ভারতের রান্নার গ্যাসের সংকট যেভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানি তেলের দাম
ভারতে এখন রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট। ওদিকে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গাড়িচালকদের প্রতি গ্যালন পেট্রলের (গ্যাসোলিন) জন্য রেকর্ড ৬ ডলার পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হলেও, এই দুটি ঘটনাই মূলত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের স্পষ্ট লক্ষণ। শুধু তাই নয়, ঘটনা দুটি একে অপরের সাথে সরাসরি যুক্ত এবং ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্ট ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রভাবের (নক-অন ইফেক্ট) এক বড় প্রমাণ।
ইরান হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের বাণিজ্য পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়া বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আমদানিকারকেরা। এই পরিস্থিতি তেলের ক্রেতা দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব মজুত ব্যবহার করতে হচ্ছে, এবং তা অনেক দেশেই তা প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় অন্যান্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে সরকারগুলোকে।
তবে এই ঘাটতি মেটানোর কিছু কিছু প্রচেষ্টা, যেমন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের মরিয়া পদক্ষেপ—উল্টো অন্যান্য অঞ্চলে সমস্যার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতে রান্নার প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে এলপিজি'র ব্যাপক ব্যবহার হয়। ইরান যুদ্ধের আগে দেশটির মোট এলপিজি আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আসত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু বর্তমানে সেই সরবরাহ লাইন প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায়, নয়াদিল্লি ভারতের জ্বালানি পরিশোধনাগারগুলোকে এলপিজি উৎপাদন সর্বোচ্চ করার নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ মানতে গিয়ে রিফাইনারিগুলো 'অ্যালকাইলেট' উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে—যা এলপিজি-কে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা এক ধরণের মোটর জ্বালানি সংযোজনী বা অ্যাডিটিভ।
এই অবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের জন্য অ্যালকাইলেটের এই হ্রাসমান সরবরাহ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল না পাওয়ায়—এশিয়ার শোধনাগারগুলো ইতিমধ্যেই জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে, যা ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রল সংকটের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যালকাইলেটের চাহিদা অত্যন্ত বেশি, কারণ এটি অন্যান্য উপাদানের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্নভাবে জ্বলে এবং বায়ুদূষণ বা ধোঁয়াশা কমানোর জন্য এই রাজ্যে একটি বিশেষ ধরনের পেট্রল মিশ্রণ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
আর এসব কারণেই ক্যালিফোর্নিয়ার গাড়িচালকেরা ইরান যুদ্ধের ফলে দ্বিমুখী ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছেন: প্রথমত, এশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি কমে যাওয়ায় তাদের মোটর জ্বালানির সরবরাহ শৃঙ্খল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের রান্নার গ্যাস বাঁচানোর নীতির কারণে— ক্যালিফোর্নিয়ার নিজস্ব বিশেষ পেট্রল মিশ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান বা অ্যালকাইলেট সংগ্রহ করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট (এপিআই)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ মেসন হ্যামিল্টন বলেন, "হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার কারণে ভারতের এলপিজি সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে সেখানকার শোধনাগারগুলো কম অ্যালকাইলেট উৎপাদন ও রপ্তানি করছে, যা ক্যালিফোর্নিয়ার ইতোমধ্যেই সংকুচিত পেট্রোলের বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।"
রান্নার জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ভারত
