রপ্তানিতে উচ্চ মূল্য সংযোজনের পরিকল্পনা সরকারের
আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ (সহায়ক) শিল্পের বিকাশে সরকার একটি নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করছে। এর ফলে রপ্তানিকারকদের পণ্যে আরও বেশি মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন)—কমপক্ষে ৫০% পর্যন্ত—করার প্রয়োজন হতে পারে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)-এর দেখা 'আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯'-এর খসড়ায়, প্রস্তাবিত সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো— আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো রপ্তানিকারক এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে তিনি কোনো নগদ প্রণোদনা এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা পাবেন না।
শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার, বর্তমানের ১৫% থেকে দ্বিগুণ করে ৩০% করা হতে পারে। তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) দিয়ে তৈরি সব ধরনের নিট ও ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে এই সীমা বর্তমানের ২০% থেকে বাড়িয়ে ৩০% করা হতে পারে।
নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে আজ অংশীজনদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির শিল্প প্রতিনিধিদের সাথে এই খসড়া নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে, এই ব্যাপকভিত্তিক নতুন বাণিজ্য নীতি আদেশ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
উচ্চ মূল্য সংযোজনের শর্ত
বাংলাদেশের আমদানি নীতি আদেশে নিটওয়্যার, ওভেন এবং শিশুদের পোশাক ছাড়া অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের কোন শর্ত নেই। তবে প্রস্তাবিত খসড়া নীতিমালায় আরও বেশ কয়েকটি রপ্তানি খাতের জন্য কঠোর মূল্য সংযোজনের সীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্তর্বাস এবং অন্যান্য সিন্থেটিক তন্তু-ভিত্তিক বিশেষায়িত পোশাকের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের প্রয়োজন হতে পারে।
জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এবং নন-লেদার জুতা রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত দেওয়া হতে পারে। জাহাজ রপ্তানির ক্ষেত্রে এই সীমা ৪০ শতাংশ এবং কাঠের আসবাবপত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্তারোপ করা হতে পারে।
খসড়া নীতিমালায় নিট ফেব্রিক (কাপড়) আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপটি শিল্প নেতাদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁদের যুক্তি, রপ্তানি চাহিদা মেটানোর জন্য দেশীয় উৎপাদন মোটেও পর্যাপ্ত নয়।
উচ্চ সীমা এবং ফেব্রিক আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সতর্ক করছেন রপ্তানিকারকরা
এবিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) -এর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান টিবিএসকে বলেন, নিটওয়্যার রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ভ্যালু এডিশন সম্ভব, তবে এই মুহূর্তে ওভেন পোশাকে এটি সম্ভব নয়।
এই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি করে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্জনযোগ্য হলেও— আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এটি সকল ক্ষেত্রে কার্যকর করা সম্ভব হবে না।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ী নেতারা খসড়া নীতিমালার সেই ধারার তীব্র সমালোচনা করেছেন যেখানে নিট কাপড় আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলা হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না এমন বিশেষায়িত নিট ফেব্রিক্স আমদানির পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় দেশীয় পোশাক খাতের রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করতে হলে আমাদের ডাইং সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং ডাইংয়ে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে হবে। কিন্তু সরকার গ্যাস দিতে পারছে না, আর এখন বিনিয়োগের উপযুক্ত সময়ও নয়। তাই উচ্চ মূল্যের নিটওয়্যার রপ্তানির মাধ্যমে রপ্তানিতে বৈচিত্র্যকরণ আনতে হলে নিট ফেব্রিক্স আমদানি বন্ধ করা যাবে না।
অর্থপাচার রোধ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান এই পত্রিকাকে বলেন, বেশি দামে পণ্য রপ্তানি করার পরও রপ্তানিকারকরা যাতে কম অর্থ দেশে এনে অর্থ পাচার করতে না পারে, তা রোধ করতেই মূলত মূল্য সংযোজনের হার বাড়ানো হতে পারে। "একই সাথে রপ্তানিকারকদের দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারে উৎসাহিত করাও এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।"
তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য যেহেতু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, তাই ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের সীমা বাড়ানো যৌক্তিক নয়। "এর ফলে ছোট ছোট কারখানাগুলোর রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেবে।"
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, "ভিয়েতনামে মূল্য সংযোজনের এমন কঠোর কোনো শর্ত নেই। সে দেশের অনেক ছোট ছোট কারখানা চীন থেকে কাঁচামাল আমদানি করে সামান্য মূল্য সংযোজন করে— তা আবার রপ্তানি করে দেয়।"
আমদানি স্বত্ব বা এনটাইটেলমেন্ট নিয়মে পরিবর্তন
পাঁচ বছরের পুরোনো ব্যবহৃত যানবাহন, মোটর কার, প্যাসেঞ্জার কার এবং ট্রাক আমদানির ওপর আগের মতোই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও, খসড়া নীতিমালায় ১০ বছর পর্যন্ত পুরোনো বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে 'ফ্রি-অফ-কস্ট' ব্যবস্থার অধীনে রপ্তানি-সংশ্লিষ্ট আমদানি স্বত্বেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পোশাক, ওভেন ও শিশুদের পোশাকের জন্য পূর্ববর্তী বছরের রপ্তানি মূল্যের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানির বর্তমান সুবিধা অপরিবর্তিত থাকবে। তবে কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) এবং সিন্থেটিক আন্ডারওয়্যার পণ্যের ক্ষেত্রে এই সীমা ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হতে পারে।
জুতা এবং চামড়াজাত পণ্যের জন্য প্রস্তাবিত আমদানি স্বত্ব হবে আগের বছরের রপ্তানি মূল্যের ৬০ শতাংশ। জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে রপ্তানি এলসি (ঋণপত্র) মূল্যের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অনুমতির প্রস্তাব করা হয়েছে। আসবাবপত্রের ক্ষেত্রে কাঠের আসবাবপত্রের জন্য ৪০ শতাংশ, কাপড়ের তৈরি আসবাবপত্রের জন্য ২০ শতাংশ এবং যন্ত্রাংশের ফার্ণিচারের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ আমদানির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাণিজ্য সহজীকরণ ও খাত-ভিত্তিক সংস্কার
খসড়া আদেশে এলসি বা ঋণপত্র না খুলেই বিক্রয় বা ক্রয় চুক্তির অধীনে, আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫ লাখ ডলারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য নমনীয়তা বৃদ্ধি করবে।
ঋণপত্র খোলার পর পণ্য জাহাজীকরণের ক্ষেত্রে এখনকার আমদানি নীতি আদেশে যন্ত্রপাতি আমদানিতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস এবং অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে ৯ মাস সময়ের কথা বলা আছে। নতুন নীতির খসড়ায় নির্দিষ্ট কোন সময়সীমার কথা বলা হয়নি।
আমদানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত নয়, এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজে ব্যবহারের জন্য বর্তমানে ১০ হাজার ডলারের পণ্য অবাধে আমদানি করার সুযোগ পান, খসড়া নীতিতে এটি বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বর্তমানে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিনা শুল্কে পাঠাতে পারেন, এটি বাড়িয়ে ১,০০০ ডলার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রপ্তানির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ডিজাইনের পণ্য উৎপাদনের সুবিধার্থে, অথবা বিদেশি ক্রেতাদের পছন্দ অনুসারে স্থানীয়ভাবে মালামাল উৎপাদনের সুবিধার্থে প্রতি অর্থবছর রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প মালিকরা প্রতি ক্যাটাগরির ১৫টি করে সর্বোচ্চ ১,৫০০ স্যাম্পল আমদানি করতে পারেন। এখন প্রতি ক্যাটাগরির ৩০টি করে ৩,০০০ স্যাম্পল আনতে পারবেন।
রপ্তানিমুখী জুতা ও চামড়াজাত শিল্পের উদ্যোক্তারা প্রতি অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫০০ জোড়া স্যাম্পল আনতে পারেন, যা বাড়িয়ে ৩,০০০ জোড়া করা হবে। রপ্তানিমুখী ট্যানারি শিল্প বর্তমানে ৩০০ পিস পাকা চামড়ার নমুনা আনতে পারে, যা বেড়ে ৩,০০০ পিস হতে পারে।
নীতিগত সামঞ্জস্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিধান
খসড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা না হলেও, বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সাথে অগ্রাধিকারমূলক এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সাথে যুক্ত 'সার্টিফিকেট অব অরিজিন' বা উৎপত্তির সনদপত্রের অধীনে হ্রাসকৃত শুল্কে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
খসড়া আমদানি নীতি আদেশে ইসরায়েল থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে, ''ইসরায়েল হতে বা উক্ত দেশে উৎপাদিত কোনো পণ্য আমদানিযোগ্য হবে না এবং উক্ত দেশের পতাকাবাহী জাহাজেও কোনো পণ্য আমদানি করা যাবে না।''
