সম্মতি ছাড়াই নারীর পোশাক ডিজিটালি সরিয়ে দিচ্ছে মাস্কের 'গ্রোক' এআই, ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা
ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল 'গ্রোক' ব্যবহার করে নারীদের সম্মতি ছাড়াই তাদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে। ডিজিটাল উপায়ে ছবির পোশাক সরিয়ে আপত্তিকর অবস্থায় দেখানোর এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা 'ভীষণ অপমানিত' বোধ করছেন। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিসি জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এমন বেশ কিছু উদাহরণ দেখা গেছে। সেখানে ব্যবহারকারীরা গ্রোক চ্যাটবটকে নারীদের ছবি থেকে পোশাক সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছেন। এমনকি ওই নারীদের বিকিনি পরা অবস্থায় বা বিভিন্ন যৌন উদ্দীপক পরিস্থিতিতে দেখানোর জন্যও এআই টুলটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সামান্থা স্মিথ নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, এই প্রযুক্তির কারণে তিনি নিজেকে 'অসম্মানিত' এবং শুধুই 'যৌনতার প্রতীক' হিসেবে অনুভব করছেন।
সামান্থা এক্সে তার ছবি বিকৃত করার বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে অনেকেই মন্তব্য করে জানান যে তাঁরাও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। তবে আতঙ্কের বিষয় হলো, অভিযোগ জানানোর পর এক্সে অনেকে গ্রোক ব্যবহার করে সামান্থার আরও কৃত্রিম ছবি তৈরি করতে শুরু করেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সামান্থা বলেন, 'নারীরা তো এসবের সম্মতি দেননি। ছবিতে পোশাকহীন ওই নারী আমি নই, কিন্তু দেখতে আমার মতোই লাগছে। অনুভূতিটা এমন, যেন সত্যিই কেউ আমার নগ্ন বা বিকিনি পরা ছবি সবার সামনে প্রকাশ করেছে।'
এ বিষয়ে গ্রোকের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি। তবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে শুধু একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা (অটো-রিপ্লাই) এসেছে। তাতে লেখা—'লেগ্যাসি মিডিয়া (মূলধারার গণমাধ্যম) শুধু মিথ্যা বলে।'
যুক্তরাজ্যের প্রেক্ষাপটে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, 'নুডিফিকেশন' বা কৃত্রিমভাবে পোশাক সরানোর টুল নিষিদ্ধ করতে আইন করা হচ্ছে। নতুন অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এই আইনে বলা হয়েছে, যারা এ ধরনের প্রযুক্তি সরবরাহ করবে, তাদের কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে।
যুক্তরাজ্যের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম বলছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই তাদের প্ল্যাটফর্মে অবৈধ কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি যাচাই করতে হবে। তবে এআই দিয়ে তৈরি নারীদের এসব আপত্তিকর ছবির বিষয়ে তারা এক্স বা গ্রোকের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো তদন্ত করছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি সংস্থাটি।
গ্রোক মূলত ইলন মাস্কের মালিকানাধীন একটি এআই চ্যাটবট। এক্স-এ কোনো পোস্টে এটিকে ট্যাগ করা হলে এটি ব্যবহারকারীর নির্দেশ বা প্রম্পট অনুযায়ী কাজ করে। এর কিছু ফিচার বিনামূল্যে এবং কিছু প্রিমিয়াম বা অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করা যায়।
সাধারণত কোনো আলোচনার প্রতিক্রিয়া বা বাড়তি তথ্য দিতে গ্রোক ব্যবহার করা হলেও এর 'ইমেজ এডিটিং' বা ছবি সম্পাদনার ফিচারটি অপব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, নগ্নতা ও যৌনতাপূর্ণ ছবি বা ভিডিও তৈরির সুযোগ দিচ্ছে এই এআই। এর আগে মার্কিন পপ তারকা টেলর সুইফটের কৃত্রিম আপত্তিকর ভিডিও তৈরির অভিযোগও উঠেছিল গ্রোকের বিরুদ্ধে।
ডারহাম ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ক্লেয়ার ম্যাকগ্লিন মনে করেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছা করলেই এ ধরনের অপব্যবহার রোধ করতে পারে। তিনি বলেন, 'এক্স বা গ্রোক চাইলে সহজেই এসব ঠেকাতে পারত। কিন্তু তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা একধরনের দায়মুক্তি ভোগ করছে।'
অধ্যাপক ম্যাকগ্লিন আরও বলেন, 'মাসের পর মাস ধরে প্ল্যাটফর্মটিতে এসব ছবি তৈরি ও ছড়ানো হচ্ছে। অথচ এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো বিকার নেই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও আমরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি না।'
মজার বিষয় হলো, গ্রোকের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের নিজস্ব ব্যবহারবিধি বা নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো ব্যক্তির পর্নোগ্রাফিক বা সদৃশ আপত্তিকর ছবি তৈরি করা নিষিদ্ধ। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা।
এদিকে বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে অফকম জানিয়েছে, সম্মতি ছাড়া কারও অন্তরঙ্গ ছবি তৈরি বা শেয়ার করা এবং শিশু নির্যাতনের কনটেন্ট ছড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি। এআই দিয়ে তৈরি 'সেক্সুয়াল ডিপফেকের' ক্ষেত্রেও একই আইন প্রযোজ্য।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, যুক্তরাজ্যের ব্যবহারকারীরা যাতে অবৈধ কনটেন্টের শিকার না হন, সে ঝুঁকি কমাতে এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে অবশ্যই 'যথাযথ পদক্ষেপ' নিতে হবে। এ ধরনের কনটেন্ট নজরে আসা মাত্রই তা দ্রুত সরিয়ে ফেলার তাগিদও দিয়েছে অফকম।
