরিণতির মুখোমুখি হন। ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলো দখলের হুমকি। বিশাল প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি। এবং এই সবকিছুর মূলে রয়েছে একটি দৃঢ় বিশ্বাস—একটি চূড়ান্ত আঘাতই তেহরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করবে।"
এগুলো শুনে মনে হতে পারে যে এটি ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের কোনো রণকৌশল অথবা তার অতি সাম্প্রতিক কোনো 'ট্রুথ সোশ্যাল' পোস্ট। কিন্তু আসলে তা নয়। এগুলো ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকের কথা, যখন ট্রাম্প প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসের নির্বাচনী প্রচারণার কথা ভেবেছিলেন।
একে একটি 'পূর্বাভাস দেওয়া যুদ্ধ' বলাটা হয়তো একটু বেশি হয়ে যাবে। কিন্তু ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের কর্মপদ্ধতি বা 'প্লেবুক' দীর্ঘকাল ধরেই সবার চোখের সামনে ছিল।
তিনি ১৯৮৭ সালে এর প্রথম রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, যখন তিনি আমেরিকার তিনটি প্রধান সংবাদপত্রে পুরো এক পাতার বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য ৯৪ হাজার ৮০১ ডলার ব্যয় করেছিলেন। সেসময় ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট উপসাগরীয় সংকটে আমেরিকার নেতাদের দেখে বিশ্ব 'হাসছে'।
সেসময় আমেরিকা যখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন—ওয়াশিংটন এমন সব 'জাহাজ রক্ষা করার চেষ্টা করছে যেগুলো আমাদের নয়, এমন তেল বহন করছে যা আমাদের প্রয়োজন নেই এবং সেই সব মিত্রদের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে যারা আমাদের সাহায্য করবে না।'
এই কথাগুলো আজ তার করা তিরস্কারগুলোরই প্রতিধ্বনি মাত্র। কিন্তু তখন, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিজেকে যাচাই করতে গিয়ে ট্রাম্প মনে করেছিলেন, সমস্যার মূল কারণ হলো 'দৃঢ়তার অভাব'।
কয়েক সপ্তাহ পরে ১৯৮৭ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি রোটারি ক্লাবের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ট্রাম্প বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, কীভাবে ইরানের নৌবাহিনী—'মেশিনগানসহ ছোট ছোট নৌযান'—আমেরিকাকে জিম্মি করে রেখেছে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, 'আমরা কেন সেখানে গিয়ে উপকূলের কাছে অবস্থিত তাদের কিছু তেলক্ষেত্র দখল করে নিতে পারি না?'
তৎকালীন ৪১ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী ১৯৮৮ সালে গার্ডিয়ানের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে আরও কঠোরভাবে বলেছিলেন, 'আমাদের কোনো লোক বা জাহাজে একটি গুলি লাগলে আমি খার্গ আইল্যান্ডের দফারফা করে দেব। আমি ভেতরে ঢুকে এটি দখল করে নেব।'
ঠিক আজকের মতোই তখনও ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে এই দ্বীপটিকে চাপ সৃষ্টি করার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। এটি দখল করলে যুক্তরাষ্ট্রকে 'বোকাদের দল' হিসেবে দেখানোর সুযোগ বন্ধ হয়ে যেত—এমনটাই তার ধারণা ছিল।
তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন তখন দ্রুতই ম্লান হয়ে যায়—অন্তত ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের জন্য। কিন্তু ট্রাম্প একই মূল যুক্তি বারবার তুলে ধরতে থাকেন: যদি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কাজে লাগানো হয়, তবে সেটির যথাযথ মূল্য নেওয়া উচিত, অথবা আরও দৃঢ়ভাবে ব্যবহার করা উচিত।
