নির্বাচনি প্রচারণায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি ব্যানার, ড্রোন, এআই-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি প্রচার আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সারা দেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন করার পর এই প্রচারণা শুরু হলো।
ইসি জানিয়েছে, ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি নির্বাচনি এলাকায় মোট এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি ইসির পক্ষ থেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নির্বাচনি প্রচার অবশ্যই আচরণবিধি মেনে হতে হবে। এই বিধিমালায় জনসভা, প্রচার সামগ্রী ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং ভোটগ্রহণের দিনের ৪৮ ঘণ্টা আগে সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোটগ্রহণের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য ইসির আচরণবিধি ২০২৫ আচরণবিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধিরা ভোটগ্রহণের দিনের তিন সপ্তাহের বেশি আগে নির্বাচনি প্রচার শুরু করতে পারবেন না। ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রচারণা অবশ্যই শেষ করতে হবে।
এই বিধিমালা প্রচারের সময় সকল প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সভা, মিছিল বা অন্যান্য প্রচার কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা প্রদান, বিঘ্ন ঘটানো বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। দল ও প্রার্থীদের কার্যক্রম শুরু করার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের প্রস্তাবিত প্রচার কর্মসূচি জমা দিতে হবে।
যদি একাধিক দল বা প্রার্থী একই স্থানে এবং সময়ে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করে, তবে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের মধ্যে সমন্বয় করবে। জনসভা, পথসভা বা মিছিল জনচলাচল বিঘ্নিত হতে পারে এমন কোনো স্থান, রাস্তা বা মহাসড়কে করা যাবে না। একইভাবে, কোনো দল বা প্রার্থীর প্রতিনিধি এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবেন না যা কোনো ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
বিধিমালায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনের উদ্দেশ্যে বিদেশে কোনো জনসভা, র্যালি বা প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রচার সামগ্রীর ওপর বিধিনিষেধ ইসি আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনি প্রচারে যেকোনো ধরনের পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। প্রচার লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন এবং ব্যানার তৈরিতে রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক বা অন্য কোনো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও পচনশীল নয় এমন উপাদান ব্যবহার করা যাবে না।
কোনো প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনি এলাকার ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ বা টেলিফোন খুঁটি, সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা অথবা বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ, রিকশা, অটো-রিকশা, লেগুনা, ট্যাক্সি এবং বেবি-ট্যাক্সিসহ কোনো যানবাহনে প্রচার সামগ্রী আটকাতে পারবেন না। প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যানার, ফেস্টুন বা বিলবোর্ডের ওপর নিজেদের সামগ্রী রাখতে পারবেন না এবং সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট করতে পারবেন না।
ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া ব্যতীত সকল ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল এবং ফেস্টুন অবশ্যই সাদাকালো রঙে ছাপাতে হবে। ব্যানারের আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুটের বেশি হতে পারবে না, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল অবশ্যই এ৪ সাইজের মধ্যে হতে হবে এবং ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চির বেশি বড় হওয়া যাবে না। প্রচার সামগ্রীতে শুধু প্রার্থীর নিজস্ব ছবি এবং নির্বাচনি প্রতীক থাকতে পারবে।
যানবাহন ও শো-ডাউন সংক্রান্ত নিয়ম বিধিমালায় বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, জলযান বা অন্য কোনো যান্ত্রিক যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল, জনসভা বা শো-ডাউন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যানবাহনসহ বা যানবাহন ছাড়া মশাল মিছিল নিষিদ্ধ। প্রচারের কাজে হেলিকপ্টার বা বিমান ব্যবহার করা যাবে না; তবে দলীয় প্রধান, সাধারণ সম্পাদক বা সমমানের পদধারী ব্যক্তিরা শুধু যাতায়াতের উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন। এ ধরণের ভ্রমণের সময় কোনো প্রচার সামগ্রী প্রদর্শন, বিতরণ বা উপর থেকে নিচে ফেলা যাবে না।
এছাড়া, নির্বাচনি প্রচারের জন্য দেয়াল লিখন বা অঙ্কন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একইভাবে, দল ও প্রার্থীরা জনচলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এমন কোনো গেট, তোরণ, প্যান্ডেল, ক্যাম্প বা আলোকসজ্জা তৈরি করতে পারবেন না।
বিলবোর্ডের ক্ষেত্রে আচরণবিধিতে বলা হয়েছে যে, এর আয়তন ১৬ ফুট বাই ৯ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। একটি সংসদীয় আসনের প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা বা ওয়ার্ডে মাত্র একটি বিলবোর্ড অথবা পুরো আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে (যেটি সংখ্যায় বেশি হয়)। এই সীমার বাইরে অতিরিক্ত কোনো বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না।
