ইরানের নতুন ‘ভ্যাসেল ডিক্লারেশন’ নীতি: জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক পরিবহনে এর প্রভাব কী?
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) সম্পূর্ণ নতুন একটি সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার আগে এখন থেকে সব জাহাজকে একটি 'ভ্যাসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশন' বা জাহাজের তথ্য সম্বলিত ঘোষণাপত্র জমা দিতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার, ট্যাঙ্কার পরিচালনাকারী এবং সার্বিকভাবে জ্বালানির দামের ওপর এর প্রভাব কী হতে যাচ্ছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
জাহাজ চলাচল খাতে কাঁপন ধরানো নতুন নিয়ম
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস নেভি (নৌবাহিনী) ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক সমস্ত জাহাজকে এখন থেকে নবগঠিত 'পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি' (পিজিএসএ)-র কাছে একটি আনুষ্ঠানিক 'ভ্যাসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশন' জমা দিতে হবে। এটি কোনো অনুরোধ নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক নিয়ম। এই নিয়ম মানতে ব্যর্থ হলে জাহাজগুলো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি নাও পেতে পারে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের আগে বিশ্ববাজারে লেনদেন হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো এই জলপথ দিয়ে।
ঘোষণাপত্রে কী কী তথ্য চাওয়া হয়েছে
পিজিএসএ-র এই ভ্যাসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশনের আওতায়, জাহাজগুলোকে প্রবেশাধিকার পাওয়ার আগে তাদের কার্গো বা মালের ধরন, উৎস, গন্তব্য, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং রুটের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত বা ইরাক থেকে অপরিশোধিত তেল বহনকারী ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য এর অর্থ হলো—সামনে অগ্রসর হওয়ার আগেই ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বাণিজ্যিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত তথ্য সরবরাহ করা। ট্যাঙ্কার জাহাজ অপারেটর এবং তাদের বীমাকারীরা এঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
২০ শতাংশের সংকট
হরমুজ প্রণালি হলো ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমায় একটি ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত সংকীর্ণ জলপথ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদকদের জন্য এর কোনো কার্যকর বিকল্প রুট নেই; একমাত্র বিকল্প সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্য দিয়ে যাওয়া 'হরমুজ বাইপাস পাইপলাইন' স্বাভাবিক পরিমাণের তুলনায় মাত্র সামান্য অংশই পরিবহন করতে পারে। শান্তিকালীন সময়ে দৈনিক এই প্রণালি দিয়ে ১৭ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে যেত। কিন্তু, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর থেকে— এই জলপথে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের নতুন নিয়ম ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার আরেকটি নতুন স্তর যোগ করল।
আকাশচুম্বী হচ্ছে বীমা খরচ
পারস্য উপসাগর অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর জন্য যুদ্ধ-ঝুঁকি বীমা প্রিমিয়াম এরমধ্যেই ২০১৯ সালের ট্যাঙ্কার হামলার পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। লয়েডস অব লন্ডন এবং অন্যান্য প্রধান বীমাকারীরা পিজিএসএ-র এই ঘোষণাপত্রের বাধ্যবাধকতাকে একটি নতুন 'কমপ্লায়েন্স রিস্ক' বা নীতিগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা সতর্ক করেছে যে, ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে কার্গোর বিবরণ জমা দিলে জাহাজগুলোর সাধারণ বীমা কভারেজ চুক্তি বাতিল হয়ে যেতে পারে। জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর জন্য এর অর্থ হলো—হয় তাদের অতিরিক্ত বীমা খরচ বহন করতে হবে, না হয় বীমা ছাড়াই একটি বিতর্কিত সামরিক জোনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চালানোর ঝুঁকি নিতে হবে।
@অস্থির তেলের বাজার
এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো সংবাদের পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম তীব্রভাবে ওঠানামা করছে। ইরানের এই নতুন নীতি বাজারে সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে তেলের দামের আরেকটি বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। ওপেকের যেসব সদস্য দেশ হরমুজের ওপর নির্ভরশীল—যার মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্তর্ভুক্ত—তারা সম্মিলিতভাবে ওয়াশিংটন এবং জাতিসংঘের কাছে এই নতুন ইরানি নিয়মের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করার জন্য লবিং করছে। তারা আশঙ্কা করছে যে, আংশিক অবরোধও অপরিশোধিত তেলের দামকে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এবং ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আইনি লড়াইয়ে ইরান হারবে, তবে সেটা কাগজে-কলমে
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (ইউএনক্লস)-এর অধীনে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি যেখানে সব জাহাজের মুক্তভাবে চলাচলের অধিকার রয়েছে। তবে ইরান এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, আর তেহরান দীর্ঘকাল ধরে এই আইনি ফাঁকটি ব্যবহার করে আসছে। মুক্ত নৌচলাচলের দাবি জানিয়ে ১১২টি দেশের সমর্থনপুষ্ট জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ইরানের এই নতুন পিজিএসএ কাঠামো প্রথাগত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু আইন প্রয়োগ করার মতো ব্যবস্থা না থাকলে শুধু আইনি যুক্তি কোনো কাজে আসে না, এবং কোনো দেশের নৌবাহিনীই এখনও পর্যন্ত এই নতুন ঘোষণাপত্রের বাধ্যবাধকতাকে চ্যালেঞ্জ করেনি।
কে আগে নতি স্বীকার করবে?
এই ঘোষণা নীতিকে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধবিরতি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনায় ইরানের প্রধান কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরমুজের জাহাজ চলাচল সরাসরি বন্ধ না করে—তার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে তেহরান মনে করছে যে, তারা একটি স্থায়ী দরকষাকষির ঘুঁটি তৈরি করেছে, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বা সংঘাত এড়াতে সাহায্য করবে। ইউরোপীয় কূটনীতিকরা একটি ট্রানজিট কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে তেহরানের সাথে সক্রিয় আলোচনা চালাচ্ছেন। এখন বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যে দেশটি ইতোমধ্যে এই প্রণালিতে ইরানের সাথে সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়েছে, তারা ইরানকে বিশ্বের এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেলের হাইওয়ের ওপর এমন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেবে কি না।
