হরমুজে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে ইরান ও ওমান
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায় করতে মার্কিন মিত্র ওমানের সঙ্গে অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করেছে ইরান। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহারের জন্য কোনো মাশুল না নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সতর্কতা উপেক্ষা করেই ইরান এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এই আলোচনা থেকে বাস্তব কোনো চুক্তি হবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। তবে এর মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই যুদ্ধ এরই মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে যুদ্ধ শেষের পথে। অন্তত প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই এখনো ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখায়নি।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইরানি কর্মকর্তারা জলপথটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং এর মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের উপায় খুঁজতে শুরু করেন।
নতুন কর্তৃপক্ষের ঘোষণা
ওমানের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই বুধবার ইরানের নবগঠিত 'পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ঘোষণায় জানায়, তারা 'হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও তদারকি এলাকার সীমানা নির্ধারণ করেছে'। এখন থেকে এই এলাকা পার হতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। উল্লেখ্য, ওমান উপসাগর এই প্রণালির ঠিক পাশেই অবস্থিত।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প বেশ কয়েকবার ইরানের টোল আদায়ের সম্ভাবনার কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এমন ধারণাও দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই যুদ্ধে স্বঘোষিত বিজয়ী হিসেবে মাশুল আদায় করতে পারে। এমনকি অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগি করার কথাও বলেছিলেন তিনি।
তবে বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রণালি পারাপারের জন্য অর্থ দেওয়ার বিষয়টি খারিজ করে দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, 'আমরা এটি (হরমুজ) উন্মুক্ত দেখতে চাই। আমরা কোনো টোল চাই না। এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ।'
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, 'এটা হতেই পারে না। এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। তারা যদি এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকে, তবে কোনো ধরনের কূটনৈতিক চুক্তিই আর সম্ভব হবে না।'
ওমানের সঙ্গে দর-কষাকষি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পরও ইরান প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সেবা মাশুল (সার্ভিস চার্জ), ট্রানজিট ফি বা পরিবেশগত ফি-এর মতো বিভিন্ন চার্জ যুক্ত করতে পারেন।
এই জলপথ ব্যবস্থাপনার আলোচনার বিষয়ে অবগত দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, ইরান সরাসরি কোনো টোল নেওয়ার পরিকল্পনা করছে না। বরং ওমানের সঙ্গে আলোচনায় জাহাজগুলোকে 'সেবা দেওয়ার' বিনিময়ে ফি আদায়ের প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওমান শুরুতে প্রণালির বিষয়ে ইরানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে রাজি হয়নি। তবে এখন রাজস্বের ভাগ নিয়ে তারা আলোচনা করছে।
কর্মকর্তারা জানান, এই ফি ব্যবস্থার অর্থনৈতিক সুবিধা বুঝতে পেরেছে ওমান। তাই এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর তাদের প্রভাব কাজে লাগাবে বলে জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর
ইরান ও ওমান জোর দিয়ে বোঝাতে চাইছে যে প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় 'ফি' (সেবামাশুল) নেওয়া হবে, কোনো 'টোল' নয়। আইনি দিক থেকে এই দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কেবল প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায় করা বেআইনি। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে জাহাজে সেবা (যেমন বন্দরে বর্জ্য নিষ্পত্তি) দেওয়ার জন্য ফি আদায় করা বৈধ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ফি আদতে নাম পরিবর্তন করে টোল হিসেবেই নেওয়া হয়, তবে তা কিছুতেই আইনি বলে গণ্য হবে না।
১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুন মেনে চললে আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে নির্বিঘ্নে জাহাজ চালানোর অধিকার সব দেশের রয়েছে। ইরান এই কনভেনশনের অংশ নয় এবং দেশটি দাবি করে যে তারা এটি মানতে বাধ্য নয়। তবে ওমান এই চুক্তিতে সই করেছে।
ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের অধ্যাপক জেমস ক্রাসকা জানান, এই কনভেনশনের নিয়ম ও নীতিগুলো প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনেরই প্রতিফলন এবং চুক্তিতে সই করুক বা না করুক, এটি সব দেশের জন্যই বাধ্যতামূলক।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রণালি দিয়ে পারাপারের জন্য অর্থ নেওয়া নিষিদ্ধ—এই নিয়মটি 'বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত' এবং 'ইরান কয়েক দশক ধরে এটি মেনেই এসেছে।'
ক্রাসকা বলেন, 'কিছু পরিস্থিতিতে যুক্তিসংগত ফি নেওয়া বৈধ।' তবে ইরানের জন্য বড় সমস্যা হবে এটা প্রমাণ করা যে তারা যে ফি চাইছে তা সত্যিই যুক্তিসংগত এবং তাদের দেওয়া সেবার সঙ্গে মানানসই।
ক্রাসকা আরও বলেন, 'তারা কৌশলে তাদের প্রস্তাবটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে ফেলার চেষ্টা করছে।' তবে তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত থাকা একটি জলপথে পারাপারের জন্য টাকা নেওয়া এবং সেই টোলকে 'ফি' বলে চালিয়ে দেওয়াটা 'অনেকটা মাফিয়াদের প্রটেকশন মানি (চাঁদা) চাওয়ার সমতুল্য।'
