ব্যবসায়ীদের বড় স্বস্তি দিতে অতিরিক্ত ন্যূনতম কর ফেরতের সুযোগ দিতে পারে সরকার
কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত অতিরিক্ত ন্যূনতম কর যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভবিষ্যতের মুনাফার সাথে সমন্বয় করা না যায়, তবে তা ফেরত দেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছে সরকার। কর ব্যবস্থার ন্যায্যতা বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি বড় উদ্বেগ দূর করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা 'দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড'কে জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় বাজেটে এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এর অধীনে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাদের বেশি পরিশোধিত ন্যূনতম কর—ভবিষ্যতের করযোগ্য আয়ের সাথে সমন্বয় করতে না পারে, তবে তারা সেই অর্থ ফেরতের (রিফান্ড) দাবি জানাতে পারবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা নিজেরা বহুদিন ধরেই ফিল করছি, মিনিমাম ট্যাক্স, যা ফেরত দেওয়া হয় না, তা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড এবং কর ন্যায্যতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবারের বাজেটে একটি ভালো সুখবর থাকবে।"
আরেকজন কর্মকর্তা অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, "নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, সেটি হতে পারে তিন বছর – কোন প্রতিষ্ঠান যদি তার বাড়তি আয় দিয়ে কর্তিত ন্যূনতম কর সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী বছর থেকে তিনি রিফান্ড পাওয়ার যোগ্য হবেন।"
"এই রিফান্ড প্রক্রিয়াটি একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও 'ফেসলেস' (সরাসরি যোগাযোগহীন) ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। অর্থাৎ, রিফান্ড পাওয়ার জন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে এনবিআরের ট্যাক্স অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে আসতে হবে না। রিফান্ড অটো তাদের ব্যাংক একাউন্টে ক্রেডিট হবে" – বলেন তিনি।
কর্মকর্তারা আরও জানান, এই রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর আগে এনবিআর কর পরিপালন ব্যবস্থা (কমপ্লায়েন্স) এবং ডেটা ইন্টিগ্রেশন বা তথ্য সমন্বয় প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে, যাতে কোনো খেলাপি বা আইন অমান্যকারী করদাতা এর অপব্যবহার করতে না পারে।
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ব্যবসায়ী নেতা এবং কর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই প্রস্তাবিত সংস্কার টার্নওভার-ভিত্তিক কর ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট পুঁজির ক্ষয় রোধ করে—বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে।
বর্তমান কর ব্যবস্থা অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোর মুনাফা হোক কিংবা লোকসান—টার্নওভার বা মোট প্রাপ্তির (গ্রস রিসিট) ওপর ভিত্তি করে তাদের একটি ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হয়। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, এই অতিরিক্ত ন্যূনতম কর—ফেরত বা পুনরুদ্ধার করার কোনো সুযোগ না থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবিধিবদ্ধ করপোরেট করের হার কমানো সত্ত্বেও—তাদের প্রকৃত করের বোঝা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি নিবন্ধিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যদিও তাদের মধ্যে মাত্র ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠান কর রিটার্ন জমা দেয়। কোম্পানিগুলোর টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম করের হার ১% থেকে ৩.৫% পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া আরও ৩০টিরও বেশি ক্যাটাগরির করদাতাদের মোট প্রাপ্তির ওপর ন্যূনতম কর দিতে হয়, যার হার সর্বোচ্চ ২০% পর্যন্ত।
গত বছরের বাজেটে কোম্পানিগুলোকে তাদের অতিরিক্ত ন্যূনতম কর— ভবিষ্যতের কর দায়ের সাথে সমন্বয়ের জন্য 'ক্যারি ফরোয়ার্ড' বা পরবর্তী বছরগুলোতে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদী লোকসান বা ক্রমাগত কম মুনাফার সম্মুখীন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই বিধানটি বাস্তবে খুব একটা স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।
প্রকৃত করের বোঝা নিয়ে উদ্বেগ
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে কর্পোরেট করের হার প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় (নন-লিস্টেড) এমন কোম্পানিগুলো ২৭.৫% করপোরেট কর দেয়, আর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো দেয় ২২.৫% থেকে ২৫%।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাত্রাতিরিক্ত ন্যূনতম কর এবং ওই কর রিফান্ডের সুযোগ না থাকায়— কর্পোরেট কর হার কমানো স্বত্বেও কোম্পানির প্রকৃত কর হার কমছে না, বরং তা বেড়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
বার বার লোকসান দেখিয়ে ব্যাপক কর ফাঁকি দেওয়া কোম্পানিগুলোকে করের আওতায় আনতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রথম ন্যূনতম কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে সংগৃহীত মোট আয়করের প্রায় ৬০ শতাংশই ন্যূনতম কর হিসেবে আদায় করা হয়।
