বাংলাদেশগামী জ্বালানিবাহী জাহাজের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে তেহরান
গতকাল জ্বালানি বিভাগ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এপ্রিল মাসে বাংলাদেশগামী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুবিধার্থে ছয়টি জাহাজের একটি বিস্তারিত তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করেছে।
ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশগামী জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজগুলোর সর্বশেষ তথ্য জানতে চাওয়ার একদিন পরই এই তালিকা দেওয়া হয়েছে।
চিঠির জবাবে, জ্বালানি বিভাগ হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী প্রায় ৫ লাখ টন এলএনজি এবং প্রায় ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী ছয়টি জাহাজের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই নৌপথ ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।
তেহরানের এই চিঠি আসে বাংলাদেশের আগের কূটনৈতিক উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে ঢাকা নিজস্ব জ্বালানি আমদানির নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ইরানের সহায়তা চেয়েছিল।
জ্বালানিবাহী জাহাজের যাত্রা নিরাপদ করতে বাংলাদেশের এই উদ্যোগ ও ইরানের প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপট বুঝতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে। তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অবশ্য টিবিএস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রাথমিক চিঠি এবং ইরানের জবাবি যোগাযোগ—উভয়ের কপিই সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশের এই অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগে ঢাকার আগের উদ্যোগ
সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপের আগে, গত ১৫ মার্চ জ্বালানি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সহায়তা চেয়ে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠায়।
সেই বার্তায় বাংলাদেশ উল্লেখ করে, প্রায় ৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বহনকারী তিনটি চালান—আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কৌশলগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে, ঢাকা তেহরানকে জ্বালানি আমদানির নিরবচ্ছিন্ন সামুদ্রিক চলাচল নিশ্চিত করতে সহায়তার আহ্বান জানায়।
যে ছয়টি চালানের তথ্য দেওয়া হয়েছে
ছয়টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটি এলএনজি চালান কাতার থেকে এবং অপরিশোধিত তেলের চালানটি সৌদি আরব থেকে আসবে।
জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করবে, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো বিঘ্ন বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
জাহাজের বিস্তারিত তথ্য
জ্বালানি বিভাগ প্রতিটি জাহাজের সম্ভাব্য লোডিং তারিখ, কার্গো সক্ষমতা, উৎস ও লোডিং বন্দর এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য প্রস্তুত করেছে।
চারটি এলএনজি চালান কাতারএনার্জি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এগুলো রাস লাফান বন্দরে লোড হবে।
প্রথম চালানটি বহন করবে 'আল আরিশ' নামের বাহামার পতাকাবাহী জাহাজ, যার ধারণক্ষমতা ৯৯,১০৬ টন এবং এটি আগামী ১৪ এপ্রিল লোড হওয়ার কথা রয়েছে।
দ্বিতীয় চালানটি বহন করবে গ্রিক পতাকাবাহী 'মারান গ্যাস এফেসোস', যার ধারণক্ষমতা ১,০৩,৯২৮ টন এবং ২২ এপ্রিল লোডিং নির্ধারিত রয়েছে।
তৃতীয় এলএনজি চালানটি 'আল মাররৌনা' নামের আরেকটি বাহামার পতাকাবাহী জাহাজে ২৭ এপ্রিল লোড হওয়ার কথা রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা ৯৯,১০৬ টন।
চতুর্থ চালানটি ১০ মে লোড হবে এবং 'লুসাইল' নামের বাহামা পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহন করা হবে, যার ধারণক্ষমতা ৯৫,৮২৪ টন।
এছাড়া এক্সেলারেট গ্যাস মার্কেটিং এলপি আরও একটি ৯৭,৪৯৬ টনের এলএনজি কার্গো সরবরাহ করছে। এই চালানটি ২ এপ্রিল রাস লাফান বন্দর থেকে লোড হয়ে গ্রিসের পতাকাবাহী 'আল জাসাসিয়া' জাহাজে পরিবহন করা হবে।
অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার ইতোমধ্যে যাত্রাপথে
এলএনজি চালানের পাশাপাশি সৌদি আরামকো থেকে ভাড়া নেওয়া একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকারও ইরানকে দেওয়া তালিকায় রয়েছে। 'এমটি নর্ডিক পলাক্স' নামের এই জাহাজটি কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এবং এর ধারণক্ষমতা ৭৮,৯২২ টন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজটি গত ২ মার্চ রাস তানুরা বন্দর থেকে লোড হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের পথে রয়েছে। তবে বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম অনিশ্চিত।
হরমুজ উত্তেজনায় বিপর্যস্ত জ্বালানি সরবরাহ
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যাঘাতের আশঙ্কায় ইরানের সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়েই বাংলাদেশ তার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় এই রুট কার্যত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যমান চুক্তির আওতায়, এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহ বিলম্বিত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে বাংলাদেশকে ক্রমেই দামের ক্ষেত্রে অস্থিতিশীল স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আর্থিক প্রভাব গুরুতর।
যুদ্ধের আগে এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ থেকে ১০ ডলার। কিন্তু চলমান সংকটের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলাকে গড়ে ২৩ ডলার দরে এলএনজি কিনতে হয়েছে—যা যুদ্ধ-পূর্ব দামের দ্বিগুণেরও বেশি।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশগামী জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এখন জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আরও আর্থিক চাপ এড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "একটি চালান বিলম্বিত বা ব্যাহত হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়ে।"
তিনি আরও বলেন, "ইরানের কাছ থেকে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে, সেটি হবে এক ধরনের লাইফলাইন—কারণ এখন প্রতিটি জাহাজের হরমুজ পাড়ি দেওয়াই অনিশ্চয়তায় ভরা।"
জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনাকারীরা অত্যন্ত অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করছেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কার্যক্রম এবং সামগ্রিক অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সামান্য বিঘ্নও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের সঙ্গে সরকারের সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ পরিস্থিতির আশু জরুরি অবস্থা তুলে ধরে।
এপ্রিল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়—তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের এই লাইফলাইন কতটা সচল থাকবে।
