'চিকেনস নেক' করিডরের কাছে মহাসড়কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাসড়কের দায়িত্ব বুঝে নিতে যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ 'চিকেন'স নেক' করিডোর দিয়ে গেছে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাথে দেশের বাকি অংশের সংযোগ রক্ষাকারী একমাত্র স্থলপথ।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার তাদের অন্যতম প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সাতটি জাতীয় মহাসড়ক অংশকে 'ভারতীয় জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষ' এবং 'ন্যাশনাল হাইওয়েস অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড'-এর কাছে হস্তান্তরের অনুমতি দিয়েছে।
এই পদক্ষেপের প্রভাব কেবল সড়ক মেরামত, প্রশস্তকরণ বা বাণিজ্যের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এর সাথে প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিষয়গুলো বর্তমানে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় জায়গায় ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অত্যন্ত অগ্রাধিকারের বিষয়।
হস্তান্তরিত হওয়া সাতটি অংশের মধ্যে পাঁচটিই শিলিগুড়ি করিডোর বা 'চিকেন'স নেক' দিয়ে গেছে। এই করিডোরটি ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সংকীর্ণতম স্থানে এর প্রস্থ মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার। এটি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের মাঝখানে অবস্থিত এবং উত্তরে সিকিমের ওপারে রয়েছে চীন। এই করিডোরে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই অঞ্চলে আরও প্রশস্ত এবং সুরক্ষিত মহাসড়কের প্রয়োজনীয়তার ওপর বারবার জোর দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালে ডোকলামে চীনের সাথে অচলাবস্থা এবং বারবার ভূমিধসের কারণে সিকিম ও পাহাড়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এই তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের কার্যালয় থেকে জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, "পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্য গণপূর্ত দপ্তরের জাতীয় মহাসড়ক শাখা থেকে সাতটি মহাসড়ক অংশ এনএইচএআই এবং এনএইচআইডিসিএল-এর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।"
এতে আরও বলা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও এই প্রস্তাবগুলো প্রায় এক বছর ধরে রাজ্য সরকারের কাছে ঝুলে ছিল এবং "আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের অভাবে ওইসব অংশে উন্নয়ন কাজ বন্ধ ছিল।"
এই মহাসড়কগুলো হস্তান্তরে বিলম্বের কারণে বিজেপি তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ চালিয়েছিল। বিজেপির অভিযোগ ছিল যে, তৃণমূল সরকার বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশে সহায়তা করার ফলে উত্তরবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলোর জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে, যা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর বিজেপি জনগণের মধ্যে এই বলে সতর্কতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, বাংলাদেশ থেকে কট্টরপন্থী ভারত-বিরোধী শক্তিগুলো 'চিকেন'স নেক' বিচ্ছিন্ন করে ভারতকে দুর্বল করার ডাক দিচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবসময় দাবি করতেন যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকা, অন্যদিকে বিজেপির দাবি ছিল একটি 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকারই কেবল এই ভঙ্গুর যোগাযোগ পথটিকে সুরক্ষিত করতে সক্ষম।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হস্তান্তরের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিরক্ষা রসদ সরবরাহ (লজিস্টিকস), বাণিজ্য, পর্যটন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কগুলোর দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সম্প্রসারণ, শক্তিশালীকরণ ও মেরামতের কাজ দ্রুততর হবে।
বিশেষ করে এনএইচ-১০ মহাসড়কটি বর্ষাকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর ফলে সিকিমের সরবরাহ ব্যবস্থা বারবার বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে এনএইচ-১১০ মহাসড়কটি দার্জিলিংয়ের সাথে সংযোগ রক্ষা করে এবং দীর্ঘ বছর ধরে এটি দীর্ঘস্থায়ী ভূমিধস, ধস এবং যানজটে জর্জরিত।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পরিশেষে বলা হয়েছে, "সামগ্রিকভাবে এই সাতটি মহাসড়ক অংশ সিকিম, ভুটান ও বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ সুদৃঢ় করবে; দার্জিলিং পাহাড়, ডুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করবে; মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মাধ্যমে বিহার-বঙ্গ করিডোরের উন্নতি ঘটাবে এবং মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা দিয়ে ঘোজাডাঙ্গা ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রধান সড়কটির আধুনিকায়ন নিশ্চিত করবে।"