এনবিআর-এর আয়কর নীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, কর কর্তৃপক্ষের তখন মুনাফা লুকিয়ে রাখার বিষয়টি কার্যকরভাবে শনাক্ত করার সক্ষমতা ছিল না বলেই মূলত এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, "অনেক কোম্পানি কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য বছরের পর বছর লোকসান দেখাত। এনবিআর-এর পক্ষে এই ধরনের ফাঁকি উন্মোচন করা কঠিন হওয়ায় ন্যূনতম কর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে এর ফলে কমপ্ল্যায়েন্ট কোম্পানিগুলোকে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী হয়েছে।"
ব্যবসায়ীরা কেন ন্যূনতম করের বিরোধিতা করছেন
বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে, প্রকৃত করযোগ্য আয় কম হলেও – ব্যবসায়ীদের তাদের টার্নওভারের ওপর ভিত্তি করেই কর পরিশোধ করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ২% টার্নওভার কর হারে কোনো কোম্পানি যদি ১ কোটি টাকা ন্যূনতম কর দেয়, কিন্তু মুনাফার ওপর ভিত্তি করে তার চূড়ান্ত করের দায় দাঁড়ায় মাত্র ৭০ লাখ টাকা; তবে বর্তমান নিয়মে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না। ফলস্বরূপ, কোম্পানির প্রকৃত করের বোঝা সংবিধিবদ্ধ কর্পোরেট কর হারের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়।
লোকসানে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য এই সমস্যাটি আরও তীব্র আকার ধারণ করে, কারণ কোনো করযোগ্য আয় না থাকা সত্ত্বেও তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ন্যূনতম কর দিতে হয়।
মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে তারা তাদের প্রকৃত কর দায়ের চেয়ে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা বেশি ন্যূনতম কর পরিশোধ করেছে। যদিও কোম্পানিটি সম্প্রতি ভালো মুনাফায় ফিরে আসায় এই অতিরিক্ত কর সমন্বয়ের সুযোগ পাচ্ছে, তবে আরেক মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক এখনও লোকসানের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তাদের ন্যূনতম করের বাধ্যবাধকতা পূরণ করে যেতে হচ্ছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনডাস্ট্রি (ফিকি) এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনডাস্ট্রি (এমসিসিআই)-সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এই বিষয়টি বারবার সরকারের কাছে তুলে ধরেছে।
রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, টার্নওভার কর এখনও ব্যবসার প্রসারে একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, এই টার্নওভার কর একটি কোম্পানি লাভে আছে নাকি লোকসানে—তা বিবেচনা না করেই মোট রেভিনিউ বা রাজস্বের ওপর কর আরোপ করে, যা একটি সুষম ও ন্যায্য কর ব্যবস্থার নীতির সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।
বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, "বাংলালিংক ২০১৫ অর্থবছর থেকে ন্যূনতম কর ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে এবং ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কোম্পানিটি এর আওতায় প্রায় ৯৩৮.৯০ কোটি টাকা কর পরিশোধ করেছে। করযোগ্য মুনাফা না থাকা সত্ত্বেও যেহেতু এই করগুলো দিতে হয়েছে, তাই এই ন্যূনতম কর পদ্ধতি কোম্পানির নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) এবং বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।"
ন্যূনতম কর ব্যবস্থার ব্যাপক পরিধি
বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, মোবাইল ফোন কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভারের ওপর ১.৫% ন্যূনতম ট্যাক্স রয়েছে। কার্বোনেটেড বেভারেজ, চিনিযুক্ত পণ্য এবং তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারীদের জন্য এই করের হার ৩%, যেখানে অন্যান্য বেশিরভাগ কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার ১%।
এছাড়া যাদের বার্ষিক মোট প্রাপ্তি ৩ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, সেইসব ব্যক্তি করদাতাদেরও ১% ন্যূনতম কর দিতে হয়।
রপ্তানিকারকদের রপ্তানি মূল্যের ওপর ১% কর দিতে হয়, পাশাপাশি উৎসে কর কর্তনের অন্তত ৩২টি বিধানকে ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অর্থ হলো, চূড়ান্ত করের দায় কম হলেও—করদাতারা এই অতিরিক্ত কেটে নেওয়া অর্থ আর ফেরত বা রিফান্ড দাবি করতে পারেন না।
প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা
চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি প্রতিষ্ঠান 'চৌধুরী এমদাদ অ্যান্ড কোম্পানি'-র ম্যানেজিং পার্টনার এস কে জামি চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত রিফান্ড ব্যবস্থা কর ব্যবস্থায় বৃহত্তর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। "তবে রিফান্ড ব্যবস্থা কার্যকর করার আগে কর ফাঁকি দেওয়ার পথগুলো যাতে বন্ধ করা যায়, কর্তৃপক্ষকে প্রথমে সেটি নিশ্চিত করতে হবে," বলেন তিনি।
সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, আয় বা মুনাফা ছাড়া ব্যবসার ওপর কর আরোপ করা কর ব্যবস্থার মূল দর্শনের পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, "একটি রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ।"
এই সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলালিংকের তাইমুর রহমান বলেন, "সমন্বয় না হওয়া ন্যূনতম করের জন্য প্রস্তাবিত রিফান্ড ব্যবস্থা একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ। এটি চ্যালেঞ্জিং বাজার পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনা করছে এমন কোম্পানিগুলোর ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে।"
