রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলে লাইভ অনুষ্ঠানে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইরান
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণমূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করেছে। এর মধ্যে রাইফেল ও মেশিনগান ব্যবহারের প্রশিক্ষণও রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত কনটেন্টের ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানগুলোতে দেখানো হচ্ছে কীভাবে কালাশনিকভ রাইফেল এবং পিকে মেশিনগান খোলা ও পুনরায় জোড়া লাগাতে হয়।
দেশটির একমাত্র টেলিভিশন নেটওয়ার্ক 'ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)' কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং এর মহাপরিচালককে নিয়োগ দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
চ্যানেল থ্রিতে প্রচারিত একটি সরাসরি অনুষ্ঠানে, যা কালাশনিকভ প্রশিক্ষণের জন্য নিবেদিত ছিল, সেখানে মুখোশ পরা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পোশাকধারী এক ব্যক্তি অস্ত্রটি ব্যবহারের পদ্ধতি দেখান।
এরপর অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রাইফেলটি প্রস্তুত করেন এবং স্টুডিওতে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পতাকার দিকে গুলি চালানোর অনুমতি ওই আইআরজিসি কর্মকর্তার কাছে চান। পরে তিনি সরাসরি সম্প্রচারে সেটি করেন।
আরেকটি সরাসরি সম্প্রচারে এক টেলিভিশন উপস্থাপক তেহরানের প্রধান প্রধান চত্বরে জড়ো হওয়া সরকারপন্থি সমর্থকদের সঙ্গে যোগ দেন এবং ক্যামেরার সামনে আকাশের দিকে গুলি ছোড়েন।
এরপর তিনি বলেন, 'এটি শুধু মজার ছলে ছোড়া একটি গুলি ছিল। কিন্তু প্রয়োজন হলে আমাদের প্রত্যেকেই অস্ত্র তুলে নেবে এবং যারা এই ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালাতে চাইবে তাদের কান কেটে ফেলবে।'
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি শুধু পুরুষ উপস্থাপকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
সরকারপন্থী পরিচিত টেলিভিশন উপস্থাপক মোবিনা নাসিরিও একটি সরাসরি অনুষ্ঠানে হাতে কালাশনিকভ তুলে নেন এবং বলেন, তিনি সম্প্রতি অস্ত্রটি পেয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে প্রস্তুত আছেন।
গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার কর্মীদের সংবাদ সংস্থা 'হরানা' জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অভিযোগে চার হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
হরানার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিলের মধ্যে ইরানে অন্তত ৪ হাজার ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি, জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করা, যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং শত্রুভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, একই সময়ে ৫০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অভিযোগ ছিল।
হরানার মতে, কারাগার ও আটককেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। কারাগারের বাইরেও কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চৌকি বাড়িয়েছে এবং চলাচলের ওপর আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিভিন্ন শহরে স্থাপিত তল্লাশি চৌকিতে শিশুদেরও মোতায়েন করা হচ্ছে। এদের কারও কারও বয়স মাত্র ১২ বছর।
'এই কুকুরগুলো উদ্ধারকারী ফেরেশতা'
ইরানের রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকর্মীরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংস্থাটির উদ্ধারকারী কুকুরদের নিয়ে করা অবমাননাকর মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন।
তেহরানে সরকারপন্থী সমর্থকদের এক সমাবেশে এক টিভি উপস্থাপক উপস্থিত একজনকে প্রশ্ন করেন, 'রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকারী কুকুরগুলোর চেয়ে নিকৃষ্ট আর কে আছে?'
এই সম্প্রচারের পর 'খবর অনলাইন' রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারদলের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেয়। সেখানে তারা জাতীয় টেলিভিশনে করা ওই মন্তব্যের সমালোচনা করেন।
সাক্ষাৎকারে উদ্ধারকারী কুকুর প্রশিক্ষক ওমিদ বারজেগারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে এসব কুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, 'এই কুকুরগুলো উদ্ধারকারী ফেরেশতা।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা প্রত্যেকে এবং এই কুকুরগুলো একটি দল হিসেবে কাজ করি। এই কুকুরগুলো নিকৃষ্ট নয়। এগুলো মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত।'
সাক্ষাৎকারটি ইরানের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে উদ্ধারকারী কুকুর নিয়ে মন্তব্য ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার আচরণের সমালোচনা করেন।
একজন দর্শক লিখেছেন, 'এই বিশাল আইআরআইবি প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একজনও সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ নেই। এর ফলে মানুষের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না।'
ইরানের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী আইনের কঠোর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কুকুর পালনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে তারা প্রকাশ্যে কুকুর হাঁটানোও নিষিদ্ধ করেছেন।
সমাবেশে 'সাভাক'-এর প্রতীক নিয়ে ক্ষোভ
ইরানের সর্বশেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থকদের 'সাভাক'-সংক্রান্ত পতাকা বহন করতে দেখা যাওয়ার ভিডিও পার্সি ভাষার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু ব্যবহারকারী এ ঘটনাকে উপহাস ও নিন্দা করেছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লন্ডন, কোপেনহেগেন এবং জার্মানির রেগেন্সবুর্গে রাজতন্ত্রপন্থী সমর্থকদের সামরিক কুচকাওয়াজের মতো মিছিল করতে দেখা গেছে। তাদের হাতে ছিল সাভাকের পতাকা। কেউ কেউ বলেছেন, এসব আয়োজন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলোর মিছিলের মতো দেখাচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক ব্যবহারকারী সাভাকের লোগোর সম্পাদিত সংস্করণ প্রকাশ করে সেটিতে সিংহের পরিবর্তে কেচাপের বোতল বসিয়ে উপহাস করেন।
আরেকজন ইরানি ব্যবহারকারী মিছিলগুলোর জাতীয়তাবাদী স্লোগানের সমালোচনা করেন। তিনি ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী দেখানো একটি মানচিত্র শেয়ার করে এক্সে লেখেন, 'আমি চাই না এই মানুষগুলোর মুখে এভাবে "ইরান" ধ্বনি শুনতে। তাদের ইরান আমাদের ইরানের মতো নয়।'
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বহু ইরানি রাজতন্ত্রপন্থীদের সমালোচনা করেছেন। কারণ, ইসরায়েল-সমর্থিত এসব গোষ্ঠী ইরানের ওপর সামরিক হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অনেক গণমাধ্যম এখনো রাজতন্ত্রপন্থীদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিরোধী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে যাচ্ছে।
গণমাধ্যমের এই প্রচার ও বিদেশে হওয়া মিছিলগুলোর প্রতিক্রিয়ায় আরেকজন পার্সিভাষী ব্যবহারকারী এক্সে লিখেছেন, 'যখন ইরানের সাহসী সন্তানদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি অংশ হাস্যকর প্রদর্শনী নিয়ে ব্যস্ত। তারা দেশের ভেতরে মানুষের প্রকৃত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে বিদেশে অশ্লীল প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্ব শুধু এই ছবিটাই দেখছে।'