১৯৮৯ সালে অলাভজনক সংস্থাগুলোর একটি সম্মেলনে 'ট্রাম্পের বিশ্ব ভাবনা' নিয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি এমন এক কথা বলেছিলেন যা সাদ্দাম হোসেনকেও বিব্রত করত।
তিনি নাকি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে কীভাবে আলোচনা করতে হয়, তা একমাত্র ইরাকই দেখিয়েছে (যদিও বাস্তবে ইরাক আক্রমণ চালিয়ে আট বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়েছিল, যা শেষ হয়েছিল জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে)।
ট্রাম্প প্রশ্ন করেছিলেন, 'যদি মাঝে মাঝে পরিস্থিতি ঠিক করার জন্য ব্যবহার না করেন, তবে সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য কী? আমাদের ইরানকে বলা উচিত—বন্ধুরা, আমাদের সব জিম্মিদের ফেরত দেওয়ার জন্য তোমাদের হাতে এক সপ্তাহ সময় আছে, নতুবা সব ধরণের আপস শেষ'।"
চার দশক পরেও, কঠোর সামরিক আল্টিমেটামের ক্ষমতা এখনও ট্রাম্পকে মোহিত করে রেখেছে। পার্থক্য শুধু এই যে, এই সপ্তাহান্তে তিনি তেহরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এক সপ্তাহ নয়, ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন।
তখনকার মতো এখনও ট্রাম্পের সহজাত প্রবৃত্তি হলো একটি পরিস্থিতিকে গুটিকয়েক আলোচনার পদক্ষেপে (একটি ঘটনা, একটি সময়সীমা, একটি প্রতিক্রিয়া) সীমাবদ্ধ করা এবং ধরে নেওয়া যে পক্ষটি সবচেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক, তারাই জয়ী হবে।
বিশ্বের সামরিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার কাছ থেকে সবসময়ই নির্ণায়ক ভূমিকা প্রত্যাশিত, অন্তত ট্রাম্পের কাছে। তবে প্রশ্ন হলো—যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যুদ্ধের সময় প্রায়ই দেখা যায়—যদি তেমনটা না ঘটে তবে কী হবে?
ট্রাম্প যদি এই যুদ্ধের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, বা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর আসা ভয়াবহ আঘাত সামলাতে না পারেন, অথবা এককভাবে ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ করতে না পারেন, তবে তিনি কী করবেন?
এখানেই এখানে ট্রাম্পের ১৯৮০-এর দশকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আবার সামনে আসতে পারে—মার্কিন শক্তির ওপর পরগাছা হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য মিত্রদের দোষারোপ করা। পারস্য উপসাগরে ঝুঁকি বাড়ার সাথে সাথে অংশীদারদের ওপর বস্তুগত এবং রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি অবদান রাখার চাপও বেড়েছে।
ট্রাম্প গত শুক্রবার স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে সাহায্যের জন্য বলা হলে ন্যাটোর 'কাপুরুষরা' কীভাবে সাড়া দিয়েছিল তা তিনি মনে রাখবেন। কিছু মার্কিন মিত্রের অবাক হওয়া উচিত হবে না যদি এই ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট তার কথায় অটল থাকেন।
১৯৮০-র দশকের ট্রাম্পের ভাবনাগুলো যেমন আজকের ইরান যুদ্ধের প্রতি তার মানসিকতার গাইড হিসেবে কাজ করছে, তেমনি সেগুলো এটিও নির্দেশ করতে পারে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধের বিল বা খরচ কাদের দিয়ে মেটাতে চাইবেন।
ট্রাম্পের কাছে এটি কেবল ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে ইচ্ছাশক্তির লড়াই নয়, বরং মার্কিন শক্তি ব্যবহারের শর্তাবলি এবং এর থেকে কারা উপকৃত হবে তা নতুন করে নির্ধারণের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
ট্রাম্পের পরবর্তী আল্টিমেটামের লক্ষ্য হয়তো দূরের কোনো স্বৈরশাসক নয়, বরং ইউরোপের নেতা এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের আমেরিকার মিত্ররা হতে পারেন।