বক্তব্য ও ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা উস্কানিমূলক বক্তব্য বা বিবৃতি, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, বিস্ফোরক বহন এবং ধর্মীয় স্থানে প্রচার চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, তাদের মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী বা তাদের পক্ষে কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন, আক্রমণাত্মক বা চরিত্রহননকারী মন্তব্য করতে পারবেন না।
এছাড়া নির্বাচনি প্রচারের সময় তিক্ত, উস্কানিমূলক, মানহানিকর বা লিঙ্গ সংবেদনশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন বক্তব্য দেওয়া যাবে না। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা বা অন্য কোনো উপাসনালয় এবং সরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনি প্রচার চালানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত বিধি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের ক্ষেত্রে বিধিমালা অনুযায়ী প্রার্থী, তাদের নির্বাচনি এজেন্ট বা প্রতিনিধিরা প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে কার্যক্রম শুরু করার আগে তাদের প্ল্যাটফর্মের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ইমেল আইডি এবং অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।
নির্বাচনি প্রচার বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। ঘৃণাসূচক বক্তব্য, ভুল তথ্য, এডিট করা ছবি, বানোয়াট নির্বাচনি তথ্য বা অন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয় তৈরি বা ছড়ানো নিষিদ্ধ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ঘৃণ্য বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না; নির্বাচনি লাভের জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতি ব্যবহার করা যাবে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্যতা যাচাই না করে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো বিষয় শেয়ার বা প্রকাশ করা যাবে না। ইসি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতদুষ্ট, অশালীন বা মানহানিকর বিষয় তৈরি ও প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে বা প্রার্থীর সম্মানহানি করতে এডিটিং বা এআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।
মাইক্রোফোন ও লাউডস্পিকার ব্যবহার মাইক্রোফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধি একটি নির্বাচনি এলাকার একটি জনসভায় একসাথে তিনটির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করতে পারবেন না। সাধারণ প্রচারের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য নয়। প্রচার চলাকালীন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে মাইক্রোফোন বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে এবং শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে প্রার্থীকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। আর দলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। বিধান লঙ্ঘনে আরপিও অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলেরও ব্যবস্থা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রচারণা বিধির বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, 'আমরা শুরু থেকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছি এবং সব প্রচারসামগ্রী স্বেচ্ছায় অপসারণ করেছি।'
বিএনপির মুখপাত্র মাহাদী আমীন বলেন, 'নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি দল আচরণবিধি মেনে চলুক, যাতে নির্বাচন সুন্দর ও বিতর্কমুক্ত হয়।'
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) নির্বাচনী প্রচারণায় আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি টিবিএসকে বলেন, প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। এই পর্যায়ে নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ এবং আচরণবিধিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধি ঠিকভাবে না মানলে পুরো নির্বাচন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে।
জেসমিন তুলি আরও বলেন, বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন শুরুর মুহূর্ত থেকে শেষ পর্যন্ত আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ টিবিএসকে বলেন, গত এক থেকে দেড় মাসে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় গুরুতর কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত চোখে পড়েনি। কোথাও কোথাও মৌখিক অভিযোগ এলেও বড় ধরনের সহিংসতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গ হয়নি। সার্বিকভাবে নির্বাচনি পরিবেশ এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক। প্রার্থী ও দলের আচরণবিধি যেন মেনে চলে সেটা আরমা মনিটরিং করবো। কেউ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ অনুষ্ঠানে বলেন, কোনো প্রার্থীর কর্মীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার দায় প্রার্থীকেই নিতে হবে। তাই প্রার্থীদের উচিত তাদের কর্মীদের আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন করা। নির্বাচনি পরিবেশ সুন্দর রাখা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়, প্রার্থীদেরও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোতায়েন রয়েছে এবং তারা নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করবে।
