মেট্রোরেল প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় কমাতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পরিকল্পনা সরকারের
দীর্ঘদিন ধরে থেমে থাকা জাপানি অর্থায়নের মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করতে চায় সরকার। একইসঙ্গে জাপানি ঠিকাদারের জমা দেওয়া অস্বাভাবিক বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল (২০ মে) সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় কর্মকর্তারা ঢাকার ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পগুলোর সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রকল্প ব্যয় নিয়ে মতবিরোধের কারণে বিমানবন্দর ও কমলাপুরকে যুক্ত করা এমআরটি লাইন-১ এবং হেমায়েতপুর, গুলশান ও ভাটারাকে যুক্ত করা এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্নের কাজ প্রায় দেড় বছর ধরে থেমে আছে।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ব্যয় কমাতে জাপান সরকারের আন্তজার্তিক সহযোগীতা সংস্থা জাইকা ও ঠিকাদারদের সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এত বেশি ব্যয় কেন ধরা হয়েছে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া হবে তাদের কাছে।
অন্যান্য দেশে একই ধরনের প্রকল্পের তুলনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা-ও তুলনা করে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি দরকষাকষি প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পেশাদার নেগোশিয়েটর বা কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে।
আমির খসরু বলেন, 'আলোচনা তো চলমান। তারা কেন ব্যয় বেশি দিয়েছে, সেটা জাস্টিফাই করবে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ কীভাবে একই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সেটাও তাদের জানানো হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'পেশাদার নেগোশিয়েটর নিয়োগ করা হবে, যাতে দরকষাকষিটা আওথিকভাবে হয় এবং আমাদের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা হয়।'
কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে জাইকার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।
তবে সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন কবে শুরু হবে, তার সময়সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এখনই কোনো নির্দিষ্ট ডেডলাইন ঠিক করা হয়নি।
তবে মন্ত্রীর কাছ থেকে নীতিগত সম্মতি নেওয়া হয়েছে এবং সামনে আরও কয়েকটি বৈঠক হবে। একইসঙ্গে সব উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের কাজও করতে হবে।
সভার আলোচনায় উঠে আসে, বাংলাদেশে আগে কখনো আন্ডারগ্রাউন্ড (ভূগর্ভস্থ) মেট্রোরেল না হওয়ায় ঠিকাদাররা অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনায় বেশি ব্যয় প্রস্তাব করেছে।
ঢাকা শহরের মাটির গঠন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কম্পনের সম্ভাবনা ও আশপাশের ভবন ক্ষতির ঝুঁকির বিষয়গুলোও বেশি ব্যয় প্রস্তাব করার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'যেহেতু বাংলাদেশে আন্ডারগ্রাউন্ড কোনো লাইন আগে হয়নি, সে কারণে এখানে কী ধরনের ঝুঁকি হবে, মাটির গঠনটা কী—এসব নিয়ে তাদের চিন্তা আছে। ভবিষ্যতে টানেল খননের সময় কোনো ভবনে ক্ষতি হলে বা আশপাশে কম্পনের প্রভাব পড়লে ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়েও ঝুঁকি রয়েছে। জাপানি ঠিকাদারের এসব যুক্তিও পর্যালোচনা করা হবে।'
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, ২০১৯ সালে, জাপানের অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্প অনুমোদন পায়। কিন্তু সরকারের অনুমোদিত মূল ডিপিপিতে যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, জাপানি পরামর্শক ও ঠিকাদাররা তার চেয়ে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি খরচের প্রস্তাব দেয়। এরপরই প্রকল্প দুটির কাজ থমকে যায়।
ডিএমটিসিএলের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার শুরুতে এই দুই প্রকল্পের জন্য মোট ৫২ হাজার ৫৬১.৪৩ কোটি টাকা অনুমোদন করেছিল। কিন্তু পরে জাপানি পরামর্শক ও ঠিকাদাররা এই ব্যয় বাড়িয়ে ৯৬ হাজার ৪২২.৭০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেয়। অর্থাৎ আগের চেয়ে ব্যয় প্রায় ৮৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা বলেন, আমিনবাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত তিনটি আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণ কাজের প্যাকেজের জন্য প্রথমে ১৩ হাজার ৯৬৬.২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। কিন্তু ঠিকাদাররা দরপত্রে এই সম্ভাব্য ব্যয় বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করে।
মূল ডিপিপিতে ডিপো নির্মাণ, আন্ডারগ্রাউন্ড ও এলিভেটেড (উড়াল) টানেল স্টেশন, মেকানিক্যাল কাজ ও রোলিং স্টক বাবদ মোট ৩৭ হাজার ৬৫৫.৬৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। এখন এই কাজের জন্য ৮০ হাজার ৯৯.৭৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্টেকহোল্ডাররা বলেন, জাপানি ঋণের শর্তগুলো এমনভাবে তৈরি করা যে, সেখানে অন্যদের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ খুব কম থাকে। কারণ শর্ত অনুযায়ী জাপান থেকেই পরামর্শক নিয়োগ করতে হয়। আর ওই পরামর্শকরা দরপত্রের কাগজপত্র এমনভাবে প্রস্তুত করে, যা বেশিরভাগ সময়ই জাপানি ঠিকাদারদের পক্ষে যায়।
কর্মকর্তারা বলেন, দরপত্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে দুই-তিনটি কোম্পানিই বারবার ঘুরেফিরে দরপত্র প্রক্রিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বা প্রতিযোগিতার সুযোগ কমে যায়।
এ বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই ডিএমটিসিএল ও জাইকার মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ পক্ষ চাইছে বর্তমান দরপত্রগুলো বাতিল করে নতুন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করতে। অন্যদিকে জাইকার দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের নিজস্ব ক্রয়-সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও আন্ডারগ্রাউন্ড নির্মাণ কাজের ঝুঁকির কারণেই ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে বলে তারা যুক্তি দেখিয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনকে পাঠানো এক চিঠিতে ডিএমটিসিএল জানায়, এমআরটি-১ লাইনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়াতে তারা কয়েকটি সুপারিশ করেছে।
এসব সুপারিশের মধ্যে একটি হলো জাপানি ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও কর্মীদের জন্য বিদ্যমান কর অব্যাহতি ও শুল্ক সুবিধা সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা।
এছাড়া ডিএমটিসিএল প্রাকযোগ্যতা ছাড়াই 'ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপ উইদাউইট প্রিকোয়ালিফিকেশন' পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে আরও বেশিসংখ্যক যোগ্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদার অংশ নিতে পারে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রকল্প ব্যয় গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা করে বাস্তবভিত্তিক সমাধান নির্ধারণ প্রয়োজন। একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে কার্যপরিধি পুনর্নির্ধারণ বা সংশোধনের বিষয়টিও বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে গতকালের সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, সরকার অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে আরও কিছু মেট্রোরেল প্রকল্প নিয়েও অগ্রসর হচ্ছে।
গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থায়ন করবে। অন্যদিকে গাবতলী, পুরান ঢাকা ও ডেমরাকে সংযুক্তকারী এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও ঠিকাদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের জন্য সুবিধা হবে। এতে বিভিন্ন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়, কাজের মান ও বাস্তবায়নের দক্ষতার মধ্যে তুলনামূলক চিত্র পাওয়া সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, 'মেট্রোরেল প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি প্রয়োজন। এতে প্রকল্প ব্যয়, গুণগত মান ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।'