ভারতীয় রিফাইনারিগুলোর অ্যালকাইলেট রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য এর চেয়ে খারাপ সময়ে আর আসতে পারত না। যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যের গাড়িচালকেরা ইতিমধ্যেই ২০২২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পেট্রলের দাম পরিশোধ করছেন। গ্যাসবাডির বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, অ্যালকাইলেটের সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে সামনে গ্রীষ্মকালীন ড্রাইভিং মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে জ্বালানির দাম আরও আকাশচুম্বী হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া এনার্জি কমিশন (সিইসি)-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, রাজ্য কর্তৃপক্ষ ভারতের এই পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বর্তমানে পেট্রল এবং এর মিশ্রণ উপাদানগুলোর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কমিশন এখনই কোনো ঘাটতির আশঙ্কা করছে না, তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ওই মুখপাত্র জানান।
'গ্যাসবাডি'-র তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার খুচরা বাজারে মোটরযানের জ্বালানির গড় দাম গত শুক্রবার প্রতি গ্যালনে ছিল ৬.১৪ ডলার। এর আগে গত ৭ মে ক্যালিফোর্নিয়ার পেট্রোল মজুত রেকর্ড নিম্নের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় এই দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬.১৬ ডলারে পৌঁছেছিল। ডি হান বলেন, আগামী সপ্তাহগুলোতে এই দাম প্রতি গ্যালনে ৬.৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশগত আইন অনুযায়ী, গ্রীষ্মের পিক সিজনে পরিবেশবান্ধব এবং পরিচ্ছন্নভাবে জ্বলে এমন পেট্রল মিশ্রণ ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক, যা জ্বালানির উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানিবাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার-এর প্রধান গবেষণা বিশ্লেষক নিখিল দুবে জানান, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার পরিবেশগত নিয়মাবলী সবচেয়ে কঠোর, যার ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে জ্বালানি খরচ অনেক বেশি হয়। গ্যাসবাডির তথ্যমতে, গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পর্যায়ে পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রতি গ্যালনে ৪.৫২ ডলার।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যালকাইলেট সরবরাহ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে ভারতের তেমন কিছুই করার নেই। সেখানে এলপিজি-র ঘাটতি এতটাই তীব্র রূপ নিয়েছে যে, সাধারণ মানুষকে একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও—খালি হাতে ফিরে কালোবাজার থেকে চড়া দামে তা কিনতে হচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে তারা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার পরিচালনাকারী শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স এই মাসে জানিয়েছে যে, এলপিজি উৎপাদন সর্বোচ্চ করতে তারা অ্যালকাইলেট উৎপাদন ও রপ্তানি কমিয়ে দিচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ভারতের মোট অ্যালকাইলেট রপ্তানি কমে প্রতিদিন ৩৩,০০০ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা মার্চ মাসের রপ্তানি (প্রতিদিন ৬১,০০০ ব্যারেল)-র প্রায় অর্ধেক এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে সর্বনিম্ন।
সীমিত বিকল্প
নয়াদিল্লি যেভাবে এলপিজি সংকট মোকাবিলা করছে, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমকেও একইভাবে যুঝতে হচ্ছে। আপাতত তার সামনে পাম্পগুলোতে জ্বালানির দামের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি রোধ করার কোনো ভালো বিকল্প নেই, বিশেষ করে যতদিন এই ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে।
ডি হান বলেন, জ্বালানির দাম কমানোর জন্য সাময়িক কোনো পদক্ষেপ, যেমন কর মওকুফ করা হলে তা বাজারে চাহিদা আরও বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে অ্যালকাইলেটের ঘাটতি আরও তীব্র হবে এবং ভোক্তাদের আরও বড় ধরণের দামের ধাক্কা বা 'স্টিকার শকের' মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "একটি ব্যবস্থা যা ইতোমধ্যেই তার বিদ্যমান বোঝার নিচে পিষ্ট হচ্ছে, তার ওপর আপনি বাড়তি চাপ দিতে পারেন না।"
গ্যাসবাডির ডি হানের মতে, এই পরিস্থিতিতে গভর্নর নিউসমের সামনে ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র কার্যকর উপায় হতে পারে—রাজ্যের কঠোর জ্বালানি নীতি বা স্পেসিফিকেশন সাময়িকভাবে শিথিল করা, যাতে অ্যালকাইলেটের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমে আসে।
ডি হান বলেন, "তার (নিউসমের) হাত মূলত বাঁধা। এই মুহূর্তে তার সামনে এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।"
তবে ক্যালিফোর্নিয়া এনার্জি কমিশন (সিইসি)-এর মুখপাত্র অবশ্য মনে করছেন যে, এই মিশ্রণের শর্ত বা নিয়মাবলী শিথিল করা রাজ্যের জন্য খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না।
